বাপ রে এমন মোষের রঙের মতো ঘন কুয়াশা! সি আর হোস্টেলের আশপাশের সবুজ গাছগুলোর মাথা জড়িয়ে তা যে থমকে দাঁড়িয়ে! বেলা ন’টার আগে এই শীতে, রাজধানী দিল্লিতে সূর্যের ঘুম ভাঙে না বললেই চলে স্যার— হোস্টেলের ছেলেটা ব্যালকনি সাফ করতে করতে বলে। কোনও কোনও দিন তো সূর্যের আলোর উপর ইরেজার ঘষার মতো লাগে সকালের আকাশকে।

—তাই!

—হ্যাঁ স্যার।

হোস্টেলের ব্যালকনি থেকে সুবর্ণ দেখে রাষ্ট্রপতি ভবন ও পার্লামেন্ট হাউসটাকে ইলিশ রঙের ঝুরো কুয়াশার ভিতর একটা কার্ভ লাইনের মতো দেখাচ্ছে। হোস্টেলের পিছনে কস্তুরবা গান্ধী মার্গ ধরে দু-পা দূরেই ধূসর চাদর গায়ে জড়িয়ে ইন্ডিয়া গেট। সামনের ময়দানে হাঁটতে থাকা মানুষগুলোকে অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির বিন্দুর মতো লাগছে।

পাঁচ দিনের ডেপুটেশনে দিল্লিতে এসেছে সুবর্ণ। বরাবরের মতোই সি আর হোস্টেলে উঠেছে। আগেই অনলাইনে হোস্টেল বুক করে নিয়েছিল। দিল্লির এই অভিজাত এলাকায় সি আর হোস্টেল সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজদের জন্য বেশ চিপেস্ট। থাকা-খাওয়া বেশ সুন্দর ও সু-উপভোগ্য। সুবর্ণ বাথরুমে গিজার অন করে জল গরম করতে দিয়ে হোস্টেলের চারতলার ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। এই সকালেই ঠান্ডা উপেক্ষা করে লোকজন কাজে বেরিয়ে পড়েছে। সুর্বণ আর দাঁড়ায় না। মনে মনে হিসেব করে আজ দ্বিতীয় দিন, কাল সানডে ছুটি, তারপর মাত্র দু-দিন। তাড়াতাড়ি কাজ গুছিয়ে নিতে হবে। ছ’দিনের দিন সকালে হোস্টেল ছেড়ে দিতে হবে। তাছাড়া ওই দিনই তার ফেরার টিকিট।

এত সকালে হোস্টেলের ক্যান্টিনে নাস্তা হবে না। হোস্টেল থেকে বেরিয়ে গেটে এসে দাঁড়ায় সুবর্ণ। ডানদিকে কস্তুরবা গান্ধী মার্গের ফুটের দোকানে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা চা হচ্ছে। কয়েকজন দাঁড়িয়ে খাচ্ছে। এখান থেকেই অটো ধরবে অফিসে যেতে। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে দেখে কোথাও অটো দাঁড়িয়ে নেই, অন্যদিন অটো দাঁড়িয়ে থাকে। এত সকাল, তাই এই জবুথবু ঠান্ডায় আজ অটো বা ট্যাক্সি পাওয়া মুশকিল হবে বোধহয়! ফুটে এসে এক কাপ চা নেয়, উদ্দেশ্য অটো বা ট্যাক্সি পেলে উঠে পড়বে। মিনিট দশেক পর একটা অটো এসে দাঁড়ায়।

দিল্লিতে অটোর সামনের সিটে প্যাসেঞ্জার ওঠায় না। কেবল অটোর পিছনের সিটে বসতে হবে। পিছনের সিটে তিনজন মতো বসতে পারে। কম্যান্ড হসপিটালের প্রায় কাছাকাছি অফিসে যেতে হবে। মেট্রো ধরে যাওয়া যায়, কিন্তু ট্যাক্সি ধরে যাবে ঠিক করেছিল। সুবর্ণ। অটো রাজি হল না। পাশের ভদ্রলোকও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে। ওনার গন্তব্য কম্যান্ড হসপিটাল। এগিয়ে এসে বললেন, “চলুন বুক করে যাওয়া যাক। আজ ট্যাক্সি পাওয়া মুশকিল।”

গাড়িতে বসে সুবর্ণই প্রথম কথা বলা শুরু করে।

—বাঙালি?

—হ্যাঁ। সল্টলেক, কলকাতা-র।

—আপনি?

সুবর্ণ উত্তর দেয় বাঙালি, তবে কলকাতার নয়, কলকাতার কাছাকাছি সোদপুরের।

আলাপ জমে যায় আলাপচারিতায়। ভদ্রলোক বেশ আলাপি। কথা বলতে ভালোবাসেন। জানান— ওনার নাম অমিতাভ দস্তিদার। আর্মি অফিসার ছিলেন। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি ঘুরতে এসেছেন। স্ত্রীর দিল্লি খুব প্রিয় জায়গা। অনেকবার এসেছেন, এখানে পোস্টিংও ছিল একবার। এছাড়া কম্যান্ড হসপিটালে কিছু কাজও আছে ওনার। আরও জানা গেল সি ব্লকের চারতলায় তিনশো তেইশ, মানে সুবর্ণর পাশের রুমেই আছেন।

গাড়ি থেকে নেমে সুবর্ণ নিজের মুঠোফোন থেকে বাড়িতে একটা ফোন করে দেয়। অফিসে অনেক কাজ। যতদূর সম্ভব কাজ গোছাতে চেষ্টা করে। ফাইলপত্র রেডি করে এনেছে। নতুন মেশিনের নকশা, ভিতরকার কলকবজা, ইন ফিউচারে সার্ভিসিং-এর দায়িত্ব সব বুঝিয়ে দিতে বেশ সময় লাগল। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে নিভু নিভু সূর্য। আরও একদিন লাগবে সব কাজ শেষ হতে, তারপর পরের দিন পেপার ওয়ার্কস।

সন্ধ্যার মুখেই রাজধানী শহর সেজেছে আলোকমালায়। ফেরার সময় দূর থেকেই সুবর্ণ দেখে ইন্ডিয়া গেটকে। কী অপূর্ব লাগছে সেই আলোকসজ্জা! লাগোয়া ময়দানে সন্ধ্যায় বেড়াতে আসা মানুষের ভিড়। রাজপথ ধরে রাষ্ট্রপতি ভবনের দিকে কত মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। বেলুনওয়ালা, খেলনা, ফুচকা— হরেক কিসিমের দোকান পসরা সাজিয়েছে মেন রাস্তার পাশে। মনে মনে ভাবে, কালকে ছুটির দিন দুপুরবেলাটা সে এখানে কাটাবে।

একুশ বছর আগে এখানে প্রথমবার সে এসেছিল। হেঁটে ছিল ইন্ডিয়া গেটের সামনে রাজপথ ধরে রাষ্ট্রপতি ভবনের দিকে। এখনও এই সেদিন মনে হয়। আসলে দিন মাস বছর ধরে জীবন এগোয়, অভিজ্ঞতা বাড়ে। কিন্তু স্মৃতিরা যে হারায় না। এক জায়গায় থেমে যায়, থেকে যায়। কিছু কিছু স্মৃতি তো মৃত্যুর আগে মোছে না, বোধহয় মোছাও যায় না।

সেদিন ছাব্বিশে জানুয়ারি। প্রজাতন্ত্র দিবস। প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেড এই রাজপথ ধরে রাষ্ট্রপতি ভবন ও পার্লামেন্ট হাউসের দিকে চলছে। সৈনিকদের কুচকাওয়াজ, সেই সঙ্গে বিভিন্ন স্টেটের ট্যাবলো নিজস্ব সংস্কৃতির প্রদর্শনী করতে করতে চলেছে। ওরা ছিল পশ্চিমবাংলার ট্যাবলোর গানে, মনোরমাদের স্কুল ছিল রবীন্দ্রনৃত্যে। তার আগে ট্রেনে আসার সময়ই মনোরমার সঙ্গে মনের সখ্যতা তৈরি হয়েছিল। অনুষ্ঠানের ভিতরে গান করতে করতে বারবার চোখ যাচ্ছিল মনোরমার দিকে। মনোরমাও নাচের ভিতর সুবর্ণকে দেখছে। বাড়ি ফিরে মনোরমাই যোগাযোগ করে। পাশাপাশি স্কুল ছিল বলে সুবিধা হয়েছিল।

ক’দিন পর উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেই কলেজে। মনোরমাও ভর্তি হল একই কলেজে। বন্ধু হিসেবে মনোরমার বাড়িতে যাতায়াতে আর বাধা রইল না।

—সাব, রাতের ইন্ডিয়া গেট দেখছেন! অটোচালক ইন্ডিয়া গেটের সামনে মেন রোডে আসতেই আঙুল তুলে দেখালেন। ওই যে দু-পাশে আলোর ফোয়ারাগুলো দেখছেন, ওগুলো নতুন হয়েছে।

মুগ্ধ হয়ে দেখতে থাকে ইন্ডিয়া গেটকে সুবর্ণ। চলন্ত অটো থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে যতটুকু দেখা যায়। মনে মনে ভাবে— স্মৃতিস্তম্ভ স্মৃতির উদ্দেশ্যে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও আফগান যুদ্ধে মারা যাওয়া বৃটিশ ভারতের সৈনিকদের নাম খোদাই করা আছ এতে। কত মানুষ আসে, তা দেখে আবার চলে যায়। কিন্তু মৃত স্মৃতি কেবল একা স্মৃতিস্তম্ভের, তা সে নীরবে বহন করে চলে। এখন তো এই ময়দানে কত মানুষ পিকনিক করতে আসে, অবস্থান বিক্ষোভকারীরা ধর্ণামঞ্চেও বসে এখানে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...