সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠে পড়ার অভ্যাস, চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরেও গেল না। লালচে আভা ছড়ানো আকাশের ক্যানভাসে ধীরে ধীরে সূর্যের কমলা গোলটির আত্মপ্রকাশ যেন মনটাকে স্নিগ্ধ করে যায়। টের পেয়ে যায় পাখিরাও। তারা চারপাশ থেকে কলরব শুরু করে। কত নাম না-জানা সুন্দর পাখি। তাদের অনেককেই বেলা বাড়লে আর দেখি না। মৃদু হাওয়া দেয়। রাত্রির মৌন রহস্য ভাঙতে থাকে। যেন অপার শান্তি বিরাজ করতে থাকে প্রকৃতিতে। তার-ই ছোঁয়া যেন প্রাণেও এসে লাগে৷
প্রত্যেক ভোরবেলার মতো সেদিনও লনে বসে প্রকৃতির সেই আশ্চর্য রূপ দেখছিলাম। সামনের আমগাছটার ডালে লাগানো দোলনাটা মৃদু দুলছে। এই আমগাছের বীজটা পুঁতেছিল আদিত্য। মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। কিন্তু গাছটার দশাসই চেহারা দেখে সে কথা কে বিশ্বাস করবে। আর সত্যিসত্যিই তো খুব অল্প দিনের ব্যাপার নয়, অন্তত ক্যালেন্ডারের হিসাবে।
আদিত্য আর আমার একটা জায়গায় খুব মিল ছিল। দু'জনেই গাছপালা ভালোবাসতাম খুব। আমার মতো ও কোথা থেকে সব নানা ধরনের গাছ এনে বাগানে বসাত। এক বছরের জন্য আদিত্যকে যখন নিউইয়র্কে পাঠাল ওর কোম্পানি, যাওয়ার আগে সে বলে গেল, 'মা, আমার গাছগুলোর দেখভালের দায়িত্ব এই ক'দিনের জন্য তোমাকে দিয়ে গেলাম। দেখো, একটাও যেন না মরে। এক বছর দেখতে দেখতে কেটে যাবে।'
সেই আদিত্য ওদেশে ছ'মাস কাটতে না কাটতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, ওখানেই পাকাপাকি ভাবে থেকে যাবে। প্রিয় গাছগুলোর কথা সে ভুলে তো গেলই, নিজের মায়ের কথাও তার একবারও মনে পড়ল না। মা এই নিঃসঙ্গ জীবন কীভাবে কাটাবে, আদিত্য ভাবল না সে কথা একবারও। আমিও তাকে আর সে কথা মনে করাইনি। কী লাভ ওকে খামোখা বিব্রত করে? আমার কথা ভাবার সময় কোথায় ওর? সাত সমুদ্র পারে সে নিজের পার্থিব সুখ খুঁজে বেড়াচ্ছে। এখন শুধু ভাবি, ও সুখে থাক। আনন্দে থাক। নিজের স্বপ্নগুলো সত্যি হোক।





