ছেলেটিকে বলল, “ইনিই তোমার বাবা সুধাকর বণিক। আর তোমার মা চন্দ্রাবলী তোমার শোকে শয্যাশায়ী, মৃত্যুর প্রহর গুনছে। যাও মায়ের কাছে।’ তারপর সুধাকরকে বলল, “আমি এখন যাই, পরে আবার কথা হবে।”
—একটু বসবি না?
—না রে, অনেক কাজ আছে। আমি যাই, তোরা ছেলেকে নিয়ে আনন্দ কর। বলে ডাক্তার বেরিয়ে গেল।
ছেলেটি হাঁ করে তাকিয়েছিল সুধাকরের দিকে। তাকে প্রণাম করতেই সুধাকর ছলছল চোখ মুছে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ‘হয়েছে বাবা, আগে চল মায়ের কাছে’ বলে ভিতরে নিয়ে গেল। দূর থেকে স্ত্রীকে ডেকে বলল, “দেখো চন্দ্রা কে এসেছে।”
শোবার ঘরে ঢুকে ছেলেটি খানিক থমকে দাঁড়াল বিছানার পাশে। তারপর ‘মা’ বলে চন্দ্রাবলীর পা ছুঁতেই সে আস্তে আস্তে উঠে বসে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
সুধাকর বলল, “তোমার সূর্য গো, চিনতে পারছ না?”
বিস্ময়ের ঘোর কাটল চন্দ্রাবলীর, সম্মোহিতের মতো দু’হাত বাড়িয়ে বলে উঠল, ‘সূর্য, তুই এসেছিস বাবা? আয় বাবা বুকে আয়।”
সূর্য আস্তে আস্তে বিছানায় বসতেই চন্দ্রাবলী তাকে বুকে টেনে নিয়ে সারা মুখ আদরে ভরিয়ে দিল। অশ্রুসাগরে ভাসতে ভাসতে বইয়ে দিতে লাগল অভিযোগের বন্যা। কোথায় ছিলি বাবা এতদিন? মায়ের কথা কি একটুও মনে পড়ে না? মাকে এভাবে কষ্ট দিতে হয়…?
সুধাকর চোখ মুছে বলে উঠল, ‘ছেলেটা গোটা রাত জার্নি করে এসেছে। আগে ওকে খেতে দাও, তারপর যত খুশি আদর কোরো।”
—হ্যাঁ হ্যাঁ দিচ্ছি, বলে আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নামতে যেতেই সুধাকর বলল, ‘তোমাকে যেতে হবে না, আমি আনছি, তুমি ওর সঙ্গে কথা বলো।’
স্বামী রান্নাঘরে চলে যাওয়ার পর চন্দ্রাবলী সূর্যর গায়ে হাত বুলিয়ে বলল, ‘কোথায় ছিলি বাবা এতদিন? ওরা খেতেটেতে দেয় না। নাকি, কেমন রোগা রোগা লাগছে?’
সূর্য কিছু বলতে যাচ্ছিল। তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘তার আগে বল এতদিন ছিলি কোথায়? পাহাড়ের খাদ থেকে বাঁচলি কী করে?”
সুধাকর চা-জলখাবার নিয়ে এসেছিল। বিছানায় রেখে বলল, ‘হ্যাঁ বাবা, বল তো কে তোকে বাঁচিয়েছিল? কাদের কাছে ছিলি এতদিন? আমাদের কথা একটুও কি মনে পড়েনি?”
খেতে খেতে সূর্য বলতে লাগল তার বিগত কুড়ি বছরের জীবনের কথা— কীভাবে তাকে অচৈতন্য অবস্থায় এক নেপালি দম্পতি খরস্রোতা নদীর পাড় থেকে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিল, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল, আগেকার স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ায় তাকে নিজেদের সংসারে ঠাঁই দিয়েছিল, স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল ইত্যাদি। শেষে বলল পরে একটু একটু মনে পড়ত মা-বাবার কথা। কিন্তু নতুন মায়ের কাছে সে কথা বললেই সে কেঁদে উঠত। তাই তাদেরকে কাঁদিয়ে আসতে পারিনি। কালও আসার সময় বলে দিয়েছে যেন তাড়াতাড়ি আবার দার্জিলিং ফিরে যাই।”
—না, আর কোথাও যেতে দেব না তোকে। একবার যখন ফিরে পেয়েছি আর ছাড়ব না তোকে। বলে চন্দ্রাবলী তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল।
—ঠিক আছে বাবা, সেসব পরে দেখা যাবেখন। এখন চল তো দেখি, বাসি জামাপ্যান্টগুলো বদলে ফেল। বলে সুধাকর তাকে নিয়ে চলল পাশের ঘরে, আর চন্দ্রাবলী কৌতূহলভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ছেলের দিকে।
আস্তে আস্তে সুধাকরের বাড়ির পরিবেশটাই পালটে গেল। গোটা বাড়ি গমগম করতে লাগল আনন্দ-কোলাহলে। আত্মীয়-পরিজনদের আনাগোনাও বেড়ে গেল। সবাই দেখতে এল ফিরে আসা চন্দ্রাবলীর ছেলেকে। সবাই খুব খুশি হয় সূর্যকে দেখে। তবে কেউ কেউ আড়ালে আবডালে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে, “কোথাকার কে এসে জুটেছে কে জানে? হয়তো কোনও ধান্দা আছে! তাদের দু-একজনের ফিসফিসানি কানে যায় চন্দ্রাবলীর। কিন্তু বিশেষ পাত্তা দেয় না। বলে, ‘এসব নিন্দুকের কথা, হিংসায় জ্বলছে।’
কথাটা কানে গিয়েছিল সুধাকরেরও। কিন্তু তার মুখে আত্মীয়স্বজনের নাম, স্কুলের কথা আর ছেলেবেলার দু-একটা ঘটনার কথা শুনে সব সন্দেহ দূর হয়ে যায়। সর্বোপরি মা-বাবার প্রতি তার ভক্তিশ্রদ্ধা দেখে আরও আপ্লুত হয়ে যায় মনটা। সবসময় মায়ের পাশে পাশে থাকে। তার সুখসুবিধা খাওয়াদাওয়ার খেয়াল রাখে। ওষুধ খেতে একটু দেরি হলে বকুনি দেয় ছোট্ট মেয়ের মতো।
চন্দ্রাবলী মাঝে মাঝে বলে, ‘তুইই তো আমার ওষুধ বাবা। অন্য ওষুধের দরকার নেই।”
সূর্য তখন চোখ পাকিয়ে বকুনি দেয়—ওসব অজুহাত চলবে না। সময়মতো ওষুধ না খেলে শরীর ঠিক হবে কী করে? আর আবার যদি শরীর খারাপ করে বসে, তাহলে কিন্তু আমি দার্জিলিং পালিয়ে যাব, আর আসব না।
অগত্যা ছেলের কথাই শুনতে হয় চন্দ্রাকে, ‘আচ্ছা বাবা খাচ্ছি’ বলে ছেলেকে বুকে টেনে নেয়।
এইভাবে মাস তিনেক কেটে গেছে। চন্দ্রাবলীর মুখে হাসি ফুটেছে। এখন সুস্থ হয়ে উঠেছে অনেকটা। সুধাকরও আস্তে আস্তে ব্যাবসার কাজ দেখতে শুরু করেছে। নিয়ম করে প্রতিদিন অফিসে বেরিয়ে যায়। সুবোধ ডাক্তার মাঝে মাঝে যথারীতি আসে চেকআপে। হেসে হেসে বলে, ‘সূর্য ফিরে আসায় আমারই ক্ষতি হয়ে গেল। রোগী যেভাবে কলকল করে ছুটে বেড়াচ্ছে তাতে হয়তো ক’দিন বাদে আর আমার আসার দরকারই পড়বে না।”
চন্দ্রাবলী উত্তর দেয়— সবকিছু তো তোমারই কল্যাণে ডাক্তার। তুমি না থাকলে আমি কখনও আমার সূর্যকে ফিরে পেতাম না।’
সুধাকরও হেসে বলে, ‘চিন্তা করিস না। তোর ক্ষতির ডবল পুষিয়ে দেব। খালি ভগবানকে জানা আমার সূর্য যাতে ভালো থাকে। জীবনে অনেক উন্নতি করে।”
মাঝে মাঝে ছেলেকে সুধাকর বলে, “মা তো এখন অনেক ভালো আছে। এবার আমার ব্যাবসার কাজটা একটু দ্যাখ বাবা, আমার সঙ্গে অফিসে চল।”
সূর্য ঘাড় নাড়ে— ওসব ব্যাবসার কাজ আমার দ্বারা হবে না, ও তুমিই সামলাও।
—ব্যাবসার কাজ ভালো না লাগে অন্য কিছু কর। পিএইচডি করার ইচ্ছা ছিল বলছিলি, সেটাই নয়তো কর।
—আগে মা পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাক, তারপর ওসব ভাবব। বলে সরে যায় সূর্য।
—পাগল ছেলে, বলে সুধাকরও বেরিয়ে যায় কাজে।
কিছুদিন পরে হঠাৎ বুকে ব্যথা নিয়ে সুধাকরকে ভর্তি হতে হল হাসপাতালে। প্রথমে সুবোধ ডাক্তারকে ডেকেছিল। কিন্তু সে বলল, “আমি সাইকিয়াট্রিস্ট, হার্টের কী বুঝব? এখুনি হাসপাতালে যাও।’ সেখানে গিয়ে জানা গেল মাইল্ড হার্ট অ্যাটাক।
(ক্রমশ……)





