(রাজবাড়িতে ঢাক-ঢোল, কাঁসরঘণ্টা, শঙ্খধ্বনি বাজছে। চণ্ডীপাঠ, স্তোত্রপাঠের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। শব্দ জোরালো হতে হতে ফেড আউট হয়ে যায়। এবার জোরালো কান্নার শব্দ ভেসে আসে। ধীরে ধীরে সেই কান্নার শব্দও ফেড আউট হয়ে যায়। মঞ্চে আলো পড়ে। তিনজন নাচের তালে তালে এগিয়ে এসে গান ধরে)।
গান—
রাজার চোখ কেন ছলছল? রাজা কাঁদছে কেন বল…. রাজার দু’চোখ ভেসে যায় ও চোখে জল কি শোভা পায়! কাঁদছে রাজা, কাঁদছে শয়নে, বান এল ওই রাজার নয়নে, রাজার এত দুঃখ কীসের বল… রাজার কেন কান্নাই সম্বল!
রাজার চোখে জল
কেন ঝরছে অনর্গল?
কান্না শুনে তিন রানিমার
মন হল চঞ্চল
কাঁদছে রাজা,
কাঁদছে কেন বল…
রবি: চোখের জল, কান্না এসব তো গরিবগুর্বো প্রজাদেরই মনোপলি। তা সেই গরিবদের একচেটিয়া অধিকারে রাজার হস্তক্ষেপ! এ তো ভালো কথা নয়।
সোম: ভালো কথা নয়ই তো। তাছাড়া রাজারা তো চিরকাল কাঁদিয়েই এসেছে। সেইটেই তো স্বাভাবিক। সত্যিই তো ক্রন্দন বিষয়টিতে তো প্রজাদেরই একচেটিয়া অধিকার। সেখানে স্বয়ং রাজা কাঁদছে, এ তো ভালো কথা নয়। কিন্তু, কথা হল গিয়ে রাজার এরকম ভেউ ভেউ করে কেঁদে এমন অস্বাভাবিক আচরণ ও অনধিকার চর্চার কারণ কী?
মঙ্গল: কারণ, রাজা শোক পেয়েছে। বড়ো শোক পেয়েছে রে। শোক সইতে পারছে না। তাই কাঁদছে।
রবি: শোক পেয়েছে? তা শোক পেলে কাঁদবে কেন? রাজারা তো শোক পেলে কাঁপা কাঁপা গলায় লেকচার দেয়। তাই তো দেখে এসেছি। খামোখা কাঁদে কেন?
মঙ্গল: আরে এ তো আর যুদ্ধে মৃত বীর শহীদদের উদ্দেশ্যে শোক নয়। আবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মৃতদের পরিবারকে সান্ত্বনা দেবারও শোক নয়। খরায় পোড়া বা বানভাসি দুর্গতদের প্রতি শোকজ্ঞাপনও নয়।
রবি: তবে কি রাজার ঘোড়া ম’লো?
মঙ্গল: ঘোড়া কেন? রাজার বাপ, দাদা, ভাই, বোন, মা, ঠাকমা— কেউ মলেই এমন মরাকান্না কাঁদে না। শোকে পাথর হয়ে গেছে এমন ভাব করে। তবু যদি প্রোটোকল ভেঙে কোনও কোনও রাজা কেঁদেও ফেলে, সে কান্না এত লাস্টিংও করে না। হাসিচাপা কান্না কিনা। সম্পত্তির উত্তরাধিকার যত কমে, রাজার ততই পোয়াবারো। অবশ্য পুত্রশোকে কোনও কোনও রাজা সত্যিই কাঁদে। সোম: তা এই রাজার তো পুত্তুরই নেই। সুতরাং এখানে তো পুত্রশোকের প্রশ্নই নেই।
রবি: তবে কীসের শোক? বলছ যখন খুলেই বলো না। ঝেড়েই কাশো না হে মঙ্গল।
মঙ্গল: রাজা কাঁদছে চুলের শোকে।
রবি: চুলের শোকে!
সোম: সেটা কেমন?
মঙ্গল: রাজার তো জ্বরই সারছিল না। পাক্কা দু’মাস ভুগল রাজা। যমে মানুষে টানাটানি চলছে। রাজার একহাত ধরে টানছে যম। আর এক হাত ধরে টানছে রাজবদ্যি। কবরেজ দিনরাত নানা ধরনের ওষুধ গুলে গুলে রাজাকে খাওয়াচ্ছে। জ্বর কিছুতেই সারে না। কপালে জলপট্টি দিতে দিতে তিন রানির হাতে হাজা হওয়ার উপক্রম হল। তবু জ্বরের নট নড়নচড়ন। শেষে রাজবদ্যি এমন কড়া দাওয়াই চার্জ করল যে, জ্বর তো বাপ-রে মা-রে বলে পালাল। তবে পালানোর সময় মাটি থেকে দু’হাতে ঘাস ছেঁড়ার মতো করে রাজার মাথার চুল সব টেনে তুলে নিয়ে গেছে।
রবি: তার মানে?
সোম: সেটা কেমন?
মঙ্গল: মানে রাজবদ্যি এমন কড়া দাওয়াই দিয়েছে, তাতে জ্বর তো সেরেছে বিলক্ষণ। কিন্তু কুলক্ষণ হল এই যে, রাজার মাথার চুল সব ঝরে পড়ে ময়দান একেবারে ফাঁকা। এবার জ্বরের ঘোর কাটার পরে নিজের মাথায় হাত বোলাতে গিয়ে তারপর আয়না দেখে সে এক বীভৎস কাণ্ড। রাজার সে কী গলাফাটানো চিৎকার!
দৃশ্যান্তর
রাজা: একি! আমার মাথায় কে ফুটবলের ব্লাডার সেঁটে রেখেছে? খোলো খোলো। শিগগির খোলো এটাকে। (বিছানায় উঠে বসেছে রাজা। পাশে থতমত, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজবদ্যি। মেজোরানি ও ছোটোরানি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। বড়োরানি রাজার বুকে হাত বোলাচ্ছে। সান্ত্বনা দিচ্ছে। রাজাকে থামাবার চেষ্টা করছে)।
রাজা: রাজবদ্যি, চুপ করে দাঁড়িয়ে আছো কেন? আমার মাথা থেকে এই ফুটবলের ব্লাডারটা টেনে খোলো।
রাজবদ্যি: আজ্ঞে, ওটা তো খোলার নয়। ওটা যে খুলি। ওটা কী করে খুলি?
রাজা: কী করে খুলবে মানে? যেভাবে বসিয়েছ, সেভাবেই টেনে খোলো।
রাজবদ্যি: আজ্ঞে মহারাজ, ওটা টেনে খোলার অসুবিধে আছে।
রাজা: অসুবিধে? কীসের অসুবিধে?
রাজবদ্যি: আজ্ঞে, ওটা তো ফুটবলের ব্লাডার নয়। লোকে বলে ওটা টাক।
রাজা: টাক!
রাজবদ্যি: লোকে তাই বলে। তবে আমি বলব, ওটা টাক না। ওটা আপনার মাথার ঘিলুর ঢাকনা। ওটা যেমন আছে থাক না।
রাজা: মাথার ঘিলুর ঢাকনা? টাক না?
বড়োরানি: (রাজার বুকে হাত বোলাচ্ছে) ওগো, তোমার শরীর দুর্বল। এখন ও প্রসঙ্গ থাক না।
রাজা: থাকবে মানে কী? অ্যাঁ? থাকবে মানে কী? (ফের হাতের আয়না মুখের সামনে ধরে) ছ্যা ছ্যা ছ্যা। এ তো রাজবদ্যি আমার সাড়ে সর্বনাশ করে ছেড়েছে। দু-মাসের জ্বরে চুল সব ঝরে গিয়ে মাথা একেবারে ফাঁকা! এত্ত বড়ো পেল্লাই টাক! আর তুমি কিনা বলছ, ও প্রসঙ্গ থাক! এ তো আমি নিজেকে নিজেই চিনতে পারছি না গো রানি। এই কুৎসিত চেহারা নিয়ে রাজ দরবারে গেলে হবে আমার সম্মানহানি। (ভেউ ভেউ করে কাঁদতে শুরু করে রাজা)
বড়োরানি: ওগো, তুমি কেঁদো না। চুপ করো। তোমার শরীর দুর্বল।
রাজা: (তীব্র স্বরে কাঁদে) চুপ করব কীগো রানি? আমার কী চুল ছিল আমি জানি। আমার তো বিষ খেয়ে মরতে ইচ্ছে করছে। একি! এ তো আমার একপাটি দাঁতও দেখছি নড়ছে। হারামজাদা রাজবদ্যি আমি তোমার গর্দান নেব। ফাঁসির হুকুম দেব।
রাজবদ্যি: (স্বগতোক্তি) রাজবদ্যিকে হারামজাদা! অসম্মানজনক উক্তি। নেই মিনিমাম রেসপেক্ট!





