তন্বী পালটা কোনও উত্তর দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই সময়ে দরজার কলিং বেল বেজে উঠল। মিতা ফিরে এসেছে। আমায় দেখে অবাক হল। সবকিছু শুনে তন্বীকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সে। আমি কিছু না বলে নীরবে নীচে নেমে এলাম।

এ ঘটনার দিনদুয়েক পরে একদিন সকালে একটু বেলা করেই লনের চেয়ারে বসে আছি। শীতকাল। নরম রোদ্দুর ভালো লাগছে। হঠাৎ একটা লম্বা ছায়া দেখে চোখ তুলে দেখি তন্বী দাঁড়িয়ে আছে। মিষ্টি একটা হাসি হেসে সে আমার পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল। দেখে অবাক হলাম, মেয়েটার চেহারা থেকে উগ্রতা একেবারে উধাও হয়ে গেছে।

খুশি হয়ে উঠে বললাম, “বল তন্বী, শরীর কেমন আছে? আজ হঠাৎ যে আমার কথা মনে পড়ল?”

তন্বী কিছুক্ষণ কোনও কথা না বলে বসে রইল। যেন কিছু বলার জন্য যে সাহস দরকার হয়, তা জোটানোর চেষ্টা করছে মনে মনে। তারপর থেমে থেমে বলল, “দিদা, সেদিনের আচরণের জন্য পরে আমার খুব খারাপ লেগেছে। তুমি ঠিকই বলেছিলে, সম্পর্কের গুরুত্ব কী আমি সত্যিই সেটা জানি না। পরে ভেবে দেখলাম, জীবনে এই প্রথমবার কেউ এতখানি নিঃস্বার্থ ভাবে আমার উপকার করল, যত্ন নিয়ে দেখভাল করল। অথচ সেই আমি, তার ভালোবাসা, স্নেহ আর মমতাকে মানতেই চাইলাম না। সত্যি আমি খুব খারাপ মেয়ে, দিদা!” আমি আশ্চর্য হলাম ওর উপলব্ধির কথা শুনে!

—তন্বী, আমার কথাগুলোকে তুই যে এভাবে মন দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখেছিস, এতেই আমার খুব ভালো লাগছে। আমি তোর আচরণে কিচ্ছু মনে করিনি রে! বাচ্চা মেয়ে তুই। মনে করব কেন ?

তন্বী হঠাৎ আমায় জড়িয়ে ধরে বলল, ‘সত্যি বলছ তো? ক্ষমা করে দিলে তো? আমি তোমার থেকে দূরে যেতে চাই না দিদা!”

আমি বললাম, “আচ্ছা বেশ। ক্ষমা করে দিলাম। কিন্তু তন্বী বল তো, মনের মধ্যে এত বিষ কী করে জমা হল তোর!” তন্বী খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর সহসা গম্ভীর হয়ে গিয়ে বলল, “সে অনেক ঘটনা দিদা। কাউকে কখনও বলিনি। কেবল একা কষ্ট পেয়েছি।’

আমি বললাম, ‘আমাকে বলতে পারবি?”

তন্বী অদ্ভুত অসহায় মুখে আমার দিকে তাকাল! তারপর বলতে শুরু করল…

—তুমি হয়তো জানো না দিদা, আমার বাবা আর মায়ের লাভ ম্যারেজ। দু’জনেরই পরিবারের কেউ যখন বিয়েটা মেনে নিল না, তখন ওরা সব আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেই সম্পর্ক ত্যাগ করল। আমার বাবার চেয়ে মা বরাবরই বেশি পরিশ্রমী। কাজেই মায়ের দ্রুত পদোন্নতি হতে থাকল অফিসে। বাবা ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকল। সেটাই কাল হল। অফিসে দু’জনের পদের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান ওদের ব্যক্তিগত জীবনকেও ভেঙেচুরে তছনছ করে দিতে থাকল। ওদের দাম্পত্য জীবনের ব্যবধানটা ক্রমশ বাড়তেই লাগল। ঠিক এমন সময়েই আমি এসে গেলাম পৃথিবীতে। ওরা তখন পাগলের মতো কেরিয়ারের পিছনে ছুটছে। কে কাকে টপকে কীভাবে বেরিয়ে যাবে, তার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে যেন।

—বাড়িতে দিনরাতের জন্য রাখা হয়েছিল দু’জন আয়াকে। ওদের হাতেই আমি বেড়ে উঠতে লাগলাম। যখন খুব অসুস্থ থাকতাম, মা-বাবা দু’জনে ঝগড়া করত। কে ছুটি নেবে, ঝগড়া তাই নিয়ে। ওদের কারও কাছে আমার জন্য কোনও সময় ছিল না। আমার মা, খ্যাতি-যশ-বৈভবের কাঙাল। আর সেই অবসরে আয়ারা ইচ্ছেমতো চলতে লাগল। আমাদের অনেক বৈভব থাকা সত্ত্বেও আমি অবহেলায় মানুষ হতে লাগলাম। আমার মনের সেই কষ্টের কথা মা-বাবার কানে পৌঁছাল না। আমি বেড়ে উঠতে থাকলাম সমাজবিচ্ছিন্ন হয়ে। নিঃসঙ্গ, একদম একা!

—আমার কথা আদৌ না ভেবে ঝগড়াঝাঁটি করে ওরা একদিন আলাদা থাকতে শুরু করল। বাবা তো আমার দিকে ফিরেও চাইল না। মায়ের বাধ্যবাধকতা ছিল। মা আর কী করে। খানিকটা বাধ্য হয়েই তাকে আমায় সহ্য করতে হল৷ কিন্তু আমি যেন কারও মেয়ে নই। আমি আশ্রিতা। আশ্রয়দাতা বাবা নাকি মা, তাতে ফারাক কিছু পড়ে না। পড়াশোনা করতে কোনও উৎসাহ পেলাম না। একটা উদ্দেশ্যহীন, নিরর্থক জীবন….।

হঠাৎ থামল তন্বী। একটু উদাস লাগছে ওকে। উঠে পড়ে বাড়ির ভিতরে গেল। টের পেলাম, ফ্রিজ খুলে ঠান্ডা জল খাচ্ছে। ফিরে এসে আবার বসল আমার পাশে।

—মা আর বাবার প্রতি আমার যে ভীষণ অভিমান আর ঘৃণা, তার শুরুটা হয়েছিল এখান থেকেই। ভিতরে ভিতরে একটা যুদ্ধ হয়ে চলেছে নিরন্তর। নিজেরই সঙ্গে। আমার বাবা-মায়ের জীবনে যাবতীয় সুখশান্তি, সমাজে তাদের মানসম্মান, এমনকী আমার নিজের জীবনকেও তছনছ করে ফেলার আগ্রাসী মনোভাব— আমায় ঘিরে ধরল। যেসব কাজ বাবা-মাকে দুঃখ দেয়, উদ্বেগে ফেলে, বিব্রত করে, সেগুলো করতে আমার ভীষণ ভালো লাগতে থাকে। সত্যি বলতে কী, আজও আমার সেই মানসিকতা এতটুকু বদলায়নি। হয়তো সেজন্যই আমি এরকম। আগ্রাসী, উগ্র, উদ্ধত…!

—আমি অসুস্থ হয়ে পড়ার সময় তোমার কাছ থেকে যে স্নেহ, ভালোবাসা পেলাম, বিশ্বাস করো দিদা, তা আমার কাছে একেবারে নতুন। একেবারে আলাদা। যা জীবনে কখনও আমি কারওর কাছ থেকে পাইনি। নতুন একটা ভালোলাগা, অন্যরকম ভালোবাসা, স্নেহ, মমতার স্পর্শ পেলাম। সেদিনই মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে বোধহয় একমাত্র তোমার কাছেই আমার মনের চাপা ব্যথাগুলো বলে হালকা হতে পারব। বলো না দিদা, আজকে আমার আচরণ যে কেউ পছন্দ করে না, তার পিছনে দোষ কি একা আমার?

কথা শেষ করে, তন্বী মাথা নিচু করে বসে রইল। মনে হল, ভিতরে ভিতরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

বললাম, ‘কী বোকা মেয়ে রে তুই। সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ না করেই নিজের মাকে-ই শত্রু ভেবে বসলি? তুই কি জানিস, তোর জন্য মিতা কত কষ্ট পায়? একবার তোর মায়ের দিক থেকে ভেবে দ্যাখ তন্বী। বেচারি নিজের মর্জিতে তোর বাবাকে বিয়ে করে আত্মীয়স্বজন সবাইকেই খোয়াল। ও তো বাধ্য হয়েছিল এ জীবন বেছে নিতে। নাহলে নিজের আর তোর ভরণপোষণ কী করে হতো বল তো! ওর তো আরও বেশি রোজগারের প্রয়োজন ছিল। ও তো শখের চাকরি করে না। বেঁচে থাকতে গেলে, এই জীবনটা ওকে মেনে নিতেই হতো। তোর মাকে আমি কেন এত ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি জানিস? এত প্রতিকূলতার মধ্যেও সে হেরে মাথা নুইয়ে ফিরে আসেনি। কখনও নিজের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলতে চায়নি। অথচ সে সবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত! যে-মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে মিতা এতকিছু করল, সে-ই তার সম্পর্কে ভুল ভেবে বসে আছে।”

তন্বী কিছু বলল না। সম্ভবত তার কিছু বলার ছিল না। সে চুপ করে বসে রইল।

আমি বললাম, ‘কোনও জিনিসকে ভাঙতে এক মুহূর্ত লাগে, কিন্তু গড়তে অনেক সময় লেগে যায়, হয়তো সারা জীবন। সম্পর্কও সেরকম একটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সে যাক! তোর জীবনে যা ঘটে গেছে তন্বী, তার উপর তোর সত্যিই কোনও হাত ছিল না, এটাও সত্যি। এমনকী মনের উপরেও না। মানুষের মন। তা যে সবসময় অঙ্ক কষে, সাতপাঁচ ভেবে চলবে, এমন তো নয়! অথচ দ্যাখ, তোদের মা-মেয়ের ছোট্ট সুখী সংসারটা কীভাবে দুঃখের সমুদ্রে নিমজ্জিত! কী লাভ? কী পেলি তন্বী?’

আমার কাঁধে হঠাৎ মাথা রাখল তন্বী। ভেঙে পড়েছে মেয়েটা। ক্লান্ত। যুদ্ধ তো তন্বীও করছিল। এখন বুঝি যুদ্ধ থেমেছে। ওর মসৃণ চুলে অন্যমনস্ক ভাবে খেলা করছে আমার আঙুল। তন্বী নিঃশব্দে কাঁদছে। কাঁদুক। যত কাঁদবে তত মনের বোঝা হালকা হবে। বাধা দেব না।

খানিকক্ষণ পরে সে মুখ তুলল। বলল, ‘আমি খুব অন্যায় করেছি দিদা। মা কি আমায় ক্ষমা করবে? তোমার মতো করে আমায় বুঝবে?”

আমি বললাম, ‘না বুঝুক কিন্তু মা-তো, ঠিক ক্ষমা করে দেবে! দেখিস!”

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...