শিল্পের প্রতি আগ্রহ থাকা গজল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার সৃষ্টি প্রদর্শন করেছেন এবং তিনি দেশের শীর্ষ ১০ জন মহিলা শিল্পীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। একজন কর্পোরেট প্রশিক্ষক, একজন শিল্পী এবং একজন মা হওয়ার পাশাপাশি, গজল আজ একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী।
গজল জানিয়েছেন, “ব্যবসায়িক ক্ষেত্র আমাকে শিখিয়েছে যে, সবকিছু নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তাই যা নিয়ন্ত্রণে আছে তার উপর মনোযোগ দেওয়া উচিত। সারাদিন আমি কী করেছি, কী করিনি, কী ঘটেছে এবং তার থেকে শিক্ষা নিয়ে কী করলে ভালো হবে, তাই নিয়ে ভাবি দিনের শেষে। এরই পাশাপাশি, ভালো ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খেয়েও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করি।”
আজকের নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সাফল্যের পতাকা ওড়াচ্ছেন। তাঁরা শুধু মাতৃত্ব উপভোগ করার জন্য পরিবারের যত্ন নেন না, বরং সাফল্যের নতুন সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠেন। কর্মজীবনের ভারসাম্য বজায় রেখে, তাঁরা তাঁদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে রঙিন করে তুলছেন। তাঁরা নিজের দক্ষতায় নাম, খ্যাতি এবং অর্থ উপার্জন করেন এবং তাঁদের সন্তানদের জন্য আদর্শ মা হয়ে ওঠেন। তাঁরা শুধু চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও সাফল্য পাচ্ছেন। আর এই সফল এবং সেলফ-মেড মহিলাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে গজল আলাঘ-এর নামও ।
মা হওয়ার পর, গজল আলাঘ এক অভিনব ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেন এবং কোটি কোটি টাকার একটি কোম্পানি গড়ে তোলেন। বেবি-কেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহারের পর অ্যালার্জিতে ভুগছিল তাঁর বড়ো ছেলে। তাই তিনি এক অভিনব উদ্যোগ নিতে শুরু করেন। গজল তাঁর স্বামী বরুণ আলাঘ-এর সহযোগিতায় একটি বেবি কেয়ার ব্র্যান্ড ‘মামাআর্থ’ (Mamaearth) প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ সারা বিশ্বে বিখ্যাত ব্র্যান্ড-এ পরিণত হয়েছে। এটি এশিয়ার প্রথম মেড সেফ সার্টিফায়েড ব্র্যান্ড।
প্রসঙ্গত গজল জানিয়েছেন যে, তাঁর বড়ো ছেলে অগস্ত্যের ত্বক একজিমার কারণে খুব সংবেদনশীল ছিল। তার ত্বকে বারবার র্যাশ-এর সমস্যা হচ্ছিল। তাই গজল তাঁর ছেলের জন্য দিনরাত এমন পণ্য খুঁজছিলেন, যা তাঁর ছেলের ত্বকের ক্ষতি করবে না। কিন্তু ভারতে এই ধরনের টক্সিন-মুক্ত পণ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। তিনি বাইরে থেকেও পণ্য অর্ডার করেছিলেন কিন্তু সেগুলোও তাঁর ছেলের ত্বকের সঙ্গে মানানসই ছিল না। তারপর মনে হল, তাঁর মতো আরও অনেক বাবা-মা হয়তো একই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরে।
তাঁর স্বামী বরুণ এবং গজল একসঙ্গে গবেষণা শুরু করেন, মার্কেট সার্ভে করেন, অনেক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেন, চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরামর্শ নেন এবং বুঝতে পারেন যে, ভারতে নিরাপদ এবং বিষমুক্ত বেবি-কেয়ার প্রোডাক্ট-এর ব্যাপক প্রয়োজন। এখান থেকেই তাঁর ধারণা তৈরি হয় যে, এমন প্রোডাক্ট তৈরি করা উচিত, যার উপর বাবা-মায়েরা আস্থা রাখতে পারবেন এবং তারা কোনও টেনশন ছাড়াই তাদের সন্তানদের যত্ন নিতে পারবেন। এই চিন্তাভাবনা মাথায় রেখেই ২০১৬ সালে ‘মামাআর্থ’ ব্র্যান্ড-এর পথ চলা শুরু হয়েছিল।
পরিশ্রমের সুফল লাভ
‘মামাআর্থ’ এমন একটি ব্র্যান্ড, যা একেবারে কোমল এবং বিষমুক্ত বেবি-কেয়ার প্রোডাক্ট তৈরি এবং সরবরাহ করে। গজল তাঁর ব্র্যান্ড-কে এতটাই উচ্চে তুলেছেন যে, এর জন্য তিনি পেয়েছেন একাধিক পুরস্কার এবং সম্মান। ‘বিজনেস টুডে অ্যান্ড ফরচুন ইন্ডিয়া’-র ২০২৩ সালের ‘মোস্ট পাওয়ারফুল উয়োম্যান’ অ্যাওয়ার্ড, ‘ইটি ৪০ আন্ডার ৪০’, ‘সিএনবিসি ফার্স্ট ফরোয়ার্ড উয়োম্যান অ্যাচিভার অ্যাওয়ার্ড’, ‘বিজনেস টুডে’-র ২০২৪ সালের ‘মোস্ট পাওয়ারফুল উয়োম্যান’ অ্যাওয়ার্ড, ‘বিজনেস ওয়ার্ল্ড’-এর ৪০ আন্ডার ৪০’ প্রভৃতি পুরস্কার পেয়েছেন গজল।
শিল্পের প্রতি আগ্রহ থাকা গজল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর সৃষ্টি প্রদর্শন করেছেন এবং তিনি দেশের শীর্ষ ১০ জন মহিলা শিল্পীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন। একজন কর্পোরেট প্রশিক্ষক, একজন শিল্পী এবং একজন মা হওয়ার পাশাপাশি, গজল আজ একজন বিখ্যাত ব্যবসায়ী। সোনি চ্যানেলের ‘শার্ক ট্যাঙ্ক সিজন ১’ অনুষ্ঠানের অন্যতম বিচারকও ছিলেন গজল।
লেখাপড়ায়ও ভালো ছিলেন গজল, কিন্তু খেলাধুলা এবং পেইন্টিং-এও বিশেষ আগ্রহ ছিল তাঁর। তিনি দ্বাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে লেখাপড়া করেছেন, কারণ তাঁর মা এবং বাবা চেয়েছিলেন যে তিনি পরবর্তীকালে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ডিগ্রি অর্জন করুক। কিন্তু গজলের শখ ছিল কম্পিউটার এবং শিল্পকলায়। তবুও, বাবা-মায়ের পছন্দকে অগ্রাধিকার দিয়ে, তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু গজল একসময় বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি এই বিষয় নিয়ে মানসিক ভাবে আর এগোতে পারবেন না। কারণ এই বিষয় নিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভে তাঁর মন সায় দিচ্ছিল না।
(ক্রমশ…)





