লাঞ্চের পর আমরা চলে এলাম ভিয়েতনামের অন্যতম দর্শনীয় স্থান ট্রান কুয়ক প্যাগোডা দেখতে। শহর জুড়ে ঝকঝকে দোতলা লাল বাসের পরিসেবা কলকাতার ডবলডেকার বাসের অতীত দিন স্মরণ করাল। ভীষণ মিষ্টি একটা আমেজ। ট্রান কুয়ক হল রাজধানীর জাতীয় প্রতীক। প্রবেশপথের বিশেষত্ব হল প্রবেশদ্বারটি দূর থেকে বিচ্যুত মনে হলেও, কাছে গেলে বোঝা যায় ধারণাটি ভ্রান্ত। ট্রান কুয়কের স্থাপত্য হ্যানয়ের অন্যান্য প্রাচীন মন্দিরগুলোর অনুরূপ। পবিত্র বাগান এবং অত্যাশ্চর্য কিছু দৃশ্যাবলী নিয়ে ট্রান কুয়ক মনে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রলেপ রেখে দিল।
১৯৫৯ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ বোধিবৃক্ষের চারা এই প্যাগোডাকে দান করেছিলেন। অনেকে মনে করেন এটি সেই বোধিবৃক্ষের শাখা, যার নীচে বসে স্বয়ং বুদ্ধদেব আলোকিত হয়েছিলেন। বোধ গয়ার মোহ ছাড়িয়ে হঠাৎই চোখের ভিউফাইন্ডারে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্যাগোডার ঘণ্টাধ্বনি। একটা ঝিমধরা সময়ের বশবর্তী হয়ে ভাবি স্পেশাল এফেক্টের মায়াজালে ওলটপালট হল বুঝি কিছু! পুরাতন নগরী প্যাগোডার শেষ গলিপথে থমকে যাওয়া আমি নিখাদ বিদেশি টুরিস্ট হয়ে নিজের সহযাত্রীদের সঙ্গে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজি।

পরের দিনের গন্তব্য হোয়াট কায়েম লেকের পাশে ওয়াটার পাপেট শো দেখা। টিকিট অনলাইনে বুক করেছিল গাইড। এই পাপেট শো-এর একটা ইতিহাস আছে। এগারোশো শতকে রেড রিভার ডেল্টা এরিয়ার সমস্ত গ্রামের ধানজমি বন্যায় জলমগ্ন হয়েছিল। তখন সেখানকার মানুষ জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গিতে মানুষের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করত রোজগারের আশায়। সেই থেকে এই পাপেট শোয়ের শুরু। প্রতি বছর এখানে দেড় লক্ষ পর্যটক শো দেখতে আসেন। এই শোয়ের বিশেষত্ব হল— মঞ্চটি সম্পূর্ণ জলমগ্ন থাকে। এই জলের উপরেই মসৃণ গতিতে ভাসতে ভাসতেই পুতুল নাচের খেলা দেখায় কলাকুশলীরা। উপর থেকে তাদের দেখা যায় না মোটেই। ভিয়েতনামের গীতবাদ্য ও আঞ্চলিক ফোকআর্ট ড্রাগন নাচকে যথাযথ মর্যাদায় বিদেশি দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হল প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ধরে। পাপেট শোয়ের শেষটুকু দেখে মনে হল— হ্যানয়ের ইতিহাসের পাতা ধরে যে চেক লিস্ট সঙ্গে বয়ে এনেছি, তা আমাকে অনেকটাই পূর্ণতা দিল। ভিয়েতনামের সংগ্রামী জীবনের সার-সত্যের পথে আমার তিনটি রাত গচ্ছিত রইল চির জীবনের মতো।

ইতিহাসের সরণি ছেড়ে ফুরফুরে মেজাজে রওনা দিলাম অন্যতম আকর্ষণ হালং বে বা উপসাগরের পথে। যার আক্ষরিক অর্থ হল- ডিসেন্ডিং ড্রাগন। ড্রাগনের রূপকল্প এই দেশের মাইথোলজিকে প্রভাবিত করেছে নিঃসন্দেহে। আমরা জেটি থেকে বেশ বিলাসবহুল ক্রুজে চেপে রওনা দিলাম। শিক্ষিত গাইডের থেকে জানলাম, ভিয়েতনামীদের বিশ্বাস, স্বর্গ থেকে ড্রাগন তার শিশুসহ নেমে এসে অত্যাচারী শত্রুদের পরাজিত করে স্থায়ী ভাবে বসবাস করে। আসলে যুদ্ধবিগ্রহ ভালো-খারাপ দুয়ের মধ্যে দিয়ে চলে ভিয়েতনামবাসীর মনে এই বিশ্বাসের জন্ম এবং সেই ধারণাই বংশ পরম্পরায় প্রবাহিত।
ভিয়েতনামের উত্তর-পূর্ব দিকে জলপথে হালং বে-তে আসতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। Golf of Tonkin-এর মধ্যে অবস্থিত এই অসামান্য নৈসর্গিক জায়গায়টিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা দিয়েছে। প্রায় ১,৯৬৯টি দ্বীপের মধ্যে বেশির ভাগই মানুষের বসবাসের অযোগ্য। আমাদের দুটো দিন বরাদ্দ এই দ্বীপ মালিকার মাঝে ক্রুজসফরে। ক্রুজের ঘর সংলগ্ন বারান্দা থেকেই অপূর্ব নয়নাভিরাম দৃশ্য। চারতলার আপার ডেকে গিয়ে পেয়ে গেলাম পারফেক্ট ক্যালেন্ডার পিকচার। সারি সারি পাতা ডেক-চেয়ারে শুয়ে দেখি প্রাকৃতিক দৃশ্যপটের বিভাজিকায় প্রবেশ করছে ক্রুজ। বিভিন্ন আকৃতির লাইমস্টোন বিন্যাসে ছোটোখাটো পাহাড় টিলা সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে আমাদের যাত্রাপথ।

আসন্ন বিকেলে সূর্যদেব গোল্ডেন আওয়ারে নিখুঁত আলো স্পট করেছে এক সুড়ঙ্গের মুখে। সেই অতি দুর্লভ সময়টিতে লোনা হাওয়ায় স্কার্ফ উড়িয়ে নিজেকে রুপোলি পর্দার নায়িকা ভাবা যেতেই পারে। আমি ভাবাভাবিতে না গিয়ে পোজ দিতে শুরু করি। জীবন তো একটাই কালিদা— যতটুকু ঈশ্বর দিচ্ছেন তাকে ভালোবেসে গ্রহণ করাই শ্রেয়। শেষ বিকেলের আলো জলে এবং অদ্ভুত প্রস্তরময় আকৃতির দ্বীপসমূহের মধ্যে ক্রমাগত রঙের খেলা দেখিয়ে ক্লান্ত। সূর্যদেব নিজের মলমল খুলে পাটে পাটে ছড়িয়ে দিয়ে অস্ত যাচ্ছেন দিগন্তে। পর্যটকরা বিস্ময়ে কিছুটা শান্তির নৈবেদ্য চোখে নিয়ে ডেক-চেয়ারে বিভোর।
পরের দিন সকালে প্রাতরাশ-এর পর হালং বে-র মধ্যে স্ট্যালাকটাইট ও স্ট্যালাগমাইট সৃষ্ট লক্ষ বছরের প্রাচীন গুহা দর্শন করতে গেলাম ছোটো মোটর বোটে করে। আইল্যান্ড সাম্রাজ্যে টি-টপ আইল্যান্ড সব থেকে বেশি জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয়। ক্রুজ থেকে ছোটো জলযান করে দ্বীপে নেমে প্রথমে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে থাকি। পুরোদস্তুর ট্রেক, নিজের পায়ের জোরেই চলা। অন্তিম পর্যায়ে পৌঁছে আমি আত্মহারা, কিন্তু একটু অসাবধান হলেই টুপ করে খসে যেতে পারি বহু নীচে। এমন ধারার গুহা প্রথম দেখেছিলাম পাতাল ভুবনেশ্বরে পিন্ডারী গ্লেসিয়ার ট্রেক শেষ করে। তারপর আরাকুতে আরও একটু বড়ো অভিজ্ঞতা।
বর্তমানে এই টি-টপ গুহা ঠিক যেন মহাকাব্যর মতো। বিশাল তার অলিগলির কাব্য বিন্যাস। গুহার অভ্যন্তরে বিভিন্ন দিকে লোহার সিঁড়ি ভিতরে রকমারি ফ্লুরোসেন্ট আর স্পট লাইটের আলোকসজ্জা মারাত্মক এক হ্যালুসিনেশন তৈরি করেছে। সিঁড়ি বেয়ে উঠে কিছুটা টপকে গুহার ছাদে শত শত আটকে থাকা বাদুড় আর রকমারি গুহাগাত্রের চরিত্র দেখতে দেখতে একেবারে টপে পৌঁছে গেলাম। ভিয়েতনাম সরকার ইউনেস্কোর তকমা পেয়ে ইন্টারন্যাশানাল ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ করার জন্য দুর্দান্ত ব্যবস্থা করেছে ওই দুর্ভেদ্য অঞ্চলে, যা আমরা ভাবতেই পারি না।
হাঁপ ধরা বুকে নিজের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি শুনতে শুনতে দেখি ওই সুউচ্চ পাহাড়ের কোনায় কঠিন মাটি আঁকড়ে গাঢ় মেজেন্টা রঙের বোগেনভেলিয়ার ঝাড় উঁকি দিচ্ছে। অনেক নীচে সবজে কোল পেতে বসে আছে অপূর্ব জলজ ধরণীতল আর এক আকাশ গরিমা। ছোটো স্পিড বোটগুলোকে খেলনার মতো লাগছে। চতুর্দিকে ছড়ানো ছেটানো বিভিন্ন শেপের আইল্যান্ড সমষ্টিগত হয়ে নাবিকের মতো জাহাজের মাস্তুল আগলে রেখেছে। ছলছল চোখে পূর্ণতার আনন্দে আবারও নতজানু হই প্রকৃতির কাছে। হে নাবিক তোমারে সেলাম!
(সমাপ্ত)





