যখন-তখন অনলাইনে জিনিস কেনা। কুঁড়ের বাদশা কোথাকার! ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। এরা কী ধরনের উটকো জীব!

—কথায় আছে নিজের ভালো তো পাগলেও বোঝে। এরা কি তবে পাগলের চেয়েও অধম? এমনকী, সামান্য পিঁপড়েটাও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন।

গৌরাঙ্গবাবু স্বীকার করেন যে, পরস্পর দুই প্রজন্মের মানুষের মধ্যে ব্যবধান থাকাটা অতি স্বাভাবিক এবং এটা সর্বকালের স্বীকৃত ঘটনা। তাই বলে এতটা?

—বাবুর জিরো ব্যালেন্স অ্যাকাউন্ট। সেই কারণে ন্যূনতম পুঁজিটুকুও রাখার প্রয়োজন মনে করে না। অর্থাৎ খাও-দাও আর বুঁদ হয়ে যাও। কোথাও কাঁচা টাকার লেনদেন নেই। সবই প্রিপেইড। প্লাসটিক কার্ড জিন্দাবাদ! বাবুগিরির চূড়ান্ত। সহ্য করা যায় না, পরাণ যায় জ্বলিয়া। অথচ মুখ ফুটে তাকে কোনও ভালো-মন্দ পরামর্শ দেওয়া যাবে না। ওটা তার নিজের উপার্জিত ধনলক্ষ্মী। বয়স হয়ে গেল চতুর্বিংশতি বৎসর, কিন্তু জীবন সম্পর্কে এখনও অচৈতন্য। অথচ এই বয়সে আমরা কত ম্যাচিওরড ছিলাম! ব্যাংক-এর পাশবুক-টা যে সময় করে কখনও কখনও আপ-টু-ডেট করানো উচিত, সেই ব্যাপারেও কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই।

–বাবু লাইনে দাঁড়াতে চান না। ঘোর অনীহা। তাঁর নাকি সময়ের অপচয় হয়। বাবু মুকুটহীন সম্রাট, তিনি যে কোন রাজ্য পরিচালনায় ব্যস্ত থাকেন কে জানে? ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, আমি নিধিরাম সর্দার! পাশবইটা হারিয়ে যাওয়ার ফলে যার সাহায্যে আবার নতুন করে তৈরি করে আনা হয়েছিল, ব্যাংক-এর নিয়ম অনুযায়ী অতিরিক্ত দেড়শো টাকার বিনিময়ে তিনি যে অ্যাকাউন্ট থেকে ডেবিট করবেন সেই টাকাটা, তারও কোনও উপায় ছিল না। কারণ ভাঁড়ারঘর শূন্য।

ভদ্রলোকের মুখে কথাটা শোনার পরে সেদিন পকেট থেকে টাকাটা হাত বাড়িয়ে দিতে চাইলে ভদ্রলোক তা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। ছিঃ কী লজ্জার কথা !

—মেয়ে হয়ে জন্মালে বিষয়টা বোধহয় এতটা দৃষ্টিকটূ লাগত না। কিন্তু ছেলেদের যে প্রসাধনের প্রতি কোনওরূপ দুর্বলতা থাকতে পারে, কথাটা ওকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ না করলে কেউ বিশ্বাসই করবে না। নামী ব্র্যান্ডেড কোম্পানির পাউডার, ক্রিম, শ্যাম্পু, বডিলোশন আর সাবান ছাড়া তিনি ব্যবহার করতে পারেন না! এ এক অবিশ্বাস্য ঘটনা!

অথচ গৌরাঙ্গবাবুর স্পষ্ট মনে আছে, চাকরি জীবনে প্রথম ট্যুরে যাওয়ার সময় মাত্র দশ টাকার দশটি শ্যাম্পু পাউচ সঙ্গে নিয়ে তিনি ট্রেনে উঠেছিলেন। তাতে দাড়ি কাটা, গায়ে মাখা, মাথায় দেওয়া থেকে শুরু করে কখনও কখনও বিশেষ প্রাকৃতিক ক্রিয়া শেষে বাঁ-হাতটাও ধৌত করতে হতো। হায়, একাল আর সেকালের মধ্যে জমিন আসমান ফারাক !

—দেড় লাখের উপর টাকা খরচ করে বাবু বুলেট গাড়ি কিনেছে অথচ একবারও ভেবে দেখল না যে, তাতে এক কিলো আলুও বহন করা যায় না। বেআক্কেল কোথাকার! একেবারেই আহাম্মক, মোটা মাথা যাকে বলে!

একদিন শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের উদাহরণ পেশ করতেই পুত্র জবাবদিহি করেছিল এই বলে— ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম’। ওনার খালি পায়ে চলতে ভালো লাগত তাই চলতেন। ভালো লাগার বিষয়গুলো সবার ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা। উনি যা করতে ভালোবাসতেন সেটা যে আমাকেও নকল করতে হবে, সেকথা কোথাও লেখা আছে নাকি? তাতে ফলটা কী হল? ইদানীংকালের লোকেরা কেউ তাঁকে চেনে? না কোনও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে তাঁর নাম খোদাই করা আছে?

ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কত শত বাঙালি ফাঁসির মঞ্চে প্রাণ হারিয়েছেন। স্বাধীন ভারতের ক’টা লোক হাতে গুনে তাঁদের নাম বলতে পারবেন? ক’জন স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে স্মারক তৈরি হয়েছে বলতে পারো? তাই ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’। আমি ‘নতুন ছন্দে লিখব জীবন’।

—ওকে কতবার বলা হয়েছে, বালিশের তলায় মোবাইল ফোন রেখে যেন না ঘুমোয়। এখনও পর্যন্ত অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে মোবাইল ফোন ফেটে গিয়ে। কিন্তু কে কার কথা শোনে? এরকম দুর্ঘটনা যে কারওর জীবনে আর কখনও ঘটবে না, তা কি কেউ বলতে পারে? যে-কোনও মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে এমন দুর্ঘটনা। এরা আবার নিজেদের শিক্ষিত বলে! যাদের চোখে আঙুল দিয়ে বোঝানো সত্ত্বেও বোঝার চেষ্টা করে না, তারা এক কথায় নিরেট নির্বোধ।

—বছরে কতবার যে চাকরি ছাড়ে আর ধরে, তার কোনও হিসেব নেই। এরা নাকি কর্পোরেট সেক্টরের উৎসর্গীত কর্মচারী! মিথ্যে ঠাঁট-বাট আর কথায় ফুলঝুরি, এই হল তাদের একমাত্র যোগ্যতা। এরা নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে বার্তালাপ করে। এরা নাকি আমেরিকান ইংলিশ ফলোয়ার। অনেকটা হাঁটু ভাঙা দ’য়ের মতো অবস্থা। যার মধ্যে ভার্ব নেই, টেন্স নেই, মুড নেই— তবু ইংরেজি বলা চাই। অবশ্য কোনও বিষয়ে চিঠি লিখতে গেলে শেষ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান ইংরেজি জানা বাপের কাছেই আবার ফিরে আসতে হয়। ইংরেজিতে শেক্সপিয়র বানানের শেষে আর (R) থাকে, নাকি ই (E) থাকে, তাও হলপ করে বলতে পারে না।

—আমার পুত্র কিনা আবার ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক! হাসি পায় কথা শুনলে! তিন বছরের মধ্যে সাহিত্যের একটি বইয়ের পাতাও খুলতে দেখিনি। বই পড়ার কথা বললে গায়ে জ্বর আসে অথচ সারাদিন মোবাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে কোনও আলসেমি নেই। আমার বাবার সংগৃহীত বই থেকে মিখাইল শ্লোকোভ (Mikhail Sholokhov) রচিত চার খণ্ডে সমাপ্ত ‘অ্যান্ড কুইট ফ্লোজ দি ডন’ (And Quiet Flows The Don) বইটা ওকে অন্ততপক্ষে চারবার অনুরোধ করেছিলাম পড়ে দেখার জন্যে। প্রত্যেকবার একই উত্তর— রেখে দাও, পরে পড়ব। সেই থেকে বাবু এখনও পর্যন্ত পড়ে উঠতে পারলেন না বইখানা। অথচ ফুটপাত থেকে কিনে আনা চেতন ভগত রচিত ‘হাফ গার্ল ফ্রেন্ড’ বইটা দেখে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

—বইটা পড়তে বলে আমি যে সেদিন কতটা ভুল করেছিলাম তা বুঝতে এখন একটুও অসুবিধে হয় না। আমি নিজে পড়ে যতটা তৃপ্ত হয়েছিলাম, আমি ওকেও সেই রস আস্বাদন করাতে চেষ্টা করেছিলাম। অর্থাৎ ‘আপনি আচরি ধর্ম” আমি অপরকে শেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। আমি হেরে গিয়েছিলাম নিজের কাছে। সেইদিনই প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম, পাত্র বিশেষে জ্ঞানদান করা বিধেয়, অন্যথায় অপমানিত হতে হয়। এখন ইংরেজি স্কুলে পড়াবার ফল পাচ্ছি হাড়ে হাড়ে। না শিখেছে বাংলা, না শিখল ইংরেজি! একেক সময় গৌরাঙ্গবাবু নিজের অজান্তে ভাবেন— কী দুর্ধর্ষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। পরের ছেলে নরেনকে নিজগুণে তিনি স্বামী বিবেকানন্দরূপে তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভাবা যায় সেই কথা! অথচ কী আশ্চর্য! আমি নিজের ঔরসজাত পুত্রকে যেমনটি করতে চেয়েছিলাম, তেমন করে তৈরি করতে পারিনি। সবই কপাল! কথায় আছে— ম্যান প্রোপোজ গড ডিসপোজেস।

ঘণ্টাখানেক বাদে বাড়িতে ফিরে এসে দেখেন, বিশাল বিপুল আকারের একটি পিসবোর্ডের তৈরি বাক্স পড়ে আছে মেঝেতে আর ইতস্তত ছড়ানো ছিটানো নানান প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বিশেষ উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে তাঁর মন। মনে মনে ছেলের উপর একটু অসন্তুষ্ট হন।

—কী দরকার ছিল একসঙ্গে এতগুলো অর্থের অপচয় করার?

ভাগ্নি অতসী মামার মনের ভাবখানা বুঝতে পেরে তাকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে বলে, ‘মামা, এগুলো ভাইয়ের গিফ্ট এসেছে আমেরিকা থেকে। ভাই কোনও এক কোম্পানির প্রোডাক্টের উপর নিজের লেখা একটি ক্যাপশন পাঠিয়েছিল। ভাইয়ের লেখাটাকে তারা প্রথম স্থান দিয়েছে। তাই খুশি হয়ে এই উপহারগুলো ভাইকে পাঠিয়েছে। এতে আঠারোটি আইটেম আছে আর দু’হাজার ডলারের একটি অ্যাকাউন্ট চেক পাঠিয়েছে। ওটা ভাইয়ের ব্যাংক-এ জমা পড়বে। ভাবা যায় একথা!

গৌরাঙ্গবাবু সেই মুহূর্তে শিশুর অপার বিস্ময়ভরা দৃষ্টি মেলে বিষয়টা অনুধাবন করার চেষ্টা করছিলেন। কেবলই মনে পড়ছিল সেই আপ্ত বাক্যটি— ‘স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়’। তিনি কি সেই মুহূর্তে চোখ খুলে দিবাস্বপ্ন দেখছেন? সেই মুহূর্তে তার ইন্দ্রিয়গুলো অসাড় হয়ে পড়েছিল বলে বোধ হচ্ছিল। এও কি সম্ভব? তিনি ভুল কিছু শুনছেন না তো? ভুল কিছু দেখছেন না তো? সব সত্যি তো!

কেবলই মনে হচ্ছিল, ছেলের কাছে তিনি হেরে গিয়েছেন। তবুও বারে বারে ঘুরে ফিরে একটা কথাই মনে পড়ছিল। তাই নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন এই বলে— পুত্রের কাছে পিতার পরাজয় সে তো পরাজয় নয়, গর্বের বিষয়। পুত্র সিদ্ধার্থের সিদ্ধিলাভের পরে পিতা শুদ্ধোদন পুত্রের চরণ স্পর্শ করে তাঁকে প্রণাম করেছিলেন। একথা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ করা আছে।

সেই মুহূর্তে গৌরাঙ্গবাবুর নিজেকে ভীষণ অপরাধী এবং ছোটো বলে মনে হচ্ছিল। পুন্নাম নামক নরক থেকে উদ্ধারকারী পুত্রের বিষয়ে তিনি কত কী আবোল-তাবোল ধারণা পোষণ করে বেড়াতেন। কিন্তু আজ এই অপ্রত্যাশিত ঘটনার মাধ্যমে তাঁর সেই ভুলটা ভেঙে গেল৷

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...