ঝরনা দু-কাপ কফি দিয়ে গেল। মালকিনের অনেক পরে ঘুম ভাঙে তার। প্রশ্রয়ও পায়। ছোটো থেকে এ বাড়িতে আছে। আমরা নীরবে কফি খেতে থাকি। কখনও কখনও অখণ্ড নীরবতাও এমন অনেক কথা বলে যায়, যা মুখে প্রকাশ করা অসম্ভব। আমাদের দু'জনের মধ্যেও সহানুভূতির মৌন আদানপ্রদান হতে থাকল।
সেই ভোরের পর থেকে, যাওয়া-আসার সময় মিতা প্রায়ই আমার পাশে লনে খনিকক্ষণ বসে যেত। নিজের গোপন কথাবার্তাও ভাগ করে নিত কখনও কখনও। অনর্থক কৌতূহল দেখানো রুচি বিগর্হিত কাজ। নিজেই বলত।
টুকরো টুকরো কথাগুলোকে জুড়ে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করলাম। মিতার সঙ্গে ওর স্বামী রণজিতের ডিভোর্স হয়নি ঠিক-ই, তবে এই শহরেই রণজিৎ আলাদা থাকে। আট বছর যখন বয়স তন্বীর, মিতা আর রণজিৎ আলাদা থাকতে শুরু করে। রণজিৎ-ই কার্যত মা-মেয়েকে ছেড়ে যায়। তারপর কোনওদিন এমুখো হয়নি। না, মেয়েকে দেখতেও নয়। স্ত্রী ও মেয়ের সব দায়িত্বও কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলেছিল সে।
তন্বীর বাড়তে থাকা উগ্র, উড়নচণ্ডী আচরণ মিতার দুশ্চিন্তা আর মানসিক উদ্বেগকে বাড়িয়ে তুলছিল। তন্বীর বন্ধুদের দিকে সরাসরি তাকনো যায় না। ভয় করে। মনে হয় এরা এই পৃথিবীর কেউ নয়। পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা সবই অদ্ভুত। দিনরাত মাল্টিপ্লেক্স আর নাইটক্লাবে ঘুরছে।
মিতাকে দেখে খারাপ লাগে এখন। বেচারি যেন মরমে মরে থাকে। সাজপোশাকের পারিপাট্যও গিয়েছে। চোখের নীচে একরাশ বিষণ্ণতা। অনেক চেষ্টার পরও তথীকে সে যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, সেই ব্যথা যেন তার সর্বাঙ্গে ফুটে বের হয়। আমি যে ওকে কোনওরকম সাহায্যই করতে পারছি না, এতে কম কষ্ট পাচ্ছি না আমিও। উদ্ধৃত ওই মেয়েটিকে বাগে আনার চেষ্টা বৃথা। কিন্তু মিতা তো নির্দোষ। সে চেষ্টাও চালিয়েছিল আপ্রাণ। তাকে কষ্ট পেতে দেখাটা খুব সুখকর বিষয় নয়। আমার কাছে।
একদিন সকাল থেকে লোডশেডিং। দুপুরের মধ্যে ট্যাংকের জল শেষ হয়ে গেল। খাওয়াদাওয়া শেষ করে অলস আঙুলে একটা পত্রিকার পাতা উলটোচ্ছি, দরজায় টোকা পড়ার শব্দ শুনে উঠতে হল। দরজা খুলে থমকে গেলাম। তন্বী দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা জলের জগ। আমার কপালে দু-চারটে বিরক্তির রেখা ফুঠে ওঠার আগেই তন্বী বলে উঠল, ‘একটু জল হবে?'





