ডায়না নদীকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় একটা রুপোলি সরু ফিতের মতো কোনও ধারা প্রবাহিত হয়ে গেছে। মনে পড়ে ছোটোবেলায় পড়া সেই কবিতার কথা: ‘আমাদের ছোটো নদী চলে আঁকে বাঁকে/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে’।

এখানে বৈশাখ মাস কেন, এখন অক্টোবর মাসেও এর জল অনেকটাই কম। তার কারণ বৃষ্টির পরিমাণ এ বছর যথেষ্ট কম। রিসর্টের একদম কাছে পৌঁছে দেয় গাড়ি। তাই সঙ্গে বয়স্ক মানুষ থাকলেও, কোনও অসুবিধা নেই। করোনাকালীন সময়ে বন্ধ থাকলেও তারপরে নতুন সাজে সজ্জিত হয়ে উঠেছে এই রিসর্টটি। রাত্রিযাপন না করলেও কোনও অসুবিধা নেই। ইকো রিসর্টের পাশেই অবস্থিত ইকো পার্কটিও ঘুরে দেখা যায়। জঙ্গল -নদী-পাহাড়ের মেলবন্ধনে অপূর্ব এই জায়গাটি একেবারেই নির্জন। টিকিট কেটে ইকোপার্কটি পুরোটা ঘুরে দেখা যায়। এখানে একটি বিষয় বলে নেওয়া ভালো। যারা ইকো রিসর্টে থাকেন, তাদের জন্য ইকো পার্কে প্রবেশের কোনও মূল্য লাগে না।

একটি নজর মিনার আছে, তার উপর থেকে উঠে গোটা এলাকা ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ পয়েন্টে দেখে নেওয়া যায়। একদিকে সবুজ পাহাড় আর একদিকে তার উপরে নীল আকাশের শামিয়ানা। ভুটান পাহাড়ের ওদিকে তাকিয়ে দেখি বাউণ্ডুলে মেঘের দল এদিক- ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভুটান পাহাড়ের উপর নীল আকাশের বুকে পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘেদের দেখে চোখ ফেরানো যায় না। আসলে শরতের আকাশের কোনও জায়গা বিভেদ হয় না। কোলাহল থেকে শত আলোকবর্ষ দূরে এ জায়গায় এসে মনে হয় নিস্তব্ধতারও একটা ভাষা আছে, যা হৃদয় দিয়ে শুনতে হয়। দুপুরের খাওয়ার অর্ডার দিয়ে আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়। এটা আগে থেকে ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম। তাই ফিরে এসে এখানেই দুপুরে খাওয়ার কথা বলে রেখে, গিয়েছিলাম ভুটানের সীমান্তে।

চামুর্চি থেকে মোটামুটি ৩ কিলোমিটার গেলে পৌঁছানো যায় এক অলৌকিক রহস্যময় গুহায়। আগে হেঁটেই যেতে হতো। তবে এখন অনেকটা দূর পর্যন্ত গাড়ি যায়। শেষ প্রায় ৬০০-৭০০ মিটার হাঁটতে হয়। হাতে যথেষ্ট সময় থাকায় লোকাল একজনকে সঙ্গে নিলাম, যিনি গাইডের কাজ করেন। ডায়না নদীর তীর ধরে ঘন অরণ্যপথে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল। পাশেই রয়েছে গারুচিরা, কালাপানি ও রোহিতি অরণ্য। গাইড শিরিংয়ের কথা অনুযায়ী এখানে মাঝে মাঝেই জল খেতে আসে হরিণের দল, হাতির পাল, গাউর, এমনকী চিতাবাঘও।

সেগুন, শাল, বয়রাঘেরা অরণ্য ছায়াপথে হাঁটতে হাঁটতে একসময় এমন এক জায়গায় পৌঁছালাম যাকে দেখে প্রথম দর্শনেই মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই আদিম মানুষদের আবাসস্থল। ঘন অরণ্য মাঝে এমন একটি গুহা দেখে প্রথমে একটু ভয় লাগলেও, গাইডের অভয়বাণীতে নিশ্চিন্ত হয়ে গুহার ভিতরে প্রবেশ করে অন্য এক জগতে চলে গেলাম। চারিদিকে যখন ভালো করে নজর রাখছি, ততক্ষণে দেখি শিরিং-ভাই একটি নুড়ি পাথর কুড়িয়ে ছুঁড়ে দিয়েছেন সামনের একটি পাথরকে কেন্দ্র করে। তার ফলে একটি সুরেলা আওয়াজ শুনতে পাই। আবারও একটি পাথর ছুঁড়ে দিতেই আরেক রকম ধ্বনি ভেসে আসে। ব্যস, একের পর এক পাথর ছুঁড়ে দিয়ে এরপর আমরাও যেন বিঠোফোনের মতো নতুন নতুন সিম্ফনি সৃষ্টিতে মেতে উঠতে থাকি। এই কারণেই এই গুহার নাম “মিউজিক্যাল কেভ’।

বহু জায়গায় বহু গুহা দেখেছি। কিন্তু এত সুন্দর সুর সৃষ্টিকারী গুহায় কোনওদিনও যাইনি। প্রকৃতি যেন নতুন নতুন রাগ-রাগিনী শুনিয়ে চলেছে তার কাছে আসা পর্যটকদের। স্থানীয়দের কাছে এই জায়গা ‘মহাকাল মন্দির’ নামে পরিচিত। বক্সা-জয়ন্তীর দিকে যে বড়ো মহাকাল ও ছোটো মহাকাল মন্দির আছে, তার থেকে অনেকটা পার্থক্য রয়েছে এই জায়গার। এখানে পুজো করার জন্য মূর্তি নেই। বড়ো গুহাটিকেই স্থানীয়রা মহাদেবের মূর্তির প্রতীক মনে করে পুজো করেন। শিবরাত্রিতে এখানে বড়ো করে মেলা হয়। দূর- দূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন পুজো দিতে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এখানে এসে মানত করলে তা পূরণ হয়।

জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ছোট্ট গ্রাম্য কিন্তু সুষমামণ্ডিত একটি মন্দির চোখে পড়ল। শিরিং বলতে শুরু করল এই মন্দির স্থাপনের পিছনে একটা অলৌকিক কাহিনির কথা। আসলে যেখানে দেবতার স্থান, সেখানেই মিশে থাকে কোনও না কোনও লোককাহিনি। এই মন্দিরের স্থানীয় নাম কাঠালগুড়ি মন্দির। কয়েক বছর আগে এখানকার কিছু স্থানীয় মানুষ মাটি খুঁড়তে গিয়ে এক অদ্ভুতরকমের শিলার দর্শন পায়। নানা ধরনের লতাপাতা, চরণ চিহ্ন, নয়ন চিহ্ন দেখে তারা ভক্তি করে পুজো করতে থাকে। মন্দির বন্ধ ছিল। কিন্তু বাইরে থেকেই দেবদর্শন করা যায়। গরাদের ফাঁক দিয়ে শিলাকে প্রত্যক্ষ করলাম। নিত্য পুজোর নানা উপকরণও দেখা গেল।

এবার গাড়িতে উঠে এগিয়ে চলি আরেকটি জায়গার দিকে। ভারতের সঙ্গে ভুটানের সংযোগকারী বেশ কয়েকটি প্রবেশদ্বার রয়েছে। এদিক থেকে গেলে একটা প্রবেশদ্বার পড়ে, যার নাম চামুর্চি গেট। রাজকীয় গেটটির অপূর্ব নির্মাণশৈলী দেখে মুগ্ধ হতে হয়। ওপারে এর নাম সামসি গেট৷ আমরা অনেকেই জানি ভুটানকে ‘সুখী দেশ’ বলা হয়। এপাশ থেকে দাঁড়িয়েই দেখা যায় ওপাশের পথ- ঘাট, বাজার। দু’পাশেই দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী উপস্থিত। হঠাৎ করে আকাশের দিকে চোখ যায়। বাউণ্ডুলে মেঘের দলের পারাপার দেখে মনে হয় তারা যেন কোনও আইনের শাসন মানে না। তাদের দেখাতে হয় না কোনও পরিচয়পত্র। তাই নীল আকাশের ভেলায় চেপে তারা দিব্যি এপার-ওপার করছে। কাঁটাতারের বেড়া শুধুমাত্র মানুষের জন্য। যদিও ভারত এবং ভুটানের মধ্যে সম্পর্ক খুব ভালো হওয়ায় কোনও কাঁটাতারের বেড়া নেই। সীমান্ত মানেই যে কাঁটাতারের বেড়া, একথা এখানে প্রযোজ্য নয়।

ভুটানের প্রকৃতিগত অবস্থান এরকমই যে, প্রকৃতিই তার নানা সম্ভার দিয়ে বর্ডার হিসেবে এই ছোট্ট সুখী দেশটিকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছে তার যাবতীয় স্নেহবন্ধন দিয়ে। ভারত-ভুটানের এই প্রবেশদ্বার পণ্যবাহী জিনিসপত্র আদান-প্রদানের জন্য বিশেষ ভাবে ব্যবহৃত হয় বলে সারি সারি ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় আর এই ট্রাকের জন্যই রাস্তায় শুধু ধুলো। ইচ্ছে করলে ওদেশ থেকে ঘুরে আসা যায়। ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে পরিচয়পত্র দেখিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য ওপারে যাওয়ার ছাড়পত্র মেলে। মনের উচ্ছ্বাসকে দ্বিগুন করতে পরিচয়পত্র দেখিয়ে, গেট পেরিয়ে ওপারে চলে যেতেই মনে হল, এ যেন দু’পা বাড়ালেই বিদেশে এসে প্রবেশ করলাম।

ভুটানের এই ছোট্ট গ্রামটির নাম সামসি। গাড়ির স্ট্যান্ড আছে। পর্যটকরা ইচ্ছা করলে এখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে ভুটানের বেশ কিছু অংশ ঘুরতে পারেন। স্ট্যান্ডে থাকা গাড়ির ড্রাইভারদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, মাথা প্রতি ৫০০ টাকা ভাড়ায় এখান থেকে গাড়িতে দু’ঘণ্টা গেলেই ভুটানের আরেকটি সীমান্ত শহর ফুন্টশোলিং-এ যাওয়া যায়। চুখা জেলাতে অবস্থিত ভুটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরটি শিল্প ও বাণিজ্যের শহর হিসেবেও পরিচিত। পায়ে হেঁটেই দেখে নেওয়া যায় এখানকার বেশ কিছু জায়গা। যেমন শিব মন্দির, একটি সুন্দর পার্ক, ফুটবল খেলার মাঠ, যেখানে দেখতে পাই ফুটবল অনুশীলনে ব্যস্ত রয়েছে স্থানীয় কিছু ছেলেমেয়ে ।

কিছুটা এগিয়ে গেলেই এক শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে দেখতে পেলাম একটি মনাস্ট্রি, যা এখানে ‘সামসি মনাস্ট্রি’ নামে পরিচিত। ওপারের চামুর্চির নজরমিনার থেকে যার একটু অংশ দেখতে পেয়েছিলাম। বেশ কিছুটা সময় এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে চলে আসি গেটের ওপারে, যেখানে নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে পরিচয়পত্র নিয়ে গাড়িতে করে রওনা দিই আবার নিজেদের অস্থায়ী আবাসের দিকে।

কীভাবে যাবেন: কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে গেলে বানারহাট স্টেশনে নামতে হবে। এখান থেকে চামুর্চি মাত্র ১০ কিলোমিটার। ছোটো গাড়ির ভাড়া মোটামুটি ৮০০ টাকা। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে চামুর্চির দূরত্ব প্রায় ৯৬ কিলোমিটার।

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা আছে পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তরের অধীনে থাকা চামুর্চি ইকো রিসর্ট। এখানে নানা মানের ও দামের ঘর আছে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বুকিং করা যায়। গুগলে ওয়েবসাইট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেয়ে যাবেন।

কখন যাবেন: চামুর্চি বছরের যে-কোনও সময় যাওয়া যায়। তবে বর্ষাকালে এর সৌন্দর্য অপরূপ।

বিশেষ তথ্য: চামুর্চি থেকে ভুটান সীমান্তে বেড়াতে যেতে হলে সঙ্গে ভারতীয় নাগরিকত্বের বৈধ পরিচয়পত্র— যেমন আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ইত্যাদি অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...