পাক্কা দশদিন হাসপাতালে থেকে তবে ছাড়া পেল। বাড়িতে এসে সুধাকর নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল। ঠিক করল উইলের কাজটা তাড়াতাড়ি সেরে ফেলবে। ছেলের নামে ব্যাবসাপত্র লিখে দেবে। কিন্তু সূর্য বেঁকে বসল, কিছুতেই রাজি হল না। বলল, ‘আমার নামে নয়। মা তো এখন পুরো সুস্থ, তুমি মায়ের নামেই সব করে যাও।’ ছেলের কথা শুনে অভিভূত হয়ে গেল দু’জনে। সুধাকর বলল, ‘মাকে দিলেও তো একদিন তুইই পাবি?’

—সে তখন যা হয় হবে, এখন মায়ের নামেই থাক।

গালে চুমু খেয়ে চন্দ্রাবলী ঠাট্টা করে বলল, “একেবারে সন্ন্যাসী ছেলে, কোনও চাহিদা নেই।”

এইভাবে প্রায় মাস সাতেক কেটে গেছে। চন্দ্রাবলী এখন পুরোপুরি সুস্থ। সূর্যও হয়ে গেছে ঘরের ছেলে। দেখে মনেই হয় না এতদিন সে ঘরের বাইরে ছিল। তার আচার-ব্যবহারে মা বাবার মন জুড়িয়ে যায়। কিন্তু একটা জিনিস কেমন যেন বিসদৃশ লাগে সুধাকরের। ছেলেটা মাঝে মাঝে কোথাও বেরিয়ে যায়, ফিরে আসে কয়েক ঘণ্টা পরে। জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘কলকাতায় ওর পরিচিত কয়েকজন বন্ধুবান্ধব আছে। তাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল।’

চন্দ্রাবলী বলেছিল, ‘ওদেরকে নিয়ে আয় আমাদের বাড়িতে, আলাপ করা যাবে।’

—আচ্ছা আনব বললেও, আজ পর্যন্ত সূর্য তাদেরকে বাড়িতে নিয়ে আসেনি।

আরও একটা জিনিস সুধাকরের কেমন যেন লাগে। ডাক্তার এলে মাঝে মাঝে ফিরে যাবার সময় ওকে ডেকে আলাদা করে কথা বলে। কী কথা বলছিল জিজ্ঞেস করলে সূর্য উত্তর দেয়— মায়ের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করছিল।

সুধাকর অবাক হয়! ভাবে, চন্দ্রার ব্যাপারে তো সামনাসামনি বসেই আলোচনা হয়। তার জন্যে ওকে আলাদা করে ডাকতে হবে কেন? মাঝে মাঝে ছেলেটা কেমন যেন অন্যমনস্কও হয়ে পড়ে। কী এত ভাবছে জিজ্ঞেস করলে ‘কিছু না’ বলে এড়িয়ে যায়। তারা ভাবে— হয়তো ফেলে আসা নেপালি বাবা-মায়ের কথা মনে পড়েছে, তাই বেশি বিরক্ত করে না ওকে।

একদিন কী একটা কাজে সুধাকর ছেলের ঘরে গিয়েছিল। দেখে ছেলে গেঞ্জি পরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে, একটা হাত কপালে রাখা। ‘আহা রে’ বলে আলতো করে হাতটা নামিয়ে রেখে দিল নীচে। হঠাৎ বাহুর দিকে নজর পড়তেই দেখল ছেলেবেলার সেই ছড়ে যাওয়া দাগটা নেই। মনটা প্রথমে সন্দিহান হয়ে উঠলেও পরক্ষণে ভাবল ছোটো কাটা দাগ, বড়ো হতে ধীরে ধীরে হয়তো মিলিয়ে গিয়েছে।

একদিন সকালে জলখাবার খেয়ে সুধাকর ছেলেকে নিয়ে বেরোল গাড়িতে করে, পোস্ট অফিসে কী কাজ আছে ওর, নামিয়ে দিয়ে অফিস চলে যাবে। ছেলে নেমে যাওয়ার পর গাড়িটা নিয়ে একটু গিয়েছে কী নজরে পড়ল বালিগঞ্জের ঠিকানা লেখা একটা খাম সিটে পড়ে। বুঝতে পারল সূর্যের হাত ফসকে পড়ে গিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি ঘুরিয়ে গেল পোস্ট অফিসে।

গাড়ি রেখে খামটা নিয়ে ভিতরে ঢুকে দেখে, সূর্য একটা কাউন্টারে দাঁড়িয়ে পোস্টাল ক্লার্কের সঙ্গে কথা বলছে। লোকটা ওকে বলছে— গড়িয়ার ওরা কিন্তু আপনাকে খুব মিস করে সুশান্তবাবু, বলে ঘরের ছেলেও এমন হবে না। এত সুন্দর অভিনয় করেছিলেন, বুড়োবুড়ি বুঝতেই পারেনি যে, আপনি তাদের নিজেদের নাতি নন।

কথাটা কানে লাগল সুধাকরের। একপাশে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল তাদের কথাবার্তা।

সূর্য বলল, ‘না তেমন কিছু না, আমার পক্ষে যেটুকু করা সম্ভব করেছি। আমার কি আর এক জায়গায় থাকলে চলবে? আবার যেতে হবে অন্য কোথাও।’

—ওখানে পুরো টাকাটা পেয়েছিলেন?

—হ্যাঁ।

—আচ্ছা আপনি গড়িয়া পোস্ট অফিস থেকে এখানে কবে বদলি হয়ে এলেন?

—এই মাস ছয়েক হল।

—আচ্ছা, কত হয়েছে?

—তিনটে খামে মোট একশো আঠারো টাকা।

—তিনটে নয়তো, চারটে।

—চারটে কোথায়? আপনি তো আমাকে তিনটে খাম দিলেন।

—সেকি? তাহলে আরেকটা কোথায় গেল? বলে সূর্য ঝুঁকে দেখতে লাগল খামটা নীচে পড়ে গেছে কিনা।

কথাগুলো সুধাকরের কানে যেন গরম সিসার মতো ঢুকছিল। ছেলেটা তাহলে আদৌ দার্জিলিং থেকে আসেনি? কলকাতাতেই অন্য একজনের বাড়িতে নাতি সেজে ছিল। ও তাহলে সূর্য নয়, কোনও মতলবে সূর্য সেজে রয়েছে তাদের ঘরে!

—নাও তোমার খাম, গাড়িতে রয়ে গিয়েছিল, বলে খামটা তার হাতে দিয়ে উত্তরের প্রতীক্ষা না করে হনহন করে বেরিয়ে এল।

গাড়িতে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চাবিতে হাত দিয়ে মূর্তিবৎ খানিকক্ষণ বসে রইল সুধাকর। নাকমুখ দিয়ে গরম নিঃশ্বাস বইছিল। বুকটা লাফাচ্ছিল ধড়াস ধড়াস করে। মাথা কাজ করছিল না। ছেলেটা এইরকম ধাপ্পাবাজ? সূর্য সেজে ঢুকে পড়েছে তাদের ঘরে? এমন নিখুঁত অভিনয় করছে বুঝতেই দেয়নি নকল বলে। সকলকে কেমন সুন্দর বশ করে নিয়েছে এই ক’মাসে। কী ধুরন্ধর ছেলে!

আপশোশ হচ্ছিল নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্যে। ওর গোবেচারা চেহারা আর মিষ্টি কথায় ভুলে গিয়ে একেবারে নিজের ছেলে বলেই ধরে বসল সে? একবারও ভালো করে যাচাই করে দেখল না? ওর সবকথা সরল মনে বিশ্বাস করে নিল? নিজে তো ঠকলই, চন্দ্রাকেও ঠকাল? এমন ভুল তার মতো বিচক্ষণ লোক করল কী করে?

প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিল সুবোধ ডাক্তারের উপরেও। সেই যত নষ্টের গোড়া, ওকে সূর্য বলে তাদের ঘরে ঢুকিয়েছিল? কী করে করতে পারল ও এমন জঘন্য কাজ? ও কি সত্যিই ওকে দার্জিলিং থেকে নিয়ে এসেছে, না এখানেই ধরে এনে দার্জিলিং-এর গল্প ফেঁদেছে? কিন্তু ওর মতো বন্ধুলোক এমনটা করবে কেন? তবে কি ছেলেটাও দার্জিলিং ঘুরতে গিয়েছিল, সেখানেই ডাক্তারকে বশ করে সঙ্গে চলে এসেছে?

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...