নৌকা চলতে শুরু করেছে। মঞ্জিমাদেবীকে গ্রুপের কেউ একজন বলল, ‘মাসিমা ভয় পাবেন না। একটু পরে সব আত্মস্থ হয়ে যাবে। বলছিলেন, আপনার অনেক দিনের শখ গঙ্গা আরতি দেখবেন। একটু পরেই আরতি শুরু হবে। আমরা এখনই তীরে পৌঁছে যাব।' সবাই দেখছে সব ঘাটগুলো আলোয় মোড়ানো আর গঙ্গার জলটা ভীষণ কুচকুচে কালো দেখাচ্ছে। স্বর্গীয় পরিবেশ দেখে খুব ভালো লাগছিল সকলের।
অদ্ভুত মায়ার শহর বারাণসী। অহল্যা ভূমিতে এলে পুণ্যার্থীদের ভক্তি বেড়ে যায়। এখন নৌকার উপর দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে করজোড়ে প্রণাম সেরে নিচ্ছেন সকলে। প্রত্যেকটা ঘাট পেরোনোর সময় প্রণাম সেরে নিচ্ছেন মঞ্জিমাদেবী আর যেসব মহিলা পুরুষ একসঙ্গে কাশীধামে ঘুরতে এসেছেন। পর পর সরে সরে যাচ্ছে ঘাটগুলো। সব ঘাটের নাম একের পর এক বলে যাচ্ছেন দক্ষ মাঝি।
মোটর বোটের আওয়াজে কিছু শোনা যাচ্ছে না। ঠিক সেই সময় কে যেন বেশ জোরে জোরে তীর্থযাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলল, 'ওই তো দশাশ্বমেধ ঘাট। ওই তো সামনে। আমরা এসে গেছি। সেই কবে থেকে একেকটা ঘাটের আড়ালে একেকরকম ঐতিহাসিক কাহিনি শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে।'
—না না, ওটা দূরে। মাঝি নৌকা ঘুরিয়ে ঘাটের কাছে এনে জানালেন, ‘কয়েকটা ঘাট পেরোলে দশাশ্বমেধ ঘাট আসবে।’ ওদের নৌকা বিশেষ একটা ঘাটের কাছে এসে পড়তেই সব যাত্রীরা আবার উঠে দাঁড়ালেন।
—এই ঘাটের নাম কী? কে হঠাৎ জানতে চাইলেন।
—এটা হরিশচন্দ্র ঘাট।
একজন বললেন প্রতিদিন অগুনতি চিতা সাজানো হয় এখানে। আগুন নেভেই না। একের পর এক দাহকর্ম সারা দিনরাত চলতে থাকে। সবাই দেখে নিন।
শুনে গা ছমছম করে উঠল মঞ্জিমাদেবীর। হঠাৎ মনে পড়ে গেল অমৃত-র কথা। একবার শুনেছিলেন তিনি নাকি এখন এখানেই থাকেন। এখন মঞ্জিমাদেবীর বয়স যদি পয়ষট্টি হয়, তাহলে অমৃত এখন সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। এদিকে থাকেন, কিন্তু কোথায় থাকেন কেউ জানে না। ঠিকানা জানা থাকলে একবার ওঁর সঙ্গে দেখা করে নিলে ভালো হতো। হয়তো আগেই এটা করা উচিত ছিল। এতগুলো বছর কেন একবারও যোগাযোগ করেননি। মাঝে মাঝে খুব আপশোশ হয়, তিনি একমাত্র তাকে বলে গেছিলেন। একবার সাহস করে এদিকে বেড়াতে এসে খোঁজ করা কি যেত না? এরপর কত বছর পেরিয়েছে। জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই পার করে এসে খুব আপশোশ হচ্ছে। বয়স হলে মনে হয় কে কখন চলে যাবে, পুরোনো রাগ অভিমান মুছে আর একটিবার যদি পাশাপাশি বসে কথা বলা যেত।





