তারপর একদিন এমনই এক বিকেলে এই নদীর ধারে আমাকে একা বসে থাকতে দেখে তুমি এগিয়ে এলে, বসলে আমার পাশে। আমার কোলের উপর পড়ে থাকা আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে তুলে নিলে। সেদিন প্রথম তোমার স্পর্শ পেলাম। আবার শিহরিত হলাম, ভীষণরকম ভাবে শিহরিত হলাম। এই প্রথম কোনও পুরুষের স্পর্শ পেলাম আমি। আস্তে আস্তে তুমি তোমার মনের কথা জানালে আমাকে। তোমার কাছে সেদিন জানতে পারলাম এতদিন তুমি সামনে থাকলে আমার ভিতর যা যা ঘটত, তোমারও নাকি তেমনই হতো আমি সামনে থাকলে। তোমার কাছে জানতে পারলাম এরই নাম ভালোবাসা।

হঠাৎ করেই যেন সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল আমার। নিস্তরঙ্গ হয়ে বয়ে চলা কোনও নদীর বুকে হঠাৎ কিছু এসে পড়লে যেমন তাতে তরঙ্গের সঞ্চার ঘটে, আমার জীবনেও তোমার বলা কথাগুলোতে ঠিক তেমন ঘটল। তুমি প্রথম মানুষ, যে আমাকে উপলব্ধি করিয়েছিলে যে, আমি শুধুমাত্র একটি মেয়ে নই, আমার মধ্যেও এমন কিছু আছে যা অন্য কাউকে আকর্ষণ করতে পারে। তোমার স্পর্শেই প্রথম আমি তরুণী থেকে যুবতীতে পরিণত হলাম। পদার্পণ করলাম এক নতুন জীবনে। প্রথম প্রেমের আবেশে মুগ্ধ সেই যুবতী তোমাকে নিয়ে সেদিন অনেক স্বপ্নের জাল বুনেছিল।

প্রতিদিন বিকেলে স্কুল ছুটির পর এই নদীর পারে নিভৃতে আমরা বসে গল্প করতাম আর দিগন্ত রাঙিয়ে সূর্যের বিদায়যাত্রা দেখতাম। সারাদিনের যত জমানো কথা উজাড় করে দিতাম একে অপরের কাছে। কখনওবা দু’জনের কেউই কোনও কথাই বলতাম না, শুধুই হাতের উপর হাত রেখে একে অপরের মনের কথা বুঝে নিতাম। এই নদীর সঙ্গে তুলনা করে তুমি বলতে আমাদের প্রেম ঠিক এই নদীটার মতোই শান্ত অথচ গভীর৷ আর তাই প্রতিদিন অন্য কোথাও নয়, এই নদীর কাছেই আমরা ছুটে আসতাম। আজও একই ভাবে নদীর জল আর আকাশকে রক্তিম আভায় মাতিয়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। কিন্তু আজ এইখানে এই নদী পাড়ে আমি একাই তার প্রত্যক্ষদর্শী।

আমার দীর্ঘ জীবনে তোমার উপস্থিতি যে এত সংক্ষিপ্ত হবে সেদিন তা বুঝিনি। অল্পদিনের মধ্যেই গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল আমাদের সম্পর্কের কথা। সদ্য আধুনিকতার হালকা ছোঁয়া লাগা গ্রামের রক্ষণশীল পরিবার তখনও বাড়ির মেয়ের এমন উন্মুক্ত প্রেম মেনে নিতে অভ্যস্ত ছিল না, তাও আবার নীচবর্ণের কোনও ছেলের সঙ্গে। ফলত আমাদের পরবর্তী গল্পটা খুবই সাধারণ এবং সহজেই অনুমানযোগ্য।

বাবা, কাকারা তাড়াহুড়ো করে পাত্র জোগাড় করে আমাকে গ্রাম থেকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দিলেন প্রায় নির্বাসনে। শুনলাম পাত্র আমার থেকে বয়সে অনেকটাই বড়ো। কিন্তু বড়ো ছোটো যাইহোক, তা নিয়ে আমার তখন মাথা ব্যথা ছিল না। আমার তখন একটাই চিন্তা, তোমাকে ছেড়ে যেতে হবে। প্রতিবাদ যে করিনি তা নয়, কিন্তু আমাদের দেশের হাজার হাজার মেয়ের এমন শত প্ৰতিবাদ বন্ধ ঘরের দরজায় নীরবে মাথা ঠুকে মরে। তুমিই বা সেদিন আর সাহস করে সকলের সামনে আমার হাত ধরতে পারলে কই? কারণটা অবশ্য আমার অজানা ছিল না।

তুমিই বলেছিলে, তোমার মা আমার ছবি দেখে এক কথায় না করে দিয়েছিল। শুনে আমি একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলাম। কারণ বুঝেছিলাম তোমার মায়ের আচরণ খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সরকারি চাকরি করা শহুরে আধুনিক ছেলের জন্য গ্রামের আটপৌরে কালো মেয়ে কোন মা পছন্দ করবেন? বাড়ির অমতে বিয়ে করার সাহস সেদিন তোমার ছিল না। তোমাকে দোষ দিই না। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে এই গল্পটা খুবই সাধারণ ছিল। ভারতবর্ষের কত সহস্র ঘরের দেয়ালে আমাদের এই গল্পটাই গাঁথা আছে। কষ্ট পেয়েছিলাম, ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম তোমাকে ছাড়া হয়তো বাঁচতেই পারব না। কিন্তু জানো তো, ভুল ভেবেছিলাম। এই তো এক দুটো নয়, রীতিমতো চল্লিশটা বছর পেরিয়ে গেল। দিব্যি বেঁচে আছি, ভালোই আছি।

আসলে এই পৃথিবীতে জল, হাওয়া ছাড়া বেঁচে থাকার জন্য কেউই বোধহয় অপরিহার্য নয়। এ এক নির্মম সত্য। তবে আমার মতো তুমিও যে সেদিন কষ্ট পেয়েছিলে তা আমি জানি। তাই তো আমার বিয়ের দিন রাতে সকলের অলক্ষ্যে যখন তুমি এসে দাঁড়িয়েছিলে, তখন তোমার চোখের জলে সেই কষ্টের প্রতিবিম্ব আমি দেখেছিলাম। তুমি শেষবারের মতো কথা বলতে চাইলেও আমি আর কথা বলিনি। না, তোমার উপর রাগ করে নয়। আসলে আর মায়া বাড়াতে চাইনি। ভাগ্যের হাতে একবার যখন নিজেকে সঁপেই দিয়েছি তখন আর পিছনে তাকিয়ে কী লাভ? আমাদের সকলের প্রিয় রবি ঠাকুরের ভাষায়, ‘অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার ধরিয়া রাখার মতো বিড়ম্বনা আর হয় না।’

তবে ভাগ্যদেবতা আমার উপর একেবারেই যে অপ্রসন্ন ছিলেন তা বলা যাবে না। আমার স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সকলেই খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। আমাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার সমস্তরকম চেষ্টা এবং ব্যবস্থা আমার স্বামীই করেন। আমিও যে চাকরি করতে পারি, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বাবলম্বী হতে পারি, সেই ভাবনাও আমার মধ্যে আমার স্বামী তৈরি করেছিলেন। আমার গায়ের রং নিয়েও তাঁর বা তাঁর বাড়ির কারওরই খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না। প্রথম থেকেই মানুষটার প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তবে খুব সহজে তাকে আমি ভালোবাসতে পারিনি। কারণ আমার মন জুড়ে যে তখন শুধুই তুমি ছিলে। কিন্তু মিথ্যা বলব না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার স্বামী নিজের অফুরন্ত ভালোবাসা দিয়ে আমার মনে তার জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন। আর এখানেই হয়তো আমাদের দেশের হাজার হাজার মেয়ের থেকে আমার গল্পটা আলাদা হয়ে গেল।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...