অনিল কেমন যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগোতে শুরু করল তার পিছে পিছে। তার যেন জানা হয়ে গিয়েছে জীবনের সারমর্ম। এখানেই তার মৃত্যু, এখানেই জন্ম বার বার। আর যা করে যাচ্ছে তা সব পূর্বনির্ধারিত। তাহলে আর ভাবনা কীসের। যা করতে বলছে করে যাও। আর শুধু সে কি একা নাকি, তার মতো এমন আরও জনা দশ কী বারো লোক এসে হাজির হয়েছে। সবারই এক চাহিদা, সামান্য কিছু বেশি টাকা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এ কারখানাতেই ঠিকা শ্রমিক। সকালে তাদের শিফট চলে। বিকালে কিছু উপরি ইনকাম। অনিল এদের কাউকে কাউকে চেনে। মুখ চেনা।

—এখান দিয়ে যে কেবলগুলো গিয়েছে তাদের কাটতে হবে। তারপর সেগুলো গুটিয়ে একটা বাঁশের মাঝে ঝুলিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বুঝেছেন?

—‘আপনি’ বলছে। তাহলে নিশ্চয়ই ছেলে নয়। বা এমনও হতে পারে, ছেলে কিন্তু পরিচয় লুকাবার জন্য ‘আপনি’ সম্বোধন। অনিল তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকে। সত্যি কি সে, নাকি সে ভুল করছে?

—চিন্তা নেই, আমরা দু’জন দু’দিকে থাকব।

অনিল দেখে তার ছেলের মতো আরও একটা ছেলে রয়েছে, সে খেয়াল করেনি। বা ভেবেছিল তার মতো লেবার। কিন্তু না এ তার মালিকের ছেলে। তারা যখন বাঁশে করে কেবল ঝুলিয়ে নিয়ে যাবে, এরা একজন সামনে, একজন পিছনে থাকবে। এদের হাতে থাকবে দেশি কাট্টা ওয়ান সর্টার। এরাই তাদের প্রোটেকশন, এরাই মাই বাপ।

অনিল এক ভাবে তাকিয়ে থাকে, মুখে কিছু বলে না। সে জানে কাল না এলেও, আজ বেরোনো অসম্ভব। আজ যখন ঢুকে গেছে তখন এদের কথা শুনতেই হবে। কিন্তু কেবল কাটবে কারা। এ তো মনে হচ্ছে লাইভ লাইন।

—কেবল কাটার জন্য লোক আছে অন্য। তারা আসবে দুপাশের জয়েন্টকে শর্ট করে মাঝের লাইন বাইপাস করে দেবে। তারপর ঠিক দশ কী পনেরো মিনিট। কেবল কাটার জন্য এটুকুই টাইম পাওয়া যাবে।

—আর যদি তার মাঝে না হয় ।

—কোম্পানির লোক টের পেয়ে যাবে। তারপর আপনি নিজে মালিক।

( চার )

সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। কেবল কাটা চলছিল অন্ধকারে। আগে থেকেই বাইপাস করা হয়েছে। তারা আসার আগেই সে কাজ সারা হয়ে গেছে। তাদের হাতে সময় কম। হয়তো দশ কী বারো মিনিট। এর মধ্যেই কাজ সারো। হঠাৎ একটা ধাম করে ব্লাস্ট হল। হয় কাজের চাপে, নয় অন্ধকারে — ঠিক বোঝা সম্ভব নয়। পাশের লাইভ লাইন টাচ করে গেছে। ব্যস একটা ব্লাস্ট, যে-দু’জন কাটছিল সিঁড়ি থেকে নীচে। অনিল দাঁড়িয়ে দেখছিল। তার হাতে বাঁশ। মুখে রুমাল। বাকিরা ততক্ষণে পালিয়েছে।

আমি দেখলাম একটা আলোর ঝলক খেলে গেল আমার চোখের সামনে দিয়ে। আর দু’জন উপর থেকে পড়ে গেল আচমকা। তারা যেন তাদের কৃতকর্মের জন্য আকাশ থেকে পড়ল মাটিতে। আমার হাত জোড়া। পাশে কেউ নেই। সবাই যে যেদিকে পেরেছে পালিয়েছে। সামনে দু’জন প্রায় অজ্ঞান। এখন?

দূর থেকে টর্চের আলো দেখা যাচ্ছে। দু’জন সিআইএসএফ ছুটে আসছে। এখন কী করি। আমিও কি পালাব? যে-ছেলেটি ঢুকিয়ে ছিল সে দূর থেকে বলল পালাও। কিন্তু যারা পড়ে থাকল। আমি তাকালাম তাদের দিকে। ছেলেটি ইশারায় যা বলল, এদের এখন কোম্পানির লোকই বাঁচাতে পারবে। তুলে নিয়ে যাবে প্ল্যান্ট মেডিকেলে। তুমি জান থাকতে পালাও।

—পালাব! কিন্তু এভাবে আমারই সঙ্গীকে মাঝপথে ফেলে রেখে। ততক্ষণে ছেলেটি ইশারা করছে। আমি কিছু না বুঝে তার পিছু নিলাম। আমার পিছু নিল একজন সিআইএসএফ। অন্ধকারে ছুটতে থাকলাম। হারিয়ে গেল ছেলেটি। আমি তাও ছুটতে থাকলাম, ছুটতে থাকলাম। সেই ভাঙা পাঁচিলটার দিকে ছুটতে থাকলাম। ছেলেটি যেভাবে হারিয়ে গেছিল, সেভাবে আবার না জানি কোন রাস্তা দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।

মুখোমুখি আমরা দু’জন, পিছনে সিআইএসএফ। ছেলেটি কেন জানি না আমাকে আরও অন্ধকারে ঠেলে ছুটে গেল বাঁ পাশের একটা রাস্তা দিয়ে। যেখানের অল্প আলোয় তাকে দেখা যাচ্ছিল। সিআইএসএফ ছুটে গেল তার পিছে পিছে। তারপর আর কিছু জানি না। কিছুক্ষণ পর একটা জলের শব্দ হল। কেউ একজন পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়লে যেমন আওয়াজ হয়।

শব্দটা শুনলাম, শুনলাম সিআইএসএফ-এর হুইসল। আস্তে আস্তে হেঁটে বেরিয়ে এলাম পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে।

ছেলেটি কি কোনও পরিত্যক্ত পুকুরে ঝাঁপাল? ওদিকটা তো ইস্কোর বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরোনো কারখানা ছিল। পুরোনো ব্লাস্ট ফার্নেসের চার্জিং সাইড। দু-তিন তলা নীচে পর্যন্ত না বোজানো গর্ত রয়েছে সেখানে। কিন্তু এখন? ঘরে গিয়ে ছেলে-মেয়ের মাকে কী বলব? কী বলে নিয়ে আসব হসপিটালের মর্গে?

সে খুব ধীরে ধীরে ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা খোলা। এমনিতে খোলাই থাকে। কিন্তু এখন কেমন যেন মনে হল! খোলা দরজা দিয়ে উঁকি দিল ঘরে। উদ্দেশ্য বিছানাখানি দেখা। সেখানে ছেলে শুয়ে থাকে। কিন্তু না, ছেলে নেই। বাইরে থেকে ডাকল মেয়ের নাম নিয়ে। এগিয়ে এল বউ।

—এত দেরি করে এলে। ছিলে কোথায়?

সে জানতে চাইল ছেলে এসেছে? বউ বলল, এসেছিল আবার চলে গেছে।

—এসেছিল? কখন?

—এই তো ঘণ্টাখানেক আগে। কাল রাতে ঘরে ফেরেনি।

যাক তাহলে সব ঠিক আছে। ছেলের মাকে আর কিছু বলার নেই। ছেলে ঘরে যখন, তখন আর ও পথে যাওয়াও নেই। ও কাজ করাও নেই।

—কিন্তু আবার বেরোল কেন?

—কিছু বলে যায়? যাওয়ার সময় আবার বোনকে নিয়ে গিয়েছে। কেন জানি না।

ঘড়ির কাঁটা কিছুটা ঘুরে এসে হোঁচট খেল আবার। মেয়েকে নিয়ে গেছে? ততক্ষণে জানলার পাশে তার এক প্রতিবেশী এসে

দাঁড়িয়েছে। সে-ও এক সময় বার্ন স্ট্যান্ডার্ডের শ্রমিক ছিল। তার পাশে ধরনায় বসত কিছুদিন আগেও। বলল, “কিছু খবর শুনেছেন?’ শুনেছি? কিন্তু…

—কিন্তু নয়, কাল ইস্কোতে আমাদের একজন মারা গেছে।

—জানি, কিন্তু…

—কিন্তু কী? তার জায়গাটা ভরতে চান, নাকি ভাঙা পাঁচিলটা বন্ধ করতে চান?

অনিল ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...