ঘুম মানুষের স্বাস্থ্য এবং সুস্থতা বজায় রাখার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জৈবিক প্রক্রিয়াগুলির মধ্যে একটি। এর গুরুত্ব সত্ত্বেও, আধুনিক জীবনে, বিশেষকরে কিশোর এবং তরুণদের মধ্যে পর্যাপ্ত ঘুম ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে। গত প্রায় এক দশক ধরে গড় ঘুমের সময়কাল উদ্বেগজনক ভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই বিষয়ে কলকাতা-র আনন্দপুর অঞ্চলে অবস্থিত ফর্টিস হাসপাতাল-এর ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. জয়দীপ ঘোষ জানিয়েছেন, অনেক কিশোর-কিশোরী এখন নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে দুই থেকে তিন ঘন্টা কম ঘুমোচ্ছে। এই ক্রমবর্ধমান ঘুমের ঘাটতি মানসিক এবং শারীরিক উভয় স্বাস্থ্যের জন্যই গুরুতর প্রভাব ফেলছে, যা ঘুমের স্বাস্থ্যবিধিকে একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য উদ্বেগের বিষয় করে তুলেছে।
কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশ এবং মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রতি রাতে আট থেকে দশ ঘন্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। দুর্ভাগ্যবশত, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, শিক্ষাগত চাপ এবং ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে স্বাভাবিক ঘুমের চক্র উল্লেখযোগ্য ভাবে ব্যাহত হয়েছে। অনেক তরুণ-তরুণী এখন দেরিতে ঘুমোতে যায় এবং তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে, যা দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব তৈরি করে।
অপর্যাপ্ত ঘুমের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক পরিণতিগুলির মধ্যে একটি হল মানসিক স্থিতিশীলতার উপর এর প্রভাব। ঘুম-বঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের অতিরিক্ত বিরক্তি, মেজাজের পরিবর্তন এবং বর্ধিত মানসিক সংবেদনশীলতা দেখা গেছে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায়। আসলে, ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে, যা উদ্বেগ, রাগ এবং হতাশাজনক প্রবণতার জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। যখন মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না, তখন দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবেলা করতে অসুবিধা হতে পারে।

এই মানসিক ব্যাঘাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে সম্পর্কিত হল ঘুম-বঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আবেগপ্রবণ কিংবা আক্রমণাত্মক আচরণের বৃদ্ধি। অপর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্কের সেই অঞ্চলগুলিকে প্রভাবিত করে, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ, বিচার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দায়ী। ফলস্বরূপ, যেসব কিশোর-কিশোরী নিয়মিত ভাবে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম ঘুমোয়, তারা অতিরিক্ত বিরক্তি প্রকাশ করে, বন্ধুদের সঙ্গে ঝামেলা করে কিংবা তাদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব আচরণগত সমস্যাগুলির দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা সামাজিক সম্পর্ক এবং শিক্ষাজীবনকে প্রভাবিত করে।
সুস্থ মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য ঘুমও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে মস্তিষ্ক স্মৃতিশক্তি বাড়ায় এবং স্নায়ু মেরামত সহ বেশ কয়েকটি পুনরুদ্ধারমূলক প্রক্রিয়া সম্পাদন করে। এটি বিশেষকরে বয়ঃসন্ধিকালে গুরুত্বপূর্ণ, যখন মস্তিষ্ক দ্রুত কাঠামোগত এবং কার্যকরী বিকাশের মধ্য দিয়ে যায়। পর্যাপ্ত ঘুম মস্তিষ্ককে নতুন অর্জিত তথ্য সংগঠিত করতে, স্নায়ু সংযোগগুলিকে শক্তিশালী করতে এবং জেগে থাকার সময় জমা হওয়া বিপাকীয় বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করতে সহায়তা করে। যখন ঘুমের সময়কাল অপর্যাপ্ত হয়, তখন এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলি ব্যাহত হয়, শেখার ক্ষমতা এবং সামগ্রিক জ্ঞানীয় কর্মক্ষমতাকে কমিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
শিক্ষাক্ষেত্রে কম ঘুমের প্রভাব স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব ভোগকারী কিশোর-কিশোরীদের প্রায়ই ক্লাসে মনোযোগ দিতে অসুবিধা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং পড়াশোনার দক্ষতা হ্রাস পায়। বিপরীতে, যারা নিয়মিত ঘুমের রুটিন বজায় রাখেন, তারা পড়াশোনায় আরও ভালো পারফর্ম করেন, তাদের মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক সুস্থতাও বজায় থাকে।
মস্তিষ্কের উপর এর প্রভাবের পাশাপাশি, শারীরিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য ঘুম সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অপর্যাপ্ত ঘুম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে, সংক্রমণ এবং অসুস্থতার জন্য আরও সংবেদনশীল করে তোলে। এটি ক্রমাগত ক্লান্তি, মাথাব্যথা এবং শারীরিক শক্তি হ্রাসেও অবদান রাখে। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব বিপাকীয় নিয়ন্ত্রণকে ব্যাহত করতে পারে, স্থূলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
আধুনিক জীবনযাত্রার কু-অভ্যাস এই ক্রমবর্ধমান ঘুমের ঘাটতির জন্য দায়ী। ডিজিটাল স্ক্রিনের অতিরিক্ত সংস্পর্শ এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং কম্পিউটার নীল আলো নির্গত করে, যা শরীরের স্বাভাবিক ঘুম চক্র নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী হরমোন মেলাটোনিনের উৎপাদনে প্রভাব ফেলে। কিশোর-কিশোরীরা যখন দীর্ঘ সময় ডিজিটাল ডিভাইসে সময় কাটায়, বিশেষ করে রাত্রে, তখন মস্তিষ্ক উদ্দীপিত থাকে, যার ফলে ঘুম শুরু হতে বিলম্ব হয় এবং মোট ঘুমের সময়কাল হ্রাস পায়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল— তরুণদের মধ্যে শারীরিক কার্যকলাপ হ্রাস। বসে থাকা এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিন টাইম শরীরের বিশ্রামের জন্য স্বাভাবিক ড্রাইভকে হ্রাস করে। অন্যদিকে, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম সার্কাডিয়ান ছন্দ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং ঘুমের মান উন্নত করে।
এই বাস্তবতাগুলি বিবেচনা করে, স্বাস্থ্যকর ঘুমের অভ্যাস স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে। পিতামাতার উচিত, ঘুমের আগে সন্তানের স্ক্রিন এক্সপোজার সীমিত করা এবং কিশোর-কিশোরীরা যাতে দিনের বেলা নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপে নিযুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করা। সেইসঙ্গে চাই, শান্ত, আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ।
ছোটোদের দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাবের লক্ষণগুলি শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। ক্রমাগত ক্লান্তি, বিরক্তি, মনোযোগে অসুবিধা এবং ঘন ঘন মেজাজের পরিবর্তন—এই সবই অপর্যাপ্ত ঘুমের ইঙ্গিত দিতে পারে। যখন এই ধরনের লক্ষণগুলি অব্যাহত থাকে, তখন অন্তর্নিহিত ঘুমের ব্যাধি বা আচরণগত ধরণগুলি শনাক্ত করার জন্য একজন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ, ঘুমকে বিলাসিতা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের একটি ঐচ্ছিক দিক হিসাবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি মৌলিক জৈবিক প্রয়োজনীয়তা, যা মানসিক ভারসাম্য, জ্ঞানীয় বিকাশ এবং শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখে।





