ফুলির সঙ্গে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। আজকাল ফুলি একদিন না এলে আমার ভীষণ চিন্তা হয়, ভালো লাগে না। ফুলি এই বর্ষায় তিনদিন জঙ্গল থেকে মার্বেলের মতো সাইজের সাদা রঙের একরকমের মাশরুম এনে দিয়েছে, এটা রান্না করে খেতে হয়। ওরা এটাকে কুড়কুড়ে ছাতু বলে। প্রথমদিন খেতে ভয়ই লেগেছিল। কিন্তু ঠাকুরও বলেছিল খেতে খুব ভালো। গরম ভাতে ঠাকুরের করে দেওয়া ওই রান্না কিন্তু সত্যিই ভীষণ ভালো লেগেছে।
পাখি দুটো এখন অনেকটাই বড়ো হয়ে গেছে। ঠিকমতো উড়তে না পারলেও ওড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ওদের এই বড়ো হয়ে যাওয়াটা আজকাল আমার মন খারাপ করে দেয়। এদের উড়িয়ে দিলে ফুলি তো আর আসবে না। ওকে ছাড়া আমি তো আবার সেই একা হয়ে যাব। ফুলিও কি এমন করে ভাবে? ওরও কি খারাপ লাগবে আমার কাছে না এলে? নিশ্চয় লাগবে! ও যখন আমার সঙ্গে কথা বলে ওর চোখে কেমন যেন মায়া দেখি আমি। আমার একটু কষ্টও, ও সহ্য করতে পারে না। এই তো সেদিন গাড়িতে করে ডিউটি থেকে ফেরার সময় গাছের একটা সরু ডাল আমার কপালে লেগে কপালটা সামান্য কেটে গিয়েছিল। আমি ততটা গ্রাহ্য না করে ওষুধ লাগাইনি, তো ফুলির এসে কী রাগ! কী সব বকতে বকতে জঙ্গলের কী একটা পাতা এনে নিজের হাতে সেই রস লাগিয়ে দিল। তবে সেদিন যে ও কেন এমন বলল— আমি হাঁড়িয়া খাই না জেনেও, বলে কিনা ওর ইচ্ছে করে, নিজের হাতে একটা হাঁড়ি রং দিয়ে সাজিয়ে, তাতে হাঁড়িয়া ভর্তি করে আমার বাংলোয় নিয়ে আসবে। বলার পরে অদ্ভুত ভাবে হাসতে থাকে। পাগলি একটা!
আজ অনেক পুরোনো কিছু গাছ সরকারি নির্দেশে কাটা চলছে। ওই গাছ বিক্রি করে ওখানেই আবার নতুন করে গাছ লাগানো হবে। সমস্ত কাজ শেষ হতে হতে অনেকটা দেরি হয়ে গেল। প্রায় সন্ধ্যা নামছে। বাংলোয় ফিরে দেখি তখনও ফুলি ফিরে যায়নি। আমাকে দেখেই ছুটে এসে বলে, ‘বাবু এত দেরি? অন্ধকারে বনের ভিতরে কত ডর, আমি তো ইবার খুঁজতে বেরাথম্।”
আমি হেসে বললাম, “আমি তো গাড়িতে ফিরব, চিন্তা কী? আজ অনেক পুরোনো কিছু গাছ কাটা হল, তাই দেরি হল একটু।’ কথাটা শুনেই ফুলির মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। বাংলোর বাইরে জ্বলতে থাকা হালকা আলোয় স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, ওর চোখ চিকচিক করছে।
“উ গাছগুলানকে কেটে ফেললে বাবু! তুমরা ইটা ঠিক করো নাই। উ গাছগুলানের ভিতর সব থেকে বড়ো যে শিরিষ গাছ ট ছিল। উয়াকে আমি বুড়হা দাদু বুলে ডাইকতম্।’ কথাগুলো বলতে বলতে ওর গলায় কান্না জড়িয়ে যেতেই বাড়ির দিকে ছুট দিল। আমি আশ্চর্য হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আজ যেখানে মানুষ মানুষের জন্য কাঁদে না, সেখানে কে এই দেবী! যে গাছের জন্য চোখের জল ফেলছে!
গত তিনদিন ফুলি এখানে আসেনি। নিশ্চয় খুব রাগ করেছে। প্রতিদিন বিকেলে ডিউটি থেকে ফিরে ভাবি আজ নিশ্চয় আসবে ফুলি। ওরও কি খারাপ লাগবে না! এসে হতাশ হই। এত অভিমান মেয়েটার। কিছুই ভালো লাগছিল না আজ। চাঁদুর দোকানে গিয়ে বসলাম। সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছিল। চেইন স্মোকার না হলেও, মাঝেমধ্যে খাই। এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে ওর দোকানের সামনে রাখা বেঞ্চে বসে সিগারেট ধরালাম। এই ক’দিন একটু বেশিই খাওয়া হয়ে যাচ্ছে। কথায় কথায় চাঁদুর কাছে ওদের পাড়ার ফুলির কথা পাড়লাম। বললাম, ‘ফুলি তিনদিন পাখির দেখাশোনা করতে আসছে না, ওর শরীর ঠিক আছে তো?”
কথাটা শুনেই চাঁদু বলে উঠল, ‘আর বলো না বাবু, ফুলির সঙ্গে যা হল্য।”
“কী হয়েছে? কী হয়েছে ফুলির?”
‘আমাদের পশ্চিম পাড়ার লখাই বাস্কে পিয়ালবনীর হাটে পরশু জোর জবরদস্তি উয়াকে অর আদের বাপলা করে লিয়েচে।’
“মানে?”
“জোর জবরদস্তি সিন্দুর পরিয়ে বিহা করে লিয়েছে। ইবার আমাদের রীতি-নীতি মেনে উয়াকেই বিহা করতে হবেক, ফুলি না চাইলেও।”
‘এটা অসম্ভব, হতে পারে না। কিছুতেই হতে পারে না!”
“ইটাই নিয়ম, মেয়্যাদেরও এমন নিয়ম আছো। সেও যদি কুনো ছেল্যাকে ভালোবাসে তাইলে হাঁড়িতে করে হাঁড়িয়া ভরে লিয়ে তার ঘরে চলে যায়, আমাদের ইমন অনেক…
আমার ভিতর জুড়ে যেন সহস্র সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। নিজের ভিতর আর কোনও সংযম ক্ষমতা নেই। অস্ফুট স্বরে বলে উঠি ‘ফুলি, এমন কিছুতেই হতে দেব না, কিছুতেই না…!’ বলতে বলতে উঠে দৌড় দিলাম ফুলিদের বাড়ির দিকে।
অন্ধকার নেমে আসছে। ফুলিদের ছোটো বাড়িটার কাছে গিয়ে দেখলাম, থমথমে পরিবেশের মধ্যে উঠোনে কয়েকজন প্রতিবেশী নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে। আরও কাছে গিয়ে দেখলাম, ফুলিকে উঠোনে একটা মাদুরে ওরা শুইয়ে রেখেছে। একটু আগেই ফুলি বিষাক্ত গাছের পাতা খেয়ে জীবন দিয়েছে, তবু লখাইকে বিয়ে করবে না।
‘কেন ফুলি? কেন করলে এমন? একটিবার আমার কাছে গিয়ে বলতে পারলে না? আমি কিছুতেই তোমাকে হারাতে দিতাম না।’
সকালের লালচে রোদ গাছে গাছে এসে পড়েছে। পুরো জঙ্গলটা আজ আমার কাছে শ্মশান হয়ে উঠেছে। প্রকৃতিও বোধহয় মানুষের মনের সঙ্গে কথা বলতে জানে। নাহলে যে জঙ্গল আমাকে আনন্দের গান শোনাত, সেই কেন আজ থমথমে মুখে বিষাদের নিঃশ্বাস ফেলছে চারদিকে।
এই জঙ্গলের এক ভূমিতেই ফুলির শরীর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সারারাত ঘুমোতে পারিনি। আজ আবার সেই কাটা গাছগুলোর জায়গাতে নতুন গাছ লাগানো হবে। আমাকে যেতেই হবে। স্নান খাওয়া সেরে বেরোতে যাব, দেখি ফুলির দেওয়া তিতির পাখি দুটো খাঁচার ভিতর থেকে ঠোঁট দিয়ে দরজা খুলে বেরোনোর চেষ্টা করছে। ধীরে ধীরে এসে খাঁচার দরজাটা খুলে দিলাম, ওরা বেরিয়ে উড়তে শুরু করল। দূরের ওই নীল আকাশে ওরা ডানা মেলে উড়তে উড়তে হারিয়ে গেল।
(সমাপ্ত)





