ওনাম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মজবুত মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে। কেরালার প্রাণবন্ত ফসল উৎসব ‘ওনাম’ যেমন রাজা মহাবলীর স্মরণে উদযাপন করা হয়, ঠিক তেমনই মহিলাদের ক্ষমতায়নের জন্যও এই উৎসব উদযাপিত হয়। এখন ওনাম শুধু কেরালায় সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বের মালয়ালি সম্প্রদায় এটি উৎসাহের সঙ্গে উদযাপন করে এবং মহিলারা এই উদযাপনের প্রাণবিন্দু হয়ে আছেন। তাই বলা যায়, এই উৎসব এখন মহিলাদের নেতৃত্ব এবং সাংস্কৃতিক চরিত্র গঠনের জন্য একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে।

মালয়ালম ক্যালেন্ডার-এর ‘চিংগাম মাস’ অনুযায়ী (অর্থাৎ আগস্ট-সেপ্টেম্বর) দশ দিন ধরে উদযাপিত হয় ওনাম উৎসব। এই ফসল উৎসব আনন্দ ও উৎসাহে পরিপূর্ণ থাকে। চুলে জুঁইফুল শোভিত হয়ে এবং ঐতিহ্যবাহী কাসাভু শাড়ি পরে, মহিলারা উৎসাহের সঙ্গে যখন এই উৎসবের জন্য প্রস্তুতি নেন— এমন দৃশ্য সৌন্দর্যে ভরে ওঠে। আসলে, এই উৎসব জাতি ও ধর্মের বাধা অতিক্রম করে এবং আত্মাকে স্পর্শ করে। ওনাম কেবল সমৃদ্ধি এবং ঐতিহ্যের উদযাপনই নয়, বরং এটি মহিলাদের সাংস্কৃতিক চরিত্র গঠন, নেতৃত্ব এবং ঐক্যের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। এই উৎসব শুধু আজকের দিনেই নয়, ঐতিহাসিক ভাবেও নারীর কেন্দ্রীয় ভূমিকা উদযাপন করে চলেছে। এটি সৃজনশীলতা এবং ঐক্যে পূর্ণ একটি বর্ণিল উৎসব। শুধু কেরালায় নয়, অন্যান্য ভারতীয় এবং প্রবাসী মহিলাদের অংশগ্রহণও ওনামকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

ওনাম এবং মহিলাদের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ

কেরালার প্রাণবন্ত ফসল উৎসব ওনাম কেবল রাজা মহাবলীর প্রত্যাবর্তনের স্মরণার্থ উৎসব নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়নের একটি গভীর এবং প্রাণবন্ত উদযাপন। ফুলের রঙ্গোলি তৈরি থেকে শুরু করে, জমকালো ভোজসভার আয়োজন, স্ব-সহায়ক গোষ্ঠীর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ— সবই ওনাম উৎসবকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের দরবারে। আর ওনাম-এ মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ শুধু ঐতিহ্যকেই বাঁচিয়ে রাখে না, বরং সমৃদ্ধি এবং সামাজিক অগ্রগতিও ঘটায়।

এই উৎসব মহিলাদের জন্য সৃজনশীল, নেতৃত্ব এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার একটি প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। শুধু আজ নয়, ঐতিহাসিক ভাবেও, মহিলারা ওনাম উদ্‌যাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। কেরালা হোক, ভারতের অন্যান্য অংশ হোক বা প্রবাসী মালয়ালি সম্প্রদায়— মহিলাদের অংশগ্রহণই ওনামকে এত জনপ্রিয় করে তুলেছে।

মহিলাদের নেতৃত্ব

উঠোনে পুষ্প রঙ্গোলি থেকে শুরু করে, থিরুভাতিরা (কাইকোত্তিকালী) নৃত্য— সবমিলে ওনাম নারীদের শৈল্পিক প্রতিভা প্রদর্শন এবং সাজসজ্জার সুযোগ দেয়। মহিলারা স্কুল, অফিস, কমিউনিটি সেন্টার এবং বাড়িতে ফুলের সাজসজ্জা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দেন। তারা থিরুভাতিরা এবং কাইকোত্তিকালী-র মতো ঐতিহ্যবাহী নৃত্য শেখেন এই সময় এবং পরিবেশন করেন। এগুলি এখন কেরালার সব বয়সের মহিলাদের মধ্যে জনপ্রিয়। ঐতিহ্য সংরক্ষণের বাইরেও, ওনাম নারীদের পরিবার, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজে নেতৃত্বের ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। বাড়িতে হোক বা কর্মক্ষেত্রে, মহিলারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন, ভোজ প্রস্তুত করেন এবং আত্মীয়স্বজনদের সংযুক্ত করেন। কেরালার বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্ট-এর বাসিন্দা থেকে শুরু করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত মহিলারা, বিভিন্ন ক্লাব-সংগঠনের মহিলা সদস্যরা, এমনকী প্রবাসী মহিলারাও ওনাম-এর বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করেন।

ওনাম আয়োজন ও পরিচালনা, মহিলাদের মধ্যে টিমওয়ার্ক, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট এবং জনসমক্ষে বক্তৃতার মতো দক্ষতার বিকাশ ঘটায়। এই দক্ষতাগুলি কেবল উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও কার্যকরী হয়ে ওঠে। যেমন— – ব্যাবসা, কর্মক্ষেত্র কিংবা রাজনৈতিক ক্ষেত্র, সর্বত্র সুপ্রভাব ফেলে ওনাম। সেইসঙ্গে, বিশ্বজুড়ে ভারতীয় নাগরিকদের একাংশের মধ্যে সংযোগ ঘটায় এই ওনাম উৎসব। এটি প্রজন্মগত এবং সামাজিক বৈষম্য সরিয়ে দিয়ে ঐক্যকে সংগঠিত করে। তাই, ওনাম উৎসব শুধু সমৃদ্ধির প্রতীক নয়, বরং ক্ষমতায়নের উৎসব হিসেবেও বিবেচিত হয় এখন।

উদ্যোগ এবং ক্ষমতায়ন

মহিলা পরিচালিত স্বনির্ভর গোষ্ঠী ‘কুদুম্বশ্রী’ এবং সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলি প্রতি বছর ওনাম উৎসব উপলক্ষ্যে মেলায় স্টল স্থাপন করে। এই স্টলগুলোতে হস্তশিল্প, আচার, শাড়ি, খাবার এবং আরও অনেককিছু বিক্রি করা হয় এবং এগুলো অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যম হয়ে ওঠে। ওনাম তাই সামাজিক সম্পর্ক মজবুত করে, সামাজিক সমস্যা দূর করার মাধ্যম হয়ে ওঠে এবং গরিব মানুষকে আর্থিক ভাবে সমৃদ্ধ করে। এভাবে ওনাম একটি উৎসব থেকে, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মজবুত মাধ্যমে রূপান্তরিত হয়েছে। এখন ওনাম শুধু কেরালায় সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বের মালয়ালি সম্প্রদায় এটি উৎসাহের সঙ্গে উদযাপন করে এবং মহিলারা এই উদযাপনের প্রাণবিন্দু হয়ে আছেন।

প্রযুক্তি এবং অন্তর্ভুক্তি

প্রযুক্তি নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়িয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ও নারীরা এগিয়ে ছিলেন। অনলাইন নৃত্য প্রতিযোগিতা, রেসিপি ভাগাভাগি, গান, আবৃত্তি ইত্যাদির মতো ভার্চুয়াল ইভেন্ট-এর আয়োজন এবং অংশগ্রহণ তাদের সক্রিয়তা বৃদ্ধি করেছে।

এখন ওনাম শুধু একটি স্বর্ণযুগের উদযাপন নয় বরং ক্ষমতায়ন এবং ঐক্যের উদযাপন, যেখানে মহিলারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। তাদের নেতৃত্ব এবং সম্মিলিত অংশগ্রহণ, ওনাম-কে সাধারণ উৎসব থেকে এখন এক অপরিহার্য উৎসবে রূপান্তরিত করেছে। ‘পুকলম’-এর (ফুলের তৈরি নকশা) প্রতিটি পাপড়ি থেকে শুরু করে, কলাপাতার সাজসজ্জা, নৌকা বাইচ (বল্লম-কলি) প্রভৃতি হৃদয়ে আনন্দের যেমন অনুভূতি দেয়, ঠিক তেমনই আবিশ্বের মানুষকেও উৎসব উদযাপনে অনুপ্রাণিত করে।

মহাবলীর প্রত্যাবর্তন

যাঁর রাজত্বকালকে শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেই মহান রাজা মহাবলীর প্রত্যাবর্তনকে স্মরণ করে পালিত হয় ওনাম। এছাড়া, ওনাম হল কথাকলি, বল্লম-কলি, পুলিকলি কাইকোত্তিকালী এবং পুকলম-সহ কেরালার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক লাইভ প্রদর্শন বলা যায়। কলাপাতায় পরিবেশিত ওনাসাদ্যা, ঐক্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক। ওনাম তাই আঞ্চলিক সীমানা অতিক্রম করে ঐক্যের বার্তা দেয় এবং ভারতের বৈচিত্র্য এবং কৃষি ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীর সংযোগকে প্রতিফলিত করে।

(ক্রমশ… )

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...