ব্রেন টিউমার হল মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক কোষের বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধি বিনাইন (Benign অর্থাৎ ক্যান্সারবিহীন) বা ম্যালিগন্যান্ট (Malignant অর্থাৎ ক্যান্সারযুক্ত) হতে পারে। এমনকী বিনাইন টিউমারও বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ মস্তিষ্কে যে-কোনওরকম টিউমার-এর অতিরিক্ত চাপ সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। আর এই ব্রেন টিউমারের আধুনিক চিকিৎসার বিষয়ে বিস্তারিত জানালেন কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জন ডা. অমিতাভ দাস।

ব্রেন টিউমার হয় কেন?

অনেক ক্ষেত্রে কোষের ডিএনএ-তে পরিবর্তনের (মিউটেশন) কারণে ব্রেন টিউমার তৈরি হয়। এর ফলে কোষগুলি অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বিভাজিত হয়। কিছু কারণ মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা বাড়িয়ে দিতে পারে। যেমন— রেডিয়েশন-এর কারণে: যারা অন্য কোনও চিকিৎসার জন্য রেডিয়েশন-এর সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের ঝুঁকি বেশি।

পারিবারিক ইতিহাস: পরিবারে কিছু বিরল জিনগত অবস্থা বিদ্যমান থাকলে মস্তিষ্কের টিউমারের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে (যেমন— নিউরোফাইব্রোমাটোসিস)।

বয়স: মস্তিষ্কে কয়েক ধরনের টিউমার শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। আবার কয়েক ধরনের টিউমার বয়স্কদেরও হয়। পরিবেশগত কারণ: হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো কিছু নির্দিষ্ট রাসায়নিক থেকেও মস্তিষ্কের টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে গবেষকরা এই বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নন।

বেশিরভাগ ব্রেন টিউমার কোনও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ঘটে। তাই, যদি আপনার বা আপনার পরিচিত কারওর ব্রেন টিউমার হয়, তাহলে মনে রাখবেন— এর জন্য কেউ দায়ী নয়।

ব্রেন টিউমারের ধরন

ব্রেন টিউমার দুই ধরনের— বিনাইন এবং ম্যালিগন্যান্ট।

বিনাইন টিউমার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে না।

ম্যালিগন্যান্ট টিউমার (ক্যান্সারযুক্ত) দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং মস্তিষ্কের টিস্যুর উপর আক্রমণ করতে পারে। এই ধরনের টিউমার-এরও কিছু প্রকারভেদ রয়েছে। যেমন—

মেনিনজিওমাস: সাধারণত বিনাইন জাতীয় এবং এগুলি মস্তিষ্কের আচ্ছাদনকারী স্তরগুলিতে শুরু হয়।

গ্লিওমাস: অ্যাস্ট্রোসাইটোমাস এবং গ্লিওব্লাস্টোমাস অন্তর্ভুক্ত। এগুলি মস্তিষ্কের সহায়ক কোষ থেকে আসে। পিটুইটারি টিউমার: বিনাইন জাতীয় এবং মস্তিষ্কের গোড়ায় অবস্থিত ছোটো গ্রন্থিতে শুরু হয়। মেডুলোব্লাস্টোমাস: শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

মনে রাখবেন, টিউমারের ধরনের উপর নির্ভর করে চিকিৎসা পদ্ধতি এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে চিকিৎসার ফলও ভিন্ন হয়। নড়াচড়া, কথা বলা, স্মৃতিশক্তি এবং আরও অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের মস্তিষ্ক। তাই যখন একটি টিউমার বৃদ্ধি পায়, তখন মস্তিষ্কে চাপ তৈরি হয় এবং মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রিত সবরকম কার্যকলাপে ব্যাঘাত ঘটে। তাই, কোনও কিছু অস্বাভাবিক মনে হলেই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

লক্ষণ এবং সতর্কতা

  • সকালে কিংবা রাতে প্রায়ই যদি মাথাব্যথা করে
  • যদি স্বাভাবিক মাথাব্যথার চেয়ে বেশি কষ্ট অনুভূত হয়
  • হাঁচলে কিংবা কাশলে যদি মাথাব্যথা বেড়ে যায়
  • হঠাৎ ঝাঁকুনি বা শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া
  • অকারণে বিভ্রান্তি তৈরি হলে কিংবা স্বাভাবিকতা হারালে
  • ঝাপসা বা ডাবল দৃষ্টি
  • শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া কিংবা কানে অনবরত ‘ভোঁ-ভোঁ’ শব্দ শোনা
  • হাত কিংবা পা নাড়াতে সমস্যা
  • শরীরের কিছু অংশে অকারণে অসাড়তা বা ঝিঁঝিঁ লাগা
  • ভারসাম্য বা হাঁটার সমস্যা
  • চিন্তাভাবনা বা আচরণে পরিবর্তন
  • স্মৃতিশক্তির সমস্যা তৈরি হলে
  • মেজাজ কিংবা ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হলে
  • কথা বলতে বা বুঝতে অসুবিধা হলে।

তবে এইসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে আপনার ব্রেন টিউমার হয়েছে এমনটা নয় এবং ভয় পাওয়ারও দরকার নেই। কিন্তু তখন সতর্কতা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি। এই লক্ষণগুলি দেখা দিলে অবশ্যই একজন নিউরোসার্জন-এর পরামর্শ নেওয়া উচিত। স্বাভাবিক ব্যথানাশক ওষুধে যদি সাড়া না দেয়, তাহলে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন আছে।

টিউমার শনাক্ত করার জন্য মস্তিষ্কের স্ক্যান (যেমন এমআরআই বা সিটি) করার প্রয়োজন হতে পারে।

এমআরআই স্ক্যান: মস্তিষ্কের বিস্তারিত ছবি দেখার এটি সর্বোত্তম উপায়। এটি টিউমারের আকার এবং অবস্থান খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

সিটি স্ক্যান: কখনও কখনও জরুরি পরিস্থিতিতে কিংবা এমআরআই সম্ভব না হলে সিটি স্ক্যান করা হয়।

বায়োপসি: কিছু ক্ষেত্রে টিউমারের একটি ছোটো অংশ নিয়ে তা পরীক্ষা করা হয়।

আধুনিক চিকিৎসা

বর্তমানে ব্রেন টিউমারের চিকিৎসার অনেক উন্নতি হয়েছে। যেমন—

  • এআই মাধ্যমে নিউরোমাইক্রোস্কোপ এবং নিউরোনেভিগেশন
  • নিউরো-রোবোটিক্স এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি
  • কীহোল বা এন্ডোস্কোপিক সার্জারি

সংবেদনশীল অঞ্চলে কিছু টিউমারের জন্য সম্পূর্ণ টিউমার অপসারণ সম্ভব নয়। এই ক্ষেত্রে টিউমারের কিছু অংশ অপসারণের জন্য অস্ত্রোপচার করা হয় (লক্ষণগুলি কমাতে), তারপরে অন্যান্য চিকিৎসা করা হয়।

স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারি (SRS) এবং গামা নাইফ রেডিওসার্জারি-ও (GKRS) সুফল দিচ্ছে এখন। কখনও কখনও, ঐতিহ্যবাহী ওপেন সার্জারি সর্বোত্তম বিকল্প নাও হতে পারে। বিশেষকরে যদি টিউমারটি মস্তিষ্কের একটি সূক্ষ্ম অংশে থাকে অথবা রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্যের কারণে ওপেন সার্জারি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ক্ষেত্রে স্টেরিওট্যাকটিক রেডিওসার্জারি (SRS) নামক একটি বিশেষ ধরনের উচ্চ-কেন্দ্রিক বিকিরণ ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে বিকিরণ রশ্মি ব্যবহার করে, কাছাকাছি সুস্থ মস্তিষ্কের টিস্যুকে বাঁচানোর সময় ক্যান্সার কোষগুলিকে ধ্বংস করা হয়। এটি ছোটো, সুনির্দিষ্ট টিউমারের জন্য বিশেষ ভাবে সহায়ক হতে পারে। SRS-এর সবচেয়ে উন্নত রূপগুলির মধ্যে একটি হল গামা নাইফ রেডিওসার্জারি (GKRS)। নাইফ শব্দটি থাকলেও, এক্ষেত্রে কোনও ছুরি ব্যবহার করা হয় না। এটি শত শত কেন্দ্রীভূত বিকিরণ রশ্মি ব্যবহার করে চিকিৎসা করা হয়।

SRS এবং GKRS পদ্ধতির প্রয়োগ

  • মস্তিষ্কের ছোটো টিউমার বা মেটাস্টেস (অন্য কোথাও থেকে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়া ক্যান্সার) দেখা দিলে
  • মেনিনজিওমাস বা অ্যাকোস্টিক নিউরোমাসের মতো কিছু বিনাইন টিউমার হলে
  • সংবেদনশীল স্থানে টিউমার হলে।

রেডিয়েশন থেরাপি

  • অস্ত্রোপচারের পরে অবশিষ্ট টিউমার কোষ ধ্বংস করার জন্য
  • টিউমারের সংবেদনশীল স্থানে অবস্থানের কারণে যখন অস্ত্রোপচার সম্ভব হয় না।

কেমোথেরাপি এবং টার্গেটেড থেরাপি

কিছু টিউমার কেমোথেরাপির ওষুধে ভালো সাড়া দেয়, যা ক্যান্সার কোষকে মেরে ফেলে বা তাদের বৃদ্ধি ধীর করে দেয়। এগুলি ট্যাবলেট কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া যেতে পারে।

টার্গেটেড থেরাপিতে এমন ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যা ক্যান্সার-কোষের উপর আক্রমণ করে। এটি ঐতিহ্যবাহী কেমোথেরাপির তুলনায় আরও কার্যকর হতে পারে এবং কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।

ইমিউনোথেরাপি: যা আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে টিউমারের সঙ্গে লড়াই করতে সাহায্য করে।

গ্লিওব্লাস্টোমাসের মতো নির্দিষ্ট টিউমারের জন্য একটি নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিও রয়েছে এখন। রোগীরা একটি বিশেষ ক্যাপ পরেন, যা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি বন্ধ করার জন্য মৃদু বৈদ্যুতিক তরঙ্গ পাঠায়। এটি কেমোথেরাপির সঙ্গে ব্যবহার করা যেতে পারে।

মনে রাখা জরুরি

  • মেনিনজিওমাসের মতো বিনাইন টিউমার সম্পূর্ণরূপে অপসারণ এবং নিরাময় করা যেতে পারে। গ্লিওব্লাস্টোমাসের মতো ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের চিকিৎসা করা কঠিন, তবে নতুন থেরাপি মানুষকে আরও সময় এবং উন্নত জীবনযাপনের মান প্রদান করছে।
  • মস্তিষ্কের যে অংশ কথা বলা কিংবা অঙ্গ সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করে, সেই স্থানের টিউমার সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা কঠিন হতে পারে।
  • অল্পবয়সি রোগী এবং যাদের সাধারণ স্বাস্থ্য ভালো, তাদের চিকিৎসা করা যায় নিশ্চিন্তে। কিন্তু অন্যান্য রোগে আক্রান্ত থাকলে কিংবা বয়স বেশি হলে টিউমার-এর চিকিৎসা খুব সাবধানে করতে হয়। তবে, ব্রেন টিউমার আছে শুনে ভয় পাবেন না। মনে রাখবেন, সব ব্রেন টিউমার-ই ক্যান্সারযুক্ত নয়। অনেক টিউমার সফল ভাবে চিকিৎসা করা যেতে পারে। প্রাথমিক রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসা আপনাকে ভালো ফলাফলের জন্য সর্বোত্তম সুযোগ দেয়। আসলে আমাদের মস্তিষ্ক একটি আশ্চর্যজনক এবং জটিল অঙ্গ। তাই এর যত্ন নেওয়া জরুরি।
আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...