পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টেলিভিশনের পর্দায় যুদ্ধের ভয়াবহতা সরাসরি দেখেছিল মানুষ— সেই যুদ্ধ ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ। যদিও এটি শুরু হয়েছিল আমার জন্মের অনেক আগে, তবু পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মতো আমার মনেও এর ভয়াবহতা গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল। আর সেই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল অতীতের সাইগন, যা আজ ‘হো চি মিন সিটি’ নামে পরিচিত। ২০২৫ সাল ভিয়েতনামের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী।
কে ছিলেন এই হো চি মিন? কেন সাইগন শহরের নাম পরিবর্তন করে তাঁর নামে রাখা হয়েছিল? কীভাবে আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশ ভিয়েতকং সেনাদের কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের অনেকেরই কমবেশি জানা। তবে ইতিহাসের সব দিক তো একরকম হয় না। কয়েক বছর আগে যখন ওয়াশিংটন ডিসিতে ভিয়েতনাম ভেটেরানস মেমোরিয়াল ঘুরে দেখেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল—হো চি মিন সিটির ওয়ার মেমোরিয়াল কেমন হবে? তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাধারায় নির্মিত স্মৃতিসৌধ নিশ্চয়ই আমেরিকার স্মৃতিসৌধের থেকে আলাদা হবে। সেই কৌতূহল থেকেই হো চি মিন সিটির উদ্দেশে যাত্রা।
হঠাৎ মনে প্রশ্ন জাগল, আমরা কি শুধু হো চি মিন সিটিতেই যাব? হ্যানয় যাব না? হ্যানয় তো ভিয়েতনামের রাজধানী! সেখানে না গিয়ে শুধু হো চি মিন সিটি থেকেই ফিরে আসব কেন?
মনকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, হ্যানয় তো পৃথিবীর অন্য যে-কোনও শহরের মতোই। সেখানে দেখার মতো বিশেষ কিছু আছে কি? বরং এবার হো চি মিন সিটি ঘুরে দেখি। পরে সুযোগ হলে হ্যানয়েও যাব।
দু’দিন পর নির্দিষ্ট সময়ে প্লেনে উঠলাম। সিডনি থেকে হো চি মিন সিটি পৌঁছাতে লাগবে প্রায় নয় ঘণ্টা। প্লেনে বসে মনে মনে ভাবছি— হো চি মিনের মতো একজন ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি বোঝা কি আদৌ সম্ভব? ইতিহাস তাঁকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছে। কেউ নায়ক বানিয়েছে, কেউ খলনায়ক। পশ্চিমী দেশগুলো তো একজোট হয়ে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পর্যন্ত করেছে। হো চি মিনকে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে। কিন্তু তাই বলে কি তাঁর আদর্শকে উপেক্ষা করা যায়?
হো চি মিন, যাঁকে সবাই ভালোবেসে ‘আঙ্কেল হো’ বলত। তাঁর জন্ম ১৮৯০ সালে, একদম সাধারণ এক গ্রামে, এক শিক্ষক পিতার পরিবারে। ছোটোবেলায় তাঁর নাম ছিল নুয়েন সিন কুং। পরে তিনি পড়াশোনা করেন ভিয়েতনামের সবচেয়ে পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান— হু-এর ন্যাশনাল আকাদেমিতে। মজার বিষয় কী জানেন? এই আকাদেমিকে ভিয়েতনামে ‘লিডার তৈরির কারখানা’ বলা হয়! এখান থেকেই দেশের অনেক প্রেসিডেন্ট আর মন্ত্রী বেরিয়েছেন।
ভিয়েতনামের সেই সময়কার ইতিহাস বলতে গেলে রীতিমতো সিনেমার গল্পের মতো শোনায়। ফরাসি উপনিবেশের অধীনে থাকা দেশটা তখন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখছে, আর সেই স্বপ্নের এক বড়ো অংশ হয়ে উঠলেন হো চি মিন। ১৯১১ সালে চাকরির খোঁজে তিনি পাড়ি জমালেন ফ্রান্সে। তারপর ঘুরে বেড়ালেন আমেরিকা, ব্রিটেনসহ আরও কয়েকটি দেশে। তবে শুধু চাকরি করেই সময় কাটাননি, ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়লেন স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে।
১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই শান্তি সম্মেলন চলাকালীন হো চি মিন ভিয়েতনামের স্বাধীনতার দাবিতে একটি আবেদন জমা দিয়েছিলেন। তিনি ফরাসি সমাজতান্ত্রিক দলে যোগ দেন। পরে ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হন। এরপর তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চিনে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে তিনি ইন্দোচিন কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলেন, যাতে ভিয়েতনামের বিভিন্ন বিপ্লবী দল এক হয়ে উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে লড়তে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি দেশে ফিরে এসে ‘ভিয়েত মিন’ প্রতিষ্ঠা করেন, যেটি ছিল ভিয়েতনামের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল সংগঠন। তখন থেকেই তিনি ‘হো চি মিন’ ছদ্মনাম গ্রহণ করেন, যার অর্থ “আলো নিয়ে আসা’।
এইসব গল্পে এতই ডুবে গিয়েছিলাম যে, সময় কখন কেটে গেল টেরই পেলাম না। হঠাৎ পাইলটের ঘোষণা কানে এল— আমরা পৌঁছে গেছি তান সন নাহাত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে! ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড়ো এবং ব্যস্ত বিমানবন্দর এটি। আমাদের হোটেল বুক করা ছিল। ডিস্ট্রিক্ট ১-এ, যা এয়ারপোর্ট থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে।
এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে প্রথমেই মনে হল— এ যেন একটা সমুদ্র। না না, জনসমুদ্র কথাটা হয়তো বলা ঠিক হবে না। তবে ‘স্কুটি’ সমুদ্র বললে হয়তো অতিরঞ্জিত কিছু হবে না। যত দূর চোখ যায়, শুধু স্কুটার আর স্কুটার। মনে হচ্ছিল, পুরো শহর যেন স্কুটারের চাকায় ভর করে চলছে! এটাই যেন হো চি মিন সিটির সৌন্দর্যকে একটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
এই শহরের ইতিহাসও কম রঙিন নয়। তিনশো বছর আগে পর্যন্ত এটি ছিল কম্বোডিয়ার খমের সাম্রাজ্যের অধীন এক ছোট্ট মাছ ধরার গ্রাম, যার নাম ছিল ‘প্রেই নোকর’। ১৬৯৮ সালে নুয়েন রাজবংশের শাসকরা এখানে বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করেন এবং নতুন নাম দিলেন “গিয়া ডিন’।
তারপর এল ফরাসিরা। ১৮৫৯ সালে তারা গিয়া ডিন দখল করে নাম দিল ‘সাইগন’। এরপর, ১৮৬২ সালে এটিকে কোচিন চিনের (দক্ষিণ ভিয়েতনাম) রাজধানী ঘোষণা করা হয়। ফরাসিরা তখন সাইগনকে ‘পূর্বের প্যারিস’ বানানোর স্বপ্ন দেখছে! কোটি কোটি টাকা ঢেলে নতুন ভবন, প্রশস্ত রাস্তা, অপেরা হাউস, ক্যাথেড্রাল— সবই তৈরি করল ইউরোপীয় ধাঁচে। আর সেই থেকেই সাইগনের আধুনিকতার যাত্রা শুরু।





