সময় স্মৃতির উপর ধুলোর প্রলেপ ফেলে। কিন্তু স্মৃতিকে কখনওই পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারে না। সবাই বলে সময়ের অনেক ক্ষমতা। কিন্তু স্মৃতিকে বিস্মৃতিতে বদলে দেবার ক্ষমতা তার নেই। আর তাই দুই কুড়ি বছর আগের আমার এই স্মৃতি আমি সযত্নে লালন-পালন করে চলেছি আমার মনের মণিকোঠায়। তবে আমি যে এই স্মৃতিগুলোকে এখনও বহন করে চলেছি, সেটাই এতগুলো বছর নিজে বুঝে উঠতে পারিনি।

আজ হঠাৎ মনে হল এতগুলো বছর পেরিয়েও আমি সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। চাকরি জীবনের ব্যস্ততা, সংসার জীবনের দীর্ঘ টানাপোড়েন সব কিছুর মাঝে নদীর মতো বয়ে চলা সময় সেই স্মৃতির স্তরে স্তরে এমন ভাবে পলি জমিয়েছিল যে, ভেবেছিলাম হয়তো সব কিছু ভুলেই গেছি। কিন্তু আজ চল্লিশটা বসন্ত পেরিয়ে এসে হঠাৎ সেই পুরোনো গ্রাম, পুরোনো নদী, পুরোনো গাছ— সব কিছুর মাঝে সেই পুরোনো স্পর্শ অনুভব করলাম। সেই তোমার প্রথম স্পর্শ।

এখন এই মুহূর্তে নদীর জলের বয়ে চলার তির তির শব্দ কিংবা গাছের পাতায় পাতায় হাওয়া লেগে ঝির ঝির শব্দ, সব কিছু যেন আমার কানে ফিসফিস করে বলে চলেছে— – তুমি আছো, তুমি আছো, আমার মনে তুমি একই ভাবে আছো, সেই প্রথম দিনের মতো।

বছর বাইশের সদ্য কলেজ পেরোনো তরুণীর জীবনের প্রথম বসন্তের ছোঁয়া নিয়ে এসেছিলে তুমি। আমাদের সমাজের তথাকথিত সুন্দরীদের দলে আমি কোনওদিনই ছিলাম না। তাই কোনও পুরুষের প্রেয়সীও আমি হয়ে উঠতে পারিনি। কারওর খাতার পিছনে লেখা হয়নি আমার নাম কিংবা কারওর হাতের মুঠোয় কোনওদিন ধরা হয়নি আমার হাত। তা নিয়ে অবশ্য একেবারেই কোনও দুঃখ ছিল না আমার মনে কোনওদিন। বেশ ছিলাম নিজেকে নিয়ে, নিজের মতো। চেনা ছন্দে বয়ে চলছিল জীবননদীর ধারা।

তারপর হঠাৎ একদিন তুমি এই গ্রামে এলে স্কুলের চাকরি নিয়ে। তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা এই নদীর পাড়টাতেই। আমি ছিলাম হাসি গল্পে মত্ত আমার বন্ধুদের সঙ্গে। তুমি আমাদের লক্ষ্য করে সেদিন জিজ্ঞাসা করেছিলে, ‘আচ্ছা, গ্রামের হাই স্কুলটা কোন দিকে?’ একবার মুখ ঘুরিয়ে তোমায় দেখে নিয়ে স্কুলবাড়িটা দেখিয়ে দিয়েছিলাম আঙুল তুলে। ব্যস, ওইটুকুই। তখনও ভাবিনি পরে কখনও তোমাকে নিয়ে আবারও ভাবতে বসতে হবে। ভাবিনি আজ এত এত বছর পরও তোমার ছবি আঁকা হয়ে থাকবে আমার স্মৃতিপটে।

পরে বেশ কয়েকবার রাস্তাঘাটে চোখাচুখি হয়েছিল আমাদের। তোমার মনে কী ছিল জানি না, আমি কিন্তু তোমাকে নিয়ে বিশেষ ভাবিনি। কিন্তু পরে তুমি আমাকে বাধ্য করলে বিশেষ ভাবে ভাবতে। স্কুলের রবীন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছিলাম গান গাইতে, প্রাক্তন ছাত্রী হিসেবে। গানটা আমি ছোটো থেকে ভালোই গাইতাম, যদিও প্রথাগত ভাবে কখনও কারওর কাছে শিখে ওঠা হয়নি কোনওদিন। ভালো গান গাইতাম বলে স্কুলে আমার বেশ নাম ছিল। তাই প্রত্যেক বছরই স্কুলের রবীন্দ্র জয়ন্তী অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকত গান গাওয়ার জন্য। আমিও এই সুযোগ পেয়ে খুশি মনে গান গাইতাম। তাই এটা আমার কাছে নতুন কিছু ছিল না।

গান গাওয়ার সময় সেদিন লক্ষ্য করেছিলাম মুগ্ধ নয়নে তুমি আমার দিকে তাকিয়েছিলে, একদৃষ্টে। চোখের পলক পড়ছিল না। একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই বারবার চোখ সরিয়ে নিচ্ছিলাম। কিন্তু কী যেন একটা ছিল তোমার মধ্যে, তোমার ওই চোখের মধ্যে। তাই বারবার গান গাইতে গাইতে তোমার দিকেই চোখ চলে যাচ্ছিল।

আমার গান শেষ হয়ে যাওয়ার পর তুমি এসেছিলে আমার কাছে, পাশে বসে জিজ্ঞাসা করেছিলে আমার নাম। প্রশংসা করেছিলে আমার গানের গলার। যদিও এটা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। গ্রামের সবাই বলে গানটা নাকি আমি ভালোই গাই। তবুও সেদিন তোমার মুখ থেকে প্রশংসা শোনার পর কেন জানি না আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল, বেড়ে গিয়েছিল হৃদস্পন্দন।

কেন যে এমনটা হয়েছিল তা সেদিন সারা রাত জেগে থেকে অনেক ভেবেও বুঝে উঠতে পারিনি। বাকি পুরো অনুষ্ঠানটা তুমি আমার পাশে বসেই দেখেছিলে। মাঝে মাঝে দু’একটা কথা বলছিলে। জিজ্ঞাসা করছিলে আমার ব্যাপারে। ঠিক কী কী কথা সেদিন বলেছিলে আজ আর মনে নেই। শুধু মনে আছে তোমার প্রতিটা কথা আমার শরীরে শিহরণ জাগিয়েছিল। আমারও ভীষণ ইচ্ছে করছিল তোমার সম্পর্কে জানার, অনেক কিছু জানার। কিন্তু কিছুই আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। কেন জানি না বারবার কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে আসছিল। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি ছিল। তুমি তোমার ব্যাপারে যেটুকু বলেছিলে সেটুকুই শুনেছিলাম।

অনুষ্ঠান শেষে আমাকে তুমি এগিয়েও দিয়েছিলে বাড়ির দিকে। পড়ন্ত বিকেলের সূর্যের লাল আভায় তোমাকে একেবারে মায়াবী লাগছিল। মনে হচ্ছিল কোনও এক নাম না জানা দূর গ্রহ থেকে তুমি আমাদের গ্রামে এসে পড়েছ। একবারই তাকিয়েছিলাম তোমার দিকে। তাতেই তোমার ওই মোহময় রূপ দেখতে পেয়েছিলাম। লজ্জায় আর তাকাতে পারিনি তোমার মুখের দিকে। শুধু এক অদ্ভুত ভালো লাগার আবেশে ছেয়ে গিয়েছিল আমার মন।

তারপর থেকে যতবার তোমার সঙ্গে দেখা হতো, চোখে চোখ পড়ত, আমি চোখ নামিয়ে নিতাম। কেমন যেন একটা লজ্জা করত। তুমি হাসতে দেখতাম। মাঝে-সাঝে কথাও বলতে তুমি। আমি শুধু কোনওরকমে উত্তর দিয়েই পালিয়ে আসতাম। আসলে তখন যে আমার মনের মধ্যে উথালপাথাল ঝড় চলত। ভয় হতো; বেশিক্ষণ তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে বা বেশি কথা বললে সেই ঝড়টা বুঝি তুমিও বুঝে যাবে। ভালোবাসা কী তখনও বুঝিনি। শুধু বুঝতাম তোমাকে সামনে দেখলেই আমার সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়!

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...