ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন বাহিনী বনভূমি ধ্বংস এবং শত্রুদের গোপন আশ্রয়স্থল উন্মোচনের জন্য যে বিষাক্ত রাসায়নিক ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ ব্যবহার করেছিল, তা শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জিন পর্যন্ত বিকৃত করে দিয়েছে! একটার পর একটা ছবি— বিকলাঙ্গ শিশু, জন্মগত ত্রুটি, দগদগে ক্ষত, বিকৃত মুখের মানুষ! মনে হল কেউ যেন আমার বুকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করছে!
এজেন্ট অরেঞ্জের প্রভাব এখনও রয়ে গেছে! শুধু ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষ নয়, যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিন সেনারা আজও এই বিষের অভিশাপে ভুগছে। ক্যান্সার, স্নায়ুরোগ, চর্মরোগ, শারীরিক বিকলাঙ্গতা! কেবল একটা যুদ্ধ জেতার জন্য লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেওয়া— এ কি কোনও সভ্যতার পরিচয় হতে পারে?
এরপর ঢুকলাম কারাগার প্রদর্শনীতে। প্রথমেই চোখে পড়ল ‘টাইগারকেজ’– এক ভয়াবহ নির্যাতনের স্থান। মার্কিন-সমর্থিত দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার এখানে রাজনৈতিক বন্দিদের অমানবিক ভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত। এই কেজগুলো মূলত কন দাও কারাগার এবং ফুকুয়ক কারাগারে অবস্থিত ছিল। ছোটো ছোটো কেজগুলোতে একসঙ্গে অনেক বন্দিকে গাদাগাদি করে রাখা হত। উপরে থাকত কাঁটাতারের জাল। সেখান থেকে বন্দিদের উপর বেয়নেট বা লাঠি দিয়ে আঘাত করা হতো। দিনের পর দিন বন্দিদের খেতে দেওয়া হতো না। জলের বদলে সাবান জল খেতে বলা হতো।

১৯৭০ সালে ‘আমেরিকান কংগ্রেস ম্যান’ টম হারকিন এই অত্যাচারের কথা জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। তারপর আন্তর্জাতিক নিন্দা ও সমালোচনা সত্ত্বেও, আমেরিকা ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বন্দিদের এই কেজ-এ আটকে রেখে অত্যাচার করেছিল। হাজার হাজার বন্দি এই নির্মম নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছে।
আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। ইতিহাসের কতটা ভয়ংকর দিক যে এই মিউজিয়ামের দেয়ালে লুকিয়ে আছে! যুদ্ধ মানে শুধু যোদ্ধাদের মৃত্যু নয়, যুদ্ধ মানে প্রজন্মের পর প্রজন্মের উপর ধ্বংসের ছায়া। আজ ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হয়েছে পঞ্চাশ বছর। কিন্তু সেই ক্ষত আজও শুকোয়নি। হোটেলে ফেরার পথে মনে হল মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় তো? নাকি ভবিষ্যতেও আমরা সেই একই ঘৃণা, লোভ আর ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজেদের ধ্বংস করব?
গতকাল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইতিহাসের সঙ্গে দিনযাপন করে আজকের দিনটা শুধুই আনন্দে কাটানোর পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। সকালে উঠে তৈরি হয়ে নিলাম মেকং রিভার ক্রুজের জন্য। মেকং নদী শুধুই একটা জলধারা নয়, এটা ঐতিহ্যের ধারক, সভ্যতার সাক্ষী। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের কাহিনি বয়ে চলেছে এই নদী। চীন, মায়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এশিয়ার সপ্তম দীর্ঘতম নদী মেকং, ডেল্টায় এসে এক অন্যরকম প্রাণচঞ্চল রূপ ধারণ করেছে। ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টা অঞ্চল হল নদীটির সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও প্রাণবন্ত অংশ। এখানে ভাসমান গ্রাম, ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য একসঙ্গে মিশে আছে।
মেকং রিভার ক্রুজ এই বিস্তীর্ণ জলপথের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য আদর্শ। এটি ভাসমান বাজার, ছোটো ছোটো গ্রাম, নারকেল বাগান, ম্যানগ্রোভ বন এবং আশপাশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেবে। ফ্লোটিং মার্কেট-এর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটু থমকে গেলাম— সবকিছু এত বিশৃঙ্খল অথচ সুন্দর! প্রথমে বড়ো নৌকাতে করে প্রশস্ত মেকং নদীর বুকে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা। তারপর ছোটো এবং সরু নৌকাতে চড়ে সরু খালের মধ্যে দিয়ে বেন ত্রে-তে গিয়ে পৌঁছালাম। নদীর দু’ধারে নারকেল গাছগুলো জলের উপর এমন ভাবে ঝুঁকে পড়েছে, ভয় লাগছিল, এই বুঝি আমাদের নৌকার উপর ভেঙে পড়বে।
এরপর গেলাম নারকেল ক্যান্ডি তৈরির কারখানায়। চারপাশে অগণিত নারকেল গাছ, তার সঙ্গে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক! তাই এই কারখানা বেশ ভালোই ব্যাবসা করছে। কিন্তু যারা সেখানে কাজ করছে, বিশেষকরে মহিলারা, তাদের দেখে মনে হল তারা হয়তো দিনের শেষে খুব সামান্যই উপার্জন করতে পারে। এই ভাবনা থেকেই তিন প্যাকেট ক্যান্ডি কিনে নিলাম। এটা খুব ছোটো কিছু, তবুও মনে হল, হয়তো কারও মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারব!
এরপর নদীর ধারে মধ্যাহ্নভোজ। প্রকৃতির কোলে এক অনন্য অভিজ্ঞতা! লাঞ্চের জন্য আমাদের নিয়ে যাওয়া হল নদীর ধারে একটি খোলা জায়গায়। চারদিকে গাছপালা, প্রকৃতির কোলেই যেন গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ। এখানে একসঙ্গে অনেকগুলো ক্রুজ আসে, তাই পর্যটকদের ভিড় বেশ ভালোই ছিল। ধোঁয়া ওঠা ভাত, মাছভাজা, নারকেলের দুধে রান্না করা খাবার ও ঐতিহ্যবাহী স্প্রিং রোল— সবই ছিল মেনুতে। তবে একটা বড়োসড়ো আস্ত মশলাদার সামুদ্রিক মাছভাজা ভোলার নয়। এত সুন্দর করে পরিবেশন করল, সবাই খাওয়ার আগে ছবি তুলতে ব্যস্ত। রান্না এবং পরিবেশন করা— দুটোই যে শিল্প, আজ আবার বুঝতে পারলাম। এরপর ফেরার পালা। এখান থেকে ফিরে আসার সময় মনটা বেশ খারাপ লাগছিল। মনে হল বিশেষ পরিচিত কোনও একটা জায়গাকে বিদায় জানাতে হচ্ছে। হয়তো আবার কখনও…।
মেকং ডেল্টার বিস্তীর্ণ জলধারা ও নিবিড় সবুজের বুকে লুকিয়ে আছে আরও এক বিস্ময়— ভিন ট্রানগ প্যাগোডা। সময়ের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির, যেন আকাশের নীচে এক শান্তির দ্বীপ। ভিয়েতনামের মাই থো শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, এই পবিত্র আশ্রয়ে পা রাখতেই মনে হল, আমি যেন এক অন্য জগতে প্রবেশ করেছি।
তিনটি সুসজ্জিত খিলান পেরিয়ে যখন ভিতরে এলাম, চোখে পড়ল এক অনন্য স্থাপত্যশৈলীর মহিমা। যেখানে ভিয়েতনামী, চিনা ও ফরাসি সংস্কৃতির মিশেলে গড়ে উঠেছে এক মোহময় শিল্পকলা। প্রবেশদ্বারের উজ্জ্বল মোজাইক, সূক্ষ্ম খোদাইয়ের অলংকরণ, আর পুরোনো কাঠের দরজায় সময়ের ছাপ যেন অতীতের গল্প বলে!





