পাথুরে স্থাপত্যের বিস্তৃত অঞ্চল দেখার জন্য আদর্শ সময় শীতকাল। যে সময়ে রোদের তীব্রতা মানুষকে কাবু করতে পারে না। আমরা বেঙ্গালুরু থেকে গাড়ি ভাড়া করে দু-দিন তিনরাত্রি সময় নিয়ে এসেছিলাম। চুক্তিমতো আমাদের ৭৫০ কিমি ১০,৮০০ টাকা, টোল, পার্কিংয়ের খরচ ও অতিরিক্ত দূরত্বের জন্য ১১ টাকা প্রতি কিলোমিটার দরে এসেছিলাম। এছাড়া রেল ও সড়কপথে বাসে হসপেট হয়ে এখানে আসা যায়। গাড়ির সুবিধে ভ্রমণপথে নিজের ইচ্ছেমতো ঘোরা যায়। স্থানীয় ভাবে ঘোরার জন্য অবশ্যা অটো ভাড়া পাওয়া যায়। আগে থেকে পরিকল্পনা করে আমরা প্রথমদিনের জন্য রেখেছিলাম বিতালা মন্দির ও তুলাভারা। যদিও সময় থাকায় আমরা লোটাস মহল ও জেনানা এনক্লোজার ওইদিনেই দেখে নিয়েছিলাম।
পৌরাণিক ব্যাখ্যায় রামায়ণের কিস্কিন্দা এই অঞ্চলকে বলা হয়। অর্থাৎ সুগ্রীব, বালির রাজ্য ছিল এখানেই। একে শিবভূমি তথা পম্পাক্ষেত্রও বলা হয়। এই নগরী মৌর্য, চালুক্য, রাষ্ট্রকূট ও যাদব বংশ দ্বারা শাসিত হয়েছে। ১৩৩৬-১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে হরিহর ও বুকা নামের দুই রাজা বিজয়নগর পত্তন করেন, যার রাজধানী হয় হাম্পি। এর পরেও ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হিন্দু রাজাদের আধিপত্য ছিল। তালিকোটা যুদ্ধের পর এই নগরের ধ্বংস আসন্ন হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় হরিহর, প্রযুদ্ধ দেবরায়, কৃষ্ণ দেবরায় ও অচ্যুত আর্য দেবরায় নামক উল্লেখযোগ্য রাজাদের দ্বারা শাসিত হলেও, পূর্বের গৌরবোজ্জ্বল দিন আর ফিরে আসেনি। ফিরিস্থা, আব্দুল রাজ্জাক, ডমিঙ্গোস পিস, ফারনাও নুনিস, ইবন বতুতা, ডুয়ার্তি বারবোসা, নিকোলো দি কন্টি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য পর্যটক এই অংশে পরিভ্রমণ করে তাঁদের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে গেছেন।

একটা সম্পূর্ণ নগর তার অপূর্ব স্থাপত্য নিয়ে অপেক্ষা করে আছে আজকের পর্যটকদের জন্য। এখানে লজ, গেস্টহাউস হোটেল সবই আছে। এছাড়া শহরের স্থায়ী বাসিন্দাদের ঘরবাড়িও আছে। যেহেতু আমরা বেলা দেড়টাতে পৌঁছেছিলাম, তাই দুপুরের খাবার স্থানীয় রেস্তোরাঁ থেকে আনাতে হয়েছিল। স্নান, খাওয়া সেরে বেলা তিনটেতে আমরা আমাদের গাড়িতেই রওনা হলাম কমলাপুর অঞ্চলের বিতালা মন্দিরে।
প্রায় এক কিলোমিটার যাওয়ার পর রাস্তার ডান পাশে দেখলাম তৎকালীন টাকার ছাপাখানা। পাঁচিল সহ এলাকাটার ভগ্ন দশা। ওই চত্বরেই দেখলাম পাথুরে ইটে তৈরি ভগ্নপ্রায় মসজিদ ও তার থেকে ১০০ মিটার দূরত্বে একটা ভেঙে পড়া ওয়াচ টাওয়ার। লোটাস মহলের বাইরে টিকিট ঘর থেকে জনপ্রতি ৪০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটার পর, ওই চত্বরটা ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। এখানে দেখলাম লোটাস মহল, জেনানা এনক্লোজার, রানিদের স্নানাগার, কোষাগার ও হাতিদের থাকার জায়গা।
ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যে তৈরি লোটাস মহলকে চিতরঙ্গি মহলও বলা হয়। এটা পাথুরে ইটের উপর প্লাস্টার করা একটা দ্বিতল ভবন। ঠিক মাঝখানে ছাদের অংশে গোপুরার মতো দেখতে ন’টা ছোটো ছোটো অংশ আছে। গোপুরার সামনের প্রান্তভাগ ক্রমশ বড়ো থেকে ছোটো হয়েছে। সবার উপরে আছে একটা পিরামিডাকৃতির গম্বুজ। প্রবেশদ্বারে স্টুকো আর্ট দেখা গেল। উপরে ওঠার সিঁড়ি এখনও অবশিষ্ট আছে। কাছাকাছিই তৎকালীন নারীদের বাসস্থান, জলমহল ও কোষাগার নিয়ে ৩০,০০০ বর্গমিটার ক্ষেত্রের জেনানা এনক্লোজার। একটা ধাপসহ প্লাটফর্ম দেখলাম, যেটা রানিদের প্রাসাদের ভিত্তি। মূল প্রাসাদটা আর অবশিষ্ট নেই।
জেনানা এনক্লোজারের পুবদিকের দেয়ালের সঙ্গে পর পর একইরকম দেখতে এগারোটা কক্ষ নিয়ে ছিল হাতিশালা। কক্ষগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে ৮৫০ বর্গমিটার ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তৃত। কক্ষগুলোর মাথায় গম্বুজাকৃতির, গোল ও অষ্টভূজাকার চূড়া আছে। কেন্দ্ৰীয় কক্ষের মাথায় বর্গাকার পথযুক্ত ছাদ আছে। হাতিশালার কাছেই পেলাম আয়তাকার গঠনের রক্ষীদের ভবন। এগুলো ঠিক কক্ষ নয়, একটা টানা বারান্দা, যার সামনে পর পর আর্চ। মাঝখানে বারান্দায় ওঠার জন্য সিঁড়ি আছে। এখান থেকে বেরিয়ে আরও আট কিলোমিটার যাওয়ার পর পেলাম বিতালা মন্দির।
লোটাস মহলে জনপ্রতি চল্লিশ টাকায় যে-টিকিট সংগ্রহ করেছিলাম, তাতেই বিতালা মন্দিরে ঢোকা গেল। মূল মন্দিরে যেতে প্রায় এক কিলোমিটার পথ যেতে হয়। তাই আসা যাওয়া নিয়ে জনপ্রতি কুড়ি টাকায় লম্বা লাইন দিয়ে ট্রেকারে উঠলাম। দ্বিতীয় দেবরায় এই বিষ্ণু মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে এমনটা জানা গেছে। পরে কৃষ্ণ দেবরায় এর পরিবর্ধন করেন। ১৫০০ ও ১৬০০ শতক জুড়ে মূলত রাজ পরিবারের ব্যবহারের জন্য এই মন্দিরটা তৈরি হয়েছিল।
ঢুকেই একটা পাথরের রথ চোখে পড়ল। যেটা আগে চালানো হতো। ক্ষয় রোধের জন্য বর্তমানে ভূমিতে আটকে দেওয়া হয়েছে। এটা বিষ্ণুর বাহন গারুডার পবিত্র স্থান। রথের উপরের ইট-নির্মিত অংশ বর্তমানে ভেঙে পড়েছে। পূর্বমুখী এই মন্দিরের বিস্তৃত মণ্ডপ অতিক্রম করলে বিষ্ণুর গর্ভগৃহ নজরে পড়ে। বর্তমানে বিগ্রহ না থাকলেও, ওই অন্ধকার গর্ভগৃহ প্রদক্ষিণ করার রীতি আছে। মহামণ্ডপ ছাড়াও আছে কল্যাণ মণ্ডপ ও উৎসব মণ্ডপ। এই অঞ্চলের প্রায় প্রত্যেকটি মন্দিরের সঙ্গে ছিল ধর্মশালা ও বাজার।
(ক্রমশ…)





