বিশু পুকুর থেকে আঁজলা জল নিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিচ্ছিল। তার ছায়া পড়েছে জলে। সেই জলে হাত দিতেই ছায়াও কেমন নাচছে। অনেকটা নাচনির মতো। খুব মজা পাচ্ছিল সে।
ইরফান চাচা ডাকল, “কীরে বিশে! হাত ধোওয়া হল?”
বিশু দৌড়ে প্যান্ডেলের মধ্যে ঢুকে হাতটা গামছায় মুছল।
—এত সময় লাগে? ভালো করে দ্যাখ ভাতটা ফুটল কিনা, তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়ে বেরোতে হবে। পটাশপুর তো আর কম দূর নয়।
ইরফান চাচার এই এক দোষ, বড্ড অস্থির হয়ে ওঠে। বিশু ভাতটা স্টোভ থেকে নামিয়ে নিল। এখনই গরম-গরম ডাল-ভাত মুখে গুঁজে নিতে হবে। কাল রাতে পেটে তেমন কিছু পড়েনি।
আসলে বিশু এসেছে একটা পুতুল নাচের দলের সঙ্গে। ফাইফরমাশ খাটে। বিশুর বাবা আগে এই দলের লিডার ছিল। তিনি চলে যাওয়ার পর সংসার আর চলে না। ইরফান চাচাই বিশুর মা’কে বলেছিল, ‘ভাবি, ছেলেটারে না হয় পাঠাও। দু’পয়সা যা হবে, তোমাদের দু’জনের চলে যাবে।’
বিশুর বাবা হরেন দাসকে সবাই ওস্তাদ বলে মানত। এই দল কবেই ভেঙে যেত যদি না হরেনদা থাকত! কে আর মাঠে-ঘাটে পুতুল নাচাতে যাবে? ক’পয়সা আর হয়! হরেনদা শক্ত করে ধরে রেখেছিল বলে এই দল এখনও টিকে আছে। নতুন নতুন পালা তৈরি করেছিল। আর গানের গলা? আহা! লোকে কত হাততালি দিত। ইরফান চাচা পুতুলগুলোর চুল আঁচড়ে দিতে দিতে এসবই ভাবছিল। বিশুর ভাত নামাতে দেখেই চাচা বুঝল, খাবার রেডি।
ওরা মোট সাতজনের দল। এখন ইরফান চাচাই ওদের লিডার। পুরোনো লোক বলতে— আদিলদা, কুবের আর মোহনদা। মোহনদা আর আদিলদা পুতুল নাচায়। কখনও কখনও রাজুদাও নাচায়। তবে শুধুই নাচনিকে। ইরফান চাচা নানা কণ্ঠে সংলাপ বলে, প্রায় নয়-দশ রকমের কণ্ঠ করতে পারে। এমনকী মেয়েদের গলাতেও কথা বলতে পারে। বিশুকেও শেখাবে বলেছে। ভোম্বলদা চাচার সহকারী হিসেবে আছে। বিশু পুতুল নাচাতে পারে না। অত বড়ো বড়ো পুতুলগুলোকে নাচাতে দম লাগে। শক্তি লাগে।
ভাত মুখে দিয়ে আদিলদা বলল, ‘চাচা, পেমেন্টের বাকিটা দিয়েছে?”
ইরফান চাচা একটা কাঁচা লঙ্কা চিবোতে চিবোতে বলল, “দিয়েছে রে দিয়েছে, কালকের পটাশপুরের শোটা হোক। এক সঙ্গে পেয়ে যাবি।’
আসলে এইখানে একটা মেলা হচ্ছে। মেলা কমিটি প্রতিবারেই তাদের নিয়ে আসে। দু’দিন খোলা মাঠে প্যান্ডেল করে পুতুলনাচ হল। ভালোই লোক হয়েছিল। এত লোক মজা করে পুতুলনাচ দেখছে দেখে চাচার চোখে জল এসে গিয়েছিল আনন্দে। অবশ্য মোহনদা বলেছিল, “পকেটের কড়ি লাগেনি তো তাই দেখছে। পটাশপুরে বোঝা যাবে! এখেনে মাগনায় হবে না, টিকিট লাগবে।’ পটাশপুরেও মেলা হচ্ছে। ওখানে ওরা আগে কখনও যায়নি। তবে শুনেছে তাঁবু খাটিয়ে পুতুলনাচ হবে। ইরফান চাচা বলেছে ওখানে অন্নদামঙ্গল পালা করবে। জমবে ভালো।
খাওয়া হতে হতে একটা বেজে গেল। একটা ছোটো ম্যাটাডোর চলে এসেছে। রাজুভাই নতুন। মাস চারেক দলের সঙ্গে এসেছে। সে আর বিশু মিলে পুতুলগুলো ম্যাটাডরে তুলে গাড়ির পাটাতনে ঠেস দিয়ে রাখছিল। বেশ কায়দা করে দাঁড় করিয়ে রাখতে হচ্ছিল। কারণ, পুতুলের নীচের অংশে যে লম্বা লাঠিটা থাকে, সেটার জন্য দাঁড় করিয়ে রাখা বেশ কঠিন কাজ।
নবাবের পুতুল, বেগমের পুতুল, বামুনের পুতুল আরও কত পুতুল৷ গায়ে কেমন ঝকমকে ড্রেস। তবে নাচনি-পুতুলটাকে সবচেয়ে ভালোবাসে বিশু। গোলাপি রঙের একটা ঘাগরা পরে আছে। মাথায় বাঁধা আছে বেগুনি ওড়না। আদিলদা কী সুন্দর নাচাত। এখন রাজুদাও শিখে নিয়েছে। চাচা যখন মেয়েলি কণ্ঠে গান ধরে, দু’টো হাত নাড়িয়ে কী সুন্দর অঙ্গভঙ্গি করে নাচনি। ওই সময়টা বিশু শুধু হাঁ করে দ্যাখে।
বিশু নাচনিকে ম্যাটাডোরের একটা ধারে যত্ন করে দাঁড় করিয়ে রাখল। ইরফান চাচা বলেছিল— নাচনির যেদিন জান আসবে, সেদিন বিশুর সঙ্গে তার শাদি করাবে। বিশু হাসে না। সে জানে পুতুল কখনও জ্যান্ত হবে না।
ম্যাটাডোর ছাড়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে আকাশ কেমন কালো করে এল। কিছুক্ষণ আগেই রোদ ঝলমলে দিন ছিল। হঠাৎ যেন ভোল বদল। ম্যাটাডোরে তো আর ছাউনির ব্যবস্থা নেই। ইরফান চাচা চেঁচামেচি করতে লাগল।
—ওরে মোহন, ওরে বিশে ত্রেপলটা দ্যাখ কোথায় আছে। গাড়ি একটা গাছতলায় থামিয়ে ত্রিপল দিয়ে একটা ছাউনি করা হল। তবে খুব যে জুতসই হল বলা যায় না। আবার গাড়ি চলল। ত্রিপলের কোণাটা চেপে ধরে আছে বিশু। নাহলে দমকা হাওয়ায় ত্রিপল উড়ে যেতে পারে।
পটাশপুর যত এগিয়ে আসে তত যেন বৃষ্টির বেগ বাড়ে। কত আর আটকানো যায়। পুতুলগুলোতেও বৃষ্টির ছিটে এসে লাগল। রাজুভাই ত্রিপলটাকে টেনে টেনে আড়াল করার চেষ্টা করলেও কাজের কাজ কিছু হল না। মোহনদা মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘বৃষ্টির যা অবস্থা, মেলা ভালো জমবে না।’ আদিলদা দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে সায় দিল। ঘণ্টা দু’য়েক লাগল। বৃষ্টিটার জন্য কিছুটা দেরি হল যেতে। মেলার মাঠের এককোণে তাঁবু ফেলা আছে। গাড়ি গিয়ে দাঁড়াল তাঁবুর একেবারে গা ঘেঁষে। মাঠ আর মাঠ নেই। কাদায় একেবারে যা-তা অবস্থা। তবে বৃষ্টিটা একটু ধরেছে তাই রক্ষে! মোহনদা ম্যাটাডোরের উপর থেকে একটা একটা করে পুতুল নামাচ্ছে, নীচে বিশু ধরে নিয়ে পরপর সাজিয়ে রাখছে।
ইরফান চাচা ওদিকে তাকিয়ে জিভ দিয়ে একটা আপশোস করার মতো শব্দ করে বলল, “পুতুলগুলো তো ভিজে যা-তা অবস্থা। কাল পালা হবে কী করে?’
সকলেই পুতুলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। নবাবের দাড়ি দিয়ে জল টসটস করে ঝরছে, বেগমের শাড়ি ভিজে যা-তা অবস্থা। সব পুতুলগুলোই কম বেশি ভিজেছে। তবে বিশু জানে, নাচনির গায়ে জলের ফোঁটাটি পর্যন্ত পড়েনি। সে প্রায় আগলে রেখেছিল নাচনিকে।





