সামনের বড়ো পিয়াল গাছটার সবুজ পাতার ফাঁকে ভোরের আলোয় হলুদ রঙের পাখিটা এ-ডাল ও ডাল করে বেড়াচ্ছে। চারদিক থেকে ভেসে আসছে আরও নানান পাখির ডাক। এখানে আসার আগে যতটা মন খারাপ হয়েছিল, এখন মনে হচ্ছে এখানে না এলে এমন স্বর্গীয় জীবন কলকাতায় কোথাও পেতাম না। একচিলতে ঘরের ছোটো খাটিয়াতে শুয়ে ঘুম ভাঙা চোখে সামনের খোলা জানলাটার দিকে চেয়ে এসবই ভাবছিলাম। আরএফও হিসেবে প্রথম পোস্টিং, এই পিয়ালবনীর জঙ্গলে। তারপর থেকে গত এক মাস হল এই ছোটো বন-বাংলোটাই আমার ঠিকানা৷
হঠাৎ কলিংবেলের আওয়াজে আমার হুঁশ ফেরে। রান্নার ঠাকুর এসে গেছে। সামনের দেয়ালে ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম আটটা বাজে। আজ অনেকটাই দেরি হয়ে গেল, ঘুম ভাঙার পরেও অলস শুয়ে থেকে। পিয়ালবনীর পূর্বদিকের বিশাল মাঠে আজ বৃক্ষরোপণ চলছে। একবার সেখানে ভিজিট করতে হবে। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে এসে বাইরের দরজা খুলে ঠাকুরমশাইকে ভিতরে ঢুকিয়ে নিলাম। এবার ঠাকুরমশাই রান্নাঘরে আর আমি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লাম।
হুড খোলা জিপ গাড়িটা বনের সরু রাস্তা ধরে চলেছে। এখান থেকে পিয়ালবনীর পূর্বদিকের মাঠটার দূরত্ব অল্পই। দেড় কিলোমিটারের মতো হবে। এই জঙ্গলটা পেরোলেই মাঠের একপাশে সাঁওতাল অধ্যুষিত গ্রাম পিয়ালবনী। ওই গ্রামের নারী- পুরুষদেরই গাছ লাগানোর কাজে লাগানো হয়েছে।
গাড়িটা মাঠের একপাশে এসে দাঁড়াতেই কাজের দেখভাল করা বনকর্মী ও অন্যান্য সকলের মধ্যে একটা বাড়তি তৎপরতা লেগে গেল। গাড়ি থেকে নেমে সবকিছু নিরীক্ষণ করতে লাগলাম। বনকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বুঝে নিচ্ছিলাম সব কিছু ঠিকঠাক চলছে কিনা। এমন সময় এক আদিবাসী ভদ্রলোক, বয়স আন্দাজ ৫০-৫৫-এর মধ্যে হবে, সামনেই একটা গাছ লাগিয়ে কোদালে করে মাটি দিচ্ছিল গোড়ায়। কোদালটা ছেড়ে ঘাড় নিচু করে এসে দাঁড়াল আমার সামনে। কিছু একটা বলতে চাইছেন বোধহয়। এটা লক্ষ্য করে বললাম, ‘কিছু বলবেন আমাকে?'
নিজের নখ খুঁটতে খুঁটতে তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘হ বাবু, আমার বিটির বিহা আসচে শুকুর বারে, তাই...'





