রাজা: রেসপেক্ট? হাউ কুড ইউ এসপেক্ট? বুড়ো সেয়ানা ঘুঘু। আমি তোমাকে শূলে চড়াব। শূল চেনো, শূল? সব চিকিৎসা ভুল। এখন ভালোয় ভালোয় ফিরিয়ে দাও আমার চুল। (কাঁদতে কাঁদতে) আমার চুলের কী কোয়ালিটি ছিল তুমি বলো রানি?
বড়োরানি: জানি গো জানি। চুলে বিলি কাটব কিগো, এত ঠাস বুনোট, আঙুলই বিধত না চুলে।
রাজা: আর এখন এই হতচ্ছাড়া রাজবদ্যির চিকিৎসার ভুলে… মাথাটা আমার তবলার বাঁয়া করে দিয়েছে গো। আর কী? এবার ছোটোরানি গান ধরো। আর বড়োরানি চুলে বিলি কাটার বদলে এখন সঙ্গত করো। টাকে তবলা বাজাও। মেজরানি তামাশা দেখুক। কই ছোটো রানি? এসো গান ধরো, সেই যে। সেই গানটা। না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখিজলে, না বুঝে… (প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে রাজা)।
রাজবদ্যি: মহারাজ, আপনার যে অসুখ করেছিল, তাতে হাজারে একজন বাঁচে। আর সে বাঁচাও মরারই শামিল। পঙ্গু হয়, নয়তো অঙ্গহানি হয়। তবু তো ওষুধের জোরে আপনার প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিক ঠিকই আছে। শুধু চুলটাই যা বিট্রে করল!
রাজা: চুল বিট্রে করল? না তোমার ওষুধ বিট্রে করল? তুমি বুড়ো হয়েছ। তোমায় বাহাত্তরে ধরেছে। তোমাকে রাখতে অনেকেই মানা করেছে। কোনও ইয়াং ডাক্তারকে রাখা উচিত ছিল আমার। তোমাকে চাকরিতে রাখাটাই আমার ভুল। দিতে হল সেই ভুলের মাশুল। ঝরে গেল আমার সাধের চুল।
দৃশ্যান্তর
মঙ্গল: রাজা চন্দ্রকিরণ তালুকদারের মাথার চুল শীতের ঝরাপাতার মতো ঝ’রে পড়ে গেছে। দেশেবিদেশে সর্বত্র এই খবর ছড়িয়ে পড়েছে হাওয়ার আগে। এদিকে প্রতিবেশী রাজ্য উলুকনগরের রাজার সঙ্গে আমাদের এই সুলুকনগরের রাজার সম্পর্ক আদায় কাঁচকলায়। সাপে-নেউলে। তা সেই উলুকনগরের রাজা আমাদের এই রাজা চন্দ্রকিরণের বিপর্যয়ে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা দিয়েছেন। একেবারে মোক্ষম ঘা।
রবি: মোক্ষম ঘা? কীসের মোক্ষম ঘা? কেন?
মঙ্গল: আরে গতবছর। বুঝলে এই গতবছরে রাজাদের মধ্যে যারা পদ্যটদ্য লেখে, তাদের নিয়ে একটা বিশ্বকবি সম্মেলন হল উলুকনগরে। সেই সম্মেলনে পদ্যের মাধ্যমে এক রাজা আরেক রাজাকে ঠেস দিচ্ছে। ডাউন দিয়ে গায়ের জ্বালা মেটাচ্ছে। আর আমাদের রাজার টার্গেট হল আয়োজক উলুকনগরের রাজা ত্রিভঙ্গমুরারী চাকলাদার। রাজা চন্দ্রকিরণ দেখলেন, উলুকনগরের রাজার চুলে অকালে পাক ধরেছে। ব্যস, আমাদের রাজাকে আর পায় কে। তিনি রসিয়ে রসিয়ে ছড়া কাটলেন, ‘হায় প্রজারা রাজার আসল খবর রাখেনি। চুল পেকেছে কিন্তু রাজার বুদ্ধি পাকেনি।’ শুনে তো উলুকনগরের রাজার মুখ একেবারে চুন।
সবাই বলল— কই হে জবাব দাও, জবাব দাও। কিন্তু সে রাজার মুখে আর বাক্যি সরে না। এখন আমাদের রাজার মাথা ফাঁকা গড়ের মাঠ হওয়ার খবর পেয়ে উলুকনগরের সেই রাজা ওই অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছে।
সোম: কী প্রতিশোধ?
মঙ্গল: উলুকনগরের রাজা সেই অপমানের জবাবে লিখে পাঠিয়েছে, বেল পাকলে কাকের কী? আর চুল পাকলে টাকের কী? খামের উপর আবার লিখেছে, হাতে গড়া গরম ছাড়া।
রবি: এ তো সত্যিই মোক্ষম ঘা।
মঙ্গল: মড়ার উপর সেই খাঁড়ার ঘা খেয়ে রাজার আরও দশগুন কান্না বেড়ে গেছে।
সোম: তাই এত কান্না ভেউ ভেউ। যেন সমুদ্দুরের ঢেউ।
দৃশ্যান্তর
রাজা: শোনো রাজবদ্যি, তোমাকে আমি একমাস সময় দিলাম। এই একমাসের মধ্যে তুমি আমার চুল গজানোর ব্যবস্থা করো। নতুন ফর্মুলা বের কর। ওষুধ তৈরি করো।
রাজবদ্যি: চিকিৎসায় আমি রাখিনি কোনও ফাঁক। তবু কেন যে এই অলক্ষুণে টাক! আমি বলি কী যা গেছে তা যাক৷ কোনও কিছুই কি চিরকাল থাকে? ধরে রাখতে পারবেন এই দেহটাকে? হা ঈশ্বর। এই দেহটাই তো নশ্বর। চুল কোন ছার। তবু তো আপনার টাকটাকে রেখে চুল উড়ে গেছে। যদি দেহটাকে রেখে প্রাণপাখিটাই উড়ে যেত?
রাজা: (ভেঙায়) উড়ে যেত? তাহলে নগরকোটাল তোমার মুণ্ডুটাকে নুন মাখিয়ে চিবিয়ে খেত।
রাজবদ্যি: মহারাজ, আপনি মিছিমিছি রাগ করছেন। ধরুন বয়স হলে চোখের দৃষ্টি কমে যায়। দাঁত নড়ে, পড়ে যায়। আর চুলে হয় ধরবে পাক, নয়তো ঝরে হবে টাক।
মেজোরানি: পাক ধরলে কালো মেহেন্দি লাগিয়ে দিতুম, কেউ ধরতেই পারত না।
রাজবদ্যি: আচ্ছা রানিমা, মহারাজের দৃষ্টি ক্ষীণ হলে উনি কি চশমা নেবেন না। দাঁত নড়ে পড়ে গেলে উনি কি দাঁত বাঁধাবেন না? চুল পাকলে রং করাতে আপত্তি নেই যখন, তখন টাকে পরচুলা পরিয়ে দিন না।
রাজা: না না। পরচুলা নয়। নো ভেজাল। নো ভুজুং ভাজুং। আসল চুল চাই আমার। ঘোড়ার ল্যাজের মতো থিকনেস চাই। রাজবদ্যি: (জনান্তিকে) মাথাটা কি ধানের খেত? লাঙল দিলাম, বিচন করলাম, সার দিলাম, অমনি ধানের চারার মতো গজিয়ে উঠবে চুল।
রাজা: কী বিড়বিড় করছ?
রাজবদ্যি: না মহারাজ ফর্মুলার কথা ভাবছি।
রাজা: ভাবো, ভাবো, ভেবে ভেবে ফর্মুলা বের করো। নইলে তোমার গর্দান নেব আমি।
দৃশ্যান্তর
(রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল। রাজা বিছানায় বসে বসে অঝোরে কাঁদছে আর মনের দুঃখে শ্যামাসংগীত গাইছে৷)
রাজা: আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরাল, সকলি ফুরায়ে যায় মা… (রাজমাতার প্রবেশ, মাকে দেখে) মা, মাগো, দেখো রাজবদ্যি আমার কী হাল করেছে।
রাজমাতা: মরেছে! ও মা, এ কীগো! কার অভিশাপে ঠাকুর আমার সোনার চাঁদ ছেলের এমন দশা করলে গো ঠাকুর? ওরে তোদের বংশে তো কারও মাথায় টাক ছিল নারে। তবে তোর এমন দশা হল কী করে?
রাজা: (প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ে) ওই রাজবদ্যি মা। সে-ই যত নষ্টের গোড়া।
রাজমাতা: রাজবদ্যি না ঘোড়া। দূর করে দে বজ্জাতটাকে। আমি আর দোষ দেব কাকে? সবই আমার কপালের দোষ। আপশোস করে কী লাভ এখন?
রাজা: মা, মাগো, এ আমার কী হল মা?
রাজমাতা: (রাজার টাকে হাত বোলায়) কাঁদিস নারে বাছা আমার, কাঁদিস না। (রাজা রাজমাতার আঁচলে সর্দি মোছে) ধ্যাৎ, কী নোংরা ছেলেরে বাবা! দিলি তো শাড়িটার বারোটা বাজিয়ে। আজই ভাঙলুম। সর্দি মাখালি তো? ছাড় ছাড়। আঁচল ছাড়।
রাজা: সর্দি নয় মা। সর্দি নয়। জল। নাকের জলে চোখের জলে একাকার। জানো মা? চান করতে গিয়ে আয়নায় দেখি, মাথায় শাওয়ারের জল পড়ে নাচছে তা তা থই থই। সাজানো শ্যাম্পুর শিশিগুলো যেন আমায় বিদ্রুপ করে বলছে, তোর চুল কই? তোর চুল কই? অভ্যেসের বশে চিরুনি নিচ্ছি হাতে আরও কান্না পাচ্ছে তাতে। মা, আমার বাঁচার সাধ নেই মা।
রাজমাতা: ও কথা বলতে নেই বাছা আমার। বুকের পাঁজর, চোখের মণি, সোনার খনি। মাথায় তোর বেসন আর ডিমের পেস্ট বানিয়ে লাগিয়ে দেব কাল থেকে। রাতে সাঁচি পেঁয়াজের রস দেব মাখিয়ে। দেখবি কেমন চুল উঠবে জাঁকিয়ে।





