ভয় করছিল মঞ্জুর। স্যারের দিকে তাকাতেও লজ্জা করছে। মাথা নামিয়ে চুপ করে বসে অপেক্ষা করছে এরপর কী বলবেন অমৃতদা।

—তোমার কি ভয় করছে? তাহলে চলো ড্রয়িং রুমে বসবে।

ভাবছিল কথাটা কীভাবে শুরু করা যায়। এদিকে সন্ধের পর একটা মেয়েকে ঘরে আটকে রাখলে বদনাম হবে সে খেয়াল নেই৷ একটু বাদে চা খাবে কিনা জানতে চাইলেন।

সত্যি ওর ভীষণ ভয় করছে। স্যারের এমন অদ্ভুত আচরণ বিশ্বাস করতে পারছে না। কোনওদিন এরকম অস্বস্তি হয়নি। কী বলবে তাকে, আটকে রেখেছেন কেন? মঞ্জিমা কিছুতেই বুঝতে পারছে না। ভালো-মন্দ সবরকম ভাবনা এসে ওকে পাগল করে দিচ্ছে। ভয়-মিশ্রিত ভালোলাগায় বুক ধড়ফড় করছে। হয়তো তেমন কিছু বলবেন না, শুধু শুধু ভয় পাচ্ছে। তাহলে কি নতুন কিছু নোট’স দেবেন? তবু কেমন যেন একটা অস্বস্তি লাগছে ওর। বন্ধুদের সঙ্গে চলে গেলে ভালো হতো। অথচ কী এক অমোঘ আকর্ষণে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেও পারছে না।

সংকোচের সঙ্গে বলল, ‘না চা খাই না।’

সেই সমাজ একটি মেয়েকে অন্য পুরুষের সঙ্গে এক ঘরে থাকাটা ভালো চোখে দেখে না। কেউ জানলে নিশ্চিত ভাবে সারা পাড়ায় দুর্নাম রটিয়ে দেবে। শিক্ষক বলে ছাড় পাবেন না অমৃত। কিছুক্ষণ পেরিয়ে যেতে হঠাৎ অমৃতর কী খেয়াল হল, ‘বললেন ছাদে চলো। আমাদের ছাদটা আজ তোমাকে দেখাব।’

ইতস্তত করছে মঞ্জু।

—চলোই না।

ধীর পায়ে মঞ্জুর কোমল হাতটা ধরে আস্তে আস্তে ছাদে উঠলেন। দরজাটা আস্তে করে টেনে চিলেকোঠার ঘরে নিয়ে গেলেন মঞ্জুকে। ছাদের সামনের অংশটা খোলা। এই সময় ছাদে জমাট অন্ধকার থাকার কথা। কোনও আলো জ্বালানো হয়নি, তবু সারা ছাদে সাদা আলোর বন্যা। অপার্থিব সেই আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। এত আলো ওই ঘরে এসে ঢুকছে যে, আলাদা করে লাইট জ্বালানোর প্রয়োজন নেই। আঁধার রাতে মাথার উপরে চাঁদকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

কোনও ভণিতা না করে অমৃত সরাসরি বলল, “শোনো মঞ্জু আমি কখনও প্রেম করিনি। প্রেমে পড়েছি অস্বীকার করব না।

একজনকে ভালো লাগত, এখনও ভালো লাগে। তুমি কি জানো কে সে?’

মঞ্জু মাথা দু-দিকে নাড়ল। সে জানে না! স্যারের কাকে ভালো লাগে, তার জানার কথা নয়।

—জানো না?

—তোমাকে ভালোবেসেছি।

শোনার পর অজানা শিরশির অনুভূতিতে মঞ্জু আবার চমকে উঠল।

—কোনওদিন কি টের পাওনি? মেয়েরা তো সহজেই বুঝতে পারে জানতাম। ভালো লাগাটা এতটাই তীব্র যে, আর কাউকে মনে মনে ভাবতেই পারি না। অবশ্য তুমি তখন খুব ছোটো ছিলে। তবে একটা কথা বলে রাখি, তোমাকে বিয়ে করে সংসার করব আমি এমন স্বপ্ন দেখি না। ভালোবাসলে বিয়ে করতে হবে এর কোনও মানে নেই।

মঞ্জু চুপচাপ শুনছে। স্যার তাকে এসব জটিল কথা বলছেন কেন। কবে ভালো লেগেছিল সেটা মনেও রেখেছেন, অথচ সে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।

এসব শুনে আর থাকা যায় না। এরপরে কী হবে কে জানে। পাড়া-প্রতিবেশী বাড়ির বাইরে এসে হাজির হলে আত্মহত্যা করতে হবে মঞ্জুকে! বাবা-মায়ের মুখ মনে পড়াতে অস্থির লাগছে। অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে একদৌড়ে নেমে যাবে, সেটাও পারল না! এবার অমৃত ওর কাছে এগিয়ে এসে ওর কাঁধে দু’হাত রাখলেন।

—ভালোবাসি কিন্তু কখনও বিয়ে করার কথা ভাবতেই পারি না। আমি আর এখানে থাকব না ঠিক করেছি। তোমার ভালোর জন্য থাকতে চাই না। তাছাড়া আমি ক্রমশ আধ্যাত্মিক মনস্ক হয়ে যাচ্ছি। একটা কথা জেনে রাখো, তোমাকে বড়ো হতে হবে। সমাজের জন্য ভাবতে হবে। স্বনির্ভর হতে হবে। বিয়ে করা হল প্রেমের সমাধি। তোমাকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, তারপর যত ইচ্ছে দেশ-বিদেশ ঘুরবে। শুধু বারাণসী কেন, অনেক জায়গায় ভ্রমণ করার সুযোগ পাবে। আমাদের মা-মাসিরা কীভাবে বেঁচে আছেন ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। তবে, এটাও ঠিক— সব পুরুষ তাদের নারীকে পরাধীন করে রেখে সরাসরি অপমান করে না। অসুবিধে হলে বুঝতে দেয় না বলে অনেক সম্পর্ক টিকে গেছে।

অমৃত নাকি তার মা-কে দেখেই ঠিক করেছেন, আর যাইহোক, কোনও মেয়েকে সংস্কারের ঘেরাটোপে আবদ্ধ করবে না।

—তুমি চাইলে কাউকে বিয়ে করে সংসারী হতেই পারো। তবে তার আগে তোমাকে নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করতে হবে।

এসব শুনে মঞ্জুর গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। কী বলবে স্যারকে। ওঁর কথাগুলো বোঝার মতো বুদ্ধি ততখানি হয়নি। একটু একটু বুঝতে পেরেছে এই মানুষটা সবার থেকে আলাদা। অমৃত এও বললেন— একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। তোমার কথা মনে পড়বে কিন্তু মেনে নেব।

—এই সিদ্ধান্তের কথা আপনার বাড়িতে জানিয়েছেন? মঞ্জু এটুকুই জিজ্ঞেস করেছে।

—বাড়িতে বললে কেউ যেতে দেবে নাকি। শুধু তোমাকে বলে রাখলাম। হয়তো বারাণসীতে যেতে পারি। কখনও গেলে আমার গোঁজ কোরো।

—এসব কেন বলছেন। সাধু হয়ে যাবেন? বলতে গিয়েও চুপ করে যায়। এসব কেন বলছেন, ভেবে পেল না। তবে বুঝেছে স্যার ওকে খুব বিশ্বাস করেন, না হলে গোপন কথাটা একমাত্র তাকেই আলাদা করে জানিয়ে রাখতেন না।

শেষ অনুরোধ রাখতে পারেনি। যখন বললেন, তুমি শুধু একবার আমাকে ছুঁয়ে বলো— আমাকে ভালোবাসো। চমকে উঠেছিল মঞ্জিমা!

অমৃত ওকে ভালোবাসেন বলছেন, এদিকে বাড়ি ছেড়ে চলেও যাবেন— এসব শুনে সব তালগোল পাকিয়ে গেছিল। ভালোমন্দ কিছু না বলে তক্ষুনি সিঁড়ি ধরে নীচে নেমে আসে। অমৃত পৌঁছে দেবেন সে তোয়াক্কা না করে সেদিন একটু রাতে বাড়িতে ফিরেছিল। সারা সপ্তাহ জুড়ে কেমন একটা মন খারাপের পরশ, উদাসীন অপরাহ্নের মতো নির্জনতা বুক জুড়ে। কী ঘটেছে ভুলেও কাউকে জানাল না। আজীবন গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, জানাতে পারবে না কিছুতেই।

ঠিক তার পরের সপ্তাহে এক ভোরে অমৃত বসু নিখোঁজ হলেন। কোথায় চলে গেছেন কেউ জানে না। মঞ্জুও চুপ করে থেকেছে। এতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে আজও কেউ জানে না। এরপর কালের নিয়মে মঞ্জুর বিবাহ হয় কলকাতায়। পাত্র ভালো, কিন্তু স্বভাবে অমৃতর বিপরীত। দাম্পত্য জীবন মোটামুটি সুখেই কেটেছে।

এরপরে অমৃতর সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আজ পর্যন্ত সমাজের ভালোর জন্য তেমন কিছু করতে পারেননি ঠিকই, তবে সেদিনের ভিতু কিশোরী মঞ্জু পরে স্বাবলম্বী নারী হয়েছেন। তাই এখনও কয়েকটি অনাথ বাচ্চার লেখাপড়ার খরচ বহন করছেন। আজকে অমৃত জানতে পারলে হয়তো খুশি হতেন, কিন্তু সে উপায় নেই। কোথায় তিনি। এখন কি বারাণসীতেই থাকেন? আদৌ জীবিত আছেন কিনা কে বলতে পারবে।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...