মিলন সমিতির ছোট্ট ঘরটাতে এখন প্রায় প্রতিদিনই মিটিং হচ্ছে। সামনেই ধর্মরাজ পুজোর মেলা। তাই টুকটাক দোকান, নাগরদোলাও বসতে আরম্ভ করেছে। প্রতিবারের মতো এবারেও সেই রোলের দোকানদার মালিক-ই ডাক নিয়েছে। সবার কথামতো এবারে প্রায় হাজার তিরিশ টাকা বেশিও দিচ্ছে। প্রথমে একটু খিচিরমিচির করছিল, কিন্তু সবার কথার পরে ও বেচারা আর কোনও কথাই বলতে পারেনি। অবশ্য সবার কথা নামে বললেও এখানে ওই গোস্বামীবাবুরই কথা চলে। মিলন সমিতিতে নামে অনেকে থাকলেও শেষ কথা সেই উনি।

এক সময় কেন্দ্রীয় সরকারেরর অধীনে কাজ করতেন। তার আরেকটা পরিচয় হল, একসময় এই গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন। বর্তমানে সংরক্ষণের চক্করে নিজে আর প্রধান হতে পারেননি। শুধু তাই নয়, নিজের গ্রাম থেকে নির্বাচনে দাঁড়াতেও পারেননি। প্রায় পাঁচ সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরের একটা ছোটো গ্রাম থেকে তাকে লড়তে হয়েছে। এবারে ভোটের পর একটা কানাঘুষো খবর ছিল গোস্বামীবাবুকে নাকি উপপ্রধান করা হবে। ঘটনাচক্রে যাকে প্রধান হিসাবে মনোনীত করা হয়েছে তার গণ্ডি ঠিক ক্লাস ফোর পর্যন্ত।

কোনওরকমে বাংলাতে নিজের নামটুকু লিখতে পারেন। তবে তার স্বামী এই অঞ্চলের খুব দাপুটে নেতা। শোনা যায়, গোস্বামীবাবুর সঙ্গে একটু ইয়েও আছে। তার কথাতেই কোথাকার এক প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারকে উপপ্রধান করা হয়েছে। গোস্বামীবাবু উপরমহলে যোগাযোগ করলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। বাড়ি থেকেও বারণ করেছিল। বলেছিল, ‘বয়স বাড়ছে আর এইসব রাজনীতির মধ্যে নিজেকে অতটা জড়িও না।’

গোস্বামীবাবুরও মনে হল, কথাগুলো একেবারে ফেলে দেওয়ার নয়। এখনকার রাজনীতি কেমন যেন উলটে যাচ্ছে। তাছাড়া বাড়ি, জমিজমাও আছে, ভালো টাকা পেমেন্টও পেতেন। সব থেকে বড়ো কথা হল, ছেলে-মেয়ে দু’জনেই দেশের বাইরে কাজ পেয়ে চলে গেছে। এর মধ্যে গোস্বামীবাবুর দু’বার আমেরিকা ঘোরাও হয়ে গেছে। তাই পঞ্চায়েতের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং না হলে, খুব একটা পঞ্চায়েত অফিসে যান না। কিন্তু নিজের গ্রামের এই মিলন সমিতিতে থাকতে হয়।

মাঝে একবার ক্লাবে একটা জিএম ডেকে নিজেকে সবকিছু থেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বললেও, কেউ শোনেনি। উলটে তাকে শুনতে হয়, ‘যতদিন তোমার শরীর চলবে, ততদিন এইরকম ভাবেই কাটাও। তুমি চলে গেলে সমিতির কাজকর্ম আর আগের মতো হবে না। সবই তো বোঝো, এই বয়সের ছেলেমেয়েদের খুব মাথা গরম, তোমার মতো এত দিক ভেবেচিন্তে কেউ কাজ কি করতে পারবে?’

এরপর গোস্বামীবাবু আর দ্বিতীয় কথা বলেননি। কিন্তু কাজ করতে গিয়ে বুঝছেন, শরীর আর আগের মতো নেই, কষ্ট হচ্ছে। তাও প্রায় প্রতি সন্ধেতেই নিয়ম করে মিলন সমিতির আয়-ব্যয়ের খাতাটা খুলে বসতে হয়। সমিতির নিজস্ব আয়ও আছে। একটা সরকারি ব্যাংক সমিতির জায়গায় ভাড়া নিয়ে আছে। বাজারে সমিতির খান পাঁচেক দোকান আছে। এছাড়া প্রতি বছর দুর্গাপুজো, দু’দিনের যাত্রা আর বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন থেকে আরম্ভ করে ধর্মরাজ পুজো উপলক্ষ্যে টানা একমাসের এই মেলা থেকেও কম আয় হয়। না। সবকিছু ক্লাবের কমবয়সি সদস্যরা দেখলেও, তার উপরেই তো সবকিছুর দায়িত্ব। আর সব থেকে বড়ো দায়িত্বটা হল হিসাব রাখার। সেইসব হিসাব দেখছিলেন এমন সময় প্রশান্ত ঢুকল। একটু নরম গলায় বলল, ‘কাকা, মাঠে আমাদের সবাই বসে আছে। একটা আবদার আছে, একটু যদি শোনো সুবিধা হয়।’

—আবদার, তোদের আবার কীসের আবদার রে, এই তো গতবছর ব্রেক ড্যান্স নাগরদোলা করতে বললি, করেছি তো।

—না, ওটা তো ছিল বাচ্চাদের জন্যে। আমাদের নিজেদের তো মেলাতে সেরকম কিছু থাকে না।

—তার মানে কি মেলাতে বার বসাতে বলবি নাকি?

—না কাকা সেরকম কিছু নয়, তুমি একবার বাইরে এসো।

খাতাটা বন্ধ করে গোস্বামীবাবু বাইরে এসে দেখেন ততক্ষণে মাঠে প্রশান্তদের বয়সি বেশ কয়েকজন হাজির হয়ে গেছে। মনু, তপন, মানস, প্যাঙা— সবাই হাজির। এরা প্রতিবছর মেলাতে খুব খাটে।

গোস্বামীবাবুকে দেখে তাদের মধ্যে থেকেই একজন বলে উঠল, ‘কাকা, এবার একটু অন্যরকম কিছু করো। কতবার আর ওই প্যানপ্যানানি কীর্তন আর কবিগান শুনব। গতবার একটা অর্কেস্ট্রা করেছিলে, কিন্তু সেরকম জমেনি। এবার…’

—তোদের মত বল, কী করতে বলছিস?

গোস্বামীবাবু তাদের দিকে কথাগুলো ছুঁড়ে দিলেও, একটা অজানা গণিতের আশঙ্কায় একটু থম মেরে গেলেন। মেলাটা বড়ো করে সেজে ওঠার পর কয়েক বছর আগে অবধি এই মেলার সব ডাক নিয়ে নিত জুয়াপার্টিরা। তারাই ডাক দিয়ে বায়নার টাকা জমা দিয়ে চুক্তি করে যেত। পরে মেলা শুরু হওয়ার প্রথম বা দ্বিতীয় দিনে বাকি টাকা মিটিয়ে দিত। এরপর সমিতির সঙ্গে বাকি কারও-র আর কোনও কথা বলবার থাকত না। ওরা যা কথা বলত সব ওই জুয়াপার্টিদের সঙ্গে। বাকি দোকান, নাগরদোলা সব তারাই বসাত। এমনকী জুয়ার জন্যে পুলিশের টাকাও তারা নিজেরা জমা করে আসত।

প্রথম কয়েক বছর সবকিছু ঠিক ভাবে চললেও, ঝামেলা আরম্ভ হল কয়েক বছর পরেই। যখন আশপাশের কয়েকটা গ্রামের লোক জুয়াখেলার নামে একেবারে সর্বস্বান্ত হয়ে গেল, তখনই চেতনা ফিরল। সবার সঙ্গে আলোচনা করে জুয়াপাটির সঙ্গে ডাক একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হল। তারপর থেকেই এই রোলের দোকানদারই ডাক নিচ্ছে। জুয়াপার্টিরা বসছে, কিন্তু মেলার বাইরে। যদিও তার থেকে রোলের দোকানদার টাকা নিচ্ছে।

মেলা থেকে যা টাকা ওঠে তার একটা বড়ো অংশই চলে যায় কীর্তন আর কবিগানের পিছনে। বিশেষ করে কীর্তনের দলটা সাতদিন ধরে থাকে, খায়। সব খরচ মিলন সমিতির। থাকার জন্যে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলটা ব্যবস্থা করলেও খাওয়ার টাকাটা ভালোই লাগে।

—কাকা, বলছিলাম এ’বছর বুগিবুগি করাও।

—বুগিবুগি! ওটা আবার কী রে?

—ওই একটু নাচ গান। গতবছর প্রতাপপুর গ্রামে রক্ষাকালীর মেলাতে হয়েছিল শোনোনি? খুব ভিড় হয়েছিল। আলাদা করে টিকিট কেটে ঢুকতে হচ্ছিল। আমি দেখে এসেছি। কী ভিড় কাকা, না দেখলে তোমার বিশ্বাস হবে না।

—ওই হিন্দি গানের সঙ্গে নাচ, ওটার নাম বুগিবুগি? প্রতাপপুরে তো গতবছর খুব ঝামেলা হয়েছিল। পুলিশ এসেছিল….

—আমাদের গ্রামে কাকা ওসব কিছু হবে না। এখানে সবাই খুব শান্ত ভাবেই থাকে। এই যে এত বছর ধরে মেলা হচ্ছে, কোনও দিন কিছু হয়েছে?

—ঠিক আছে, আমি একটু ভেবে দেখি। সবার সঙ্গে আলোচনা করি।

—না কাকা, তোমাকে রাজি হতেই হবে। আমরা কোনও বছর কিচ্ছু বলি না। তুমি যেভাবে আমাদের কাজ করতে বলো আমরা সেভাবেই করি। এ বছরেই শুধু এটার জন্যে বলছি। তুমি ‘না’ বলবে না।

( ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...