সেবার বাপের বাড়ি হুগলি থেকে শিফট হয়েছে হাওড়ায়। অনেকদিন ওদিকের খবর আসেনি। দু’বছর আগে স্বামী গত হয়েছেন। এখন আর তেমন কেউ নেই যে, কর্তব্যের জন্য জোর করে গৃহকোণে পড়ে থাকবেন। মঞ্জু নিজেও এতদিন একটা সরকারি চাকরি করেছেন। এখন রিটায়ার্ড লাইফ কাটছে। চুল পেকেছে, দাঁত পড়েছে, কিন্তু এখনও চেহারায় অদ্ভুত একটা লাবণ্য বেঁচে আছে। ছোট্ট মুখে ছোটো কালো টিপ পরলে হয়তো তরুণী মনে হয়। অনেকে অবাক হয়ে বলেন, তোমার উপর নিশ্চয়ই ঈশ্বরের আশীর্বাদ আছে। নয়তো এখনও এত সুন্দর আছো কী করে? না বললে কেউ বিশ্বাস করে না বয়স ঘাট পেরিয়েছে।

স্বামী মারা যাওয়ার পর খুব একা লাগত। টাকার অভাব নেই। একটা ভালো বৃদ্ধাশ্রমে চলে গেলে কেমন হয় ভাবতেন। শেষ কিছুদিনে বুঝতে পারলেন, সংসার শেষ করে সংসারে আটকে থাকার মানেই হয় না। যাবতীয় বিষয়-সম্পত্তি বিক্রি করে, কিছু দান করে, নিজের জন্য সামান্য কিছু রেখে এখন ঝাড়া হাত-পা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অমৃতর কথা শেষ পর্যন্ত মিলে গেছে। মাঝে মাঝে মনে পড়ে। একবার যদি দেখা হতো।

ক’দিন আগে এক ট্রাভেল এজেন্সির বারাণসীতে বেড়াতে আসার প্রস্তাবটা হাতছাড়া করতে পারলেন না। আরও অনেক জায়গায় ঘোরা বাকি আছে। একে একে সব জায়গা দেখবেন এই ইচ্ছে। আসার পর থেকেই মনে হচ্ছে একবার যদি দেখা হয়ে যায়। অনেক আশা নিয়ে এসেছেন এবার, বেঁচে থাকলে দেখা হতেই পারে। রাস্তায় কোনও সাধুকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে চেনার চেষ্টা করেছেন। না, মিল পাননি। সাধুরাও এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অবাক হচ্ছেন।

পড়ন্তবেলায় পৌঁছে সব প্রশ্নের উত্তর জেনে নেবেন অমৃতর কাছে। জিজ্ঞেস করে নেবেন, ভালোবাসি কিনা কেন জানতে চেয়েছিলেন? আমার উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হতো তাহলে কি আপনি গৃহত্যাগী হয়ে আমার প্রতি সুবিচার করেছেন বলে মনে হয়? আর একটা অস্বস্তিও আছে। অমৃতর দেখা পেলে ক্ষমাও চেয়ে নেবেন। এক-দু’বছর নয়, টানা চল্লিশ বছরে একবার অন্তত অমৃতর খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল।

মঞ্জিমাদেবী সেদিন কোনও উত্তর না দিয়ে বাড়ি চলে গেছিলেন। একদিকে অবশ্য ভালোই করেছিলেন। এরপর হুগলির বাড়িতে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পরে শুনেছিলেন, স্যারও নিখোঁজ হয়েছেন বলে ওঁর দাদা, বাবা-মাকে কলকাতায় নিয়ে যান। সে সবই জানত, তবু কাউকে কোনওদিন বলেনি।

এখন মনে হয়, অনেক আগে সব বলে দেওয়া উচিত ছিল। গতমাসে অবশ্য বলে দিয়েছেন। বলতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছেন। অমৃতর ভাইয়ের ছেলে কোথা থেকে মঞ্জিমার ফোন নম্বর জোগাড় করে, ফোন করে জানাল, ‘আপনারা অমৃত স্যারকে চিনতেন। তিনি পড়াতেন আপনাদের। আপনাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতেন কাকা। ঠাকুরদা, ঠাকুমা যখন মৃত্যুশয্যায়, তাঁকে পাওয়া যায়নি। বাবা অসুস্থ, কাকাকে দেখতে চাইছেন।’

মঞ্জিমা ভাবলেন— অমৃত কেমন আছেন, কোথায় আছেন, কে বলতে পারে। একটা প্রাচীন পুণ্যভূমি বারাণসী। পাশেই এলাহাবাদ। সেখানেও থাকতে পারেন। অবশ্য আদৌ বেঁচে আছেন কিনা কেউ জানে না! কোথায় আছেন? আর দেরি কেন, বলে দেওয়াই ভালো। বাচ্চা ছেলেটা হয়তো খোঁজ করে দেখলে ওর কাকার খোঁজ পেলেও পেতে পারে। ওঁর বাবা, মা মৃত্যুশয্যায় কাছে পাননি, দাদার অস্তিম সময়ের ইচ্ছেটা অন্তত পূর্ণ হবে। শেষ পর্যন্ত নামটা বলে দিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত লাগছিল। মনে হচ্ছিল ভুল করেননি।

—দ্যাখো হয়তো বারাণসীতে পেলেও পেতে পারো। এটুকু বলেই ফোনটা মঞ্জিমা কেটে দেন।

এরপর আর ফোন করেনি কেউ। পেরিয়ে গেল কয়েকটা মাস। একদিন ভাবলেন, সন্ধান পেয়েছে কিনা জানাল না ছেলেটা। তাহলে নিশ্চয়ই এখনও সন্ধান পায়নি। মঞ্জিমা আর ফোন করেননি। এর মধ্যেই ট্যুর এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে এদিকে ঘুরতে আসার প্ল্যান হয়। বেড়াতে এসে মনে হচ্ছে, আরও আগে আসা উচিত ছিল। এ জন্মে আর দেখা হবে না। এসব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে পড়েছেন।

একটু আগে সব নৌকা স্থির হয়ে দাঁড়ানোর পর, আরতি শুরু হয়েছে। আরতি চলল অনেকক্ষণ। একটা প্রদীপ কিনে জলে ভাসিয়ে দিলেন সকলে। মনস্কামনা পূর্ণ করার কিছুই অবশিষ্ট নেই। একে একে সবাই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। একমাত্র অমৃত যদি পৃথিবীতে থাকেন, তাহলে তাঁর ভালো হোক, চোখ বন্ধ করে এটাই চাইলেন।

এরপর সব নৌকাগুলো ফিরে যাচ্ছে। ফেরার সময়ও একই ছবি। সব ঘাটগুলো মারাত্মক আলোকোজ্জ্বল। অনেক ঘাটের নাম জানেন না। দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। কতগুলো চিতা একসঙ্গে জ্বলছে ভাবা যায় না। নৌকার কোনও এক যাত্রী মাঝিভাইকে বেশ কয়েকবার অনুরোধ করলেন, একবার ওই হরিশচন্দ্র ঘাটটার কাছে নিয়ে যেতে।

মাঝি বললেন, “না! ধোঁয়ার গন্ধে শরীর খারাপ লাগবে। এখান থেকে দেখুন।’

লোকটা পীড়াপীড়ি করাতে নিয়ে যেতে হল ঘাটের খুব কাছে। এখানে নামা যাবে না। অশৌচের কাজকর্ম চলছে।

মঞ্জিমা দেখলেন অবিকল অমৃতর মতো চেহারা। ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে একটা যুবক। কিন্তু বয়স কম। এই যুবক কি অমৃত হতে পারে? হয়তো ওর দেখার ভুল। তাঁর বয়স হয়েছে এমন চেহারা থাকার কথা নয়। সাধুরা যোগাসনে বয়স ধরে রাখতে পারেন নাকি? তিনি কি সত্যিই সাধু হয়ে গেছেন? সত্তর বছরের বৃদ্ধকে তিরিশ বছরের যুবক মনে হচ্ছে কেন! তাহলে বারাণসীতে এসে বিয়ে করে সংসার পেতেছেন। তারপর মনে হল, হয়তো অমৃতর ছেলে হতে পারে। কিন্তু এখানে কী করছেন। এত আলুথালু বেশে উদাস হয়ে তাকিয়ে আছেন কেন? অমৃতদের ছাদের ঘরে যেমন ভয় পেয়ে হাত-পা কাঁপছিল, এখন তার থেকেও সহস্রগুণ বেশি ভয় চেপে বসল তাঁকে।

মাঝিকে অনুরোধ করলেন— যেভাবেই হোক, আমাকে এই ঘাটে নামিয়ে দিন। আর তো আসা হবে না, ভালো করে দেখে যাই।

—এখানে সাধারণ যাত্রীদের নামার অনুমতি নেই। চলুন যেখান থেকে উঠেছেন সেখানে নামিয়ে দেব। মঞ্জুর অস্থিরতা দেখে মাঝি বললেন, ‘লাফিয়ে নামতে পারবেন?” ট্যুর ম্যানেজার উৎসাহ দিলেন, “মাসিমা নামতে পারলে নামুন। ইচ্ছে হয়েছে যখন। বারবার আসা হবে না। আমরা ওদিক থেকে ঘুরে ঘাট ধরে ধরে এখানে আসছি আবার।’

সন্ধের সময় জলে পড়লে ভিজে যাবেন। সাঁতার জানলেও এই গভীর নদীতে সাঁতরাতে পারবেন না। এতসব ভাবলে চলে না। পাড়ের কাছে আসতে সাহস করে নেমে গেলেন তাড়াতাড়ি। ভাগ্যিস জলে পড়েননি। মানুষ পুড়ছে, তার আঁচ গায়ে লাগছে, এমন সময়ে বোধহয় যম শীতও লজ্জায় লুকোয়। শীতে আচ্ছাদন দিলেও আগুন নগ্ন করে ছাড়ে। যুবকটি আসলে কে জানতে হবে। না জেনে কিছুতেই ফিরবেন না। ছেলেটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘শোনো, তোমার পদবি কি বসু?’

ছেলেটা মাথা নেড়ে বলে, ‘হ্যাঁ।’

পা কেঁপে উঠল আবার। কে এই ভদ্রমহিলা সে চেনে না। এমন জায়গায় এসব জিজ্ঞেস করছেন কেন! অবাক হল ছেলেটা।

—কী হয়েছে তোমার?

—বাবা আজ চলে গেলেন। অসুস্থ অবস্থায় কাকার কাছে এসেছিলেন। আমার কাকা মুখাগ্নি করছেন। ওই দেখুন, এখানেই দাহ হচ্ছে। ওই তো৷ যুবককে কেউ ডাকছিলেন। ভালো করে দেখে বোঝা গেল ছেলেটি অমৃত নয়। পিছন পিছন গিয়ে দাঁড়ালেন মঞ্জিমা। চিতার খুব কাছে একজন দাঁড়িয়ে আছেন, খুব চেনা। কে, স্যার না!

অমৃত বসুকে বৃদ্ধ অবস্থায় দেখে একটুও ভয় লাগছে না। আগের মতো রোগা দীর্ঘকায় আছেন। মানুষটা যে সাধু হয়েছেন, একটুও তা মনে হচ্ছে না। মঞ্জুর দিকে একবার তাকিয়েও মুখ ফিরিয়ে নিলেন। বোধহয় চিনতে পারেননি। সাধু হলে সাধুর বেশে থাকতে হবে কেন? তাকে দেখেও কি চিনতে পারলেন না অমৃত? আসলে তিনি নিজেও যে এখন বৃদ্ধা। সেদিনের কথা কি তাঁর মনে আছে? হয়তো সেটাও মনে নেই। আবার মনে হল, মানুষটা চিনতে পারেননি তাঁকে, কিন্তু এখনও অমৃত যে জীবিত আছেন— এই কি যথেষ্ট নয়!

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...