বনের ভিতর থেকে ফিরে এসে মূল ফটক দিয়ে কিছুটা ঢুকে একটা ছোট্ট অ্যাম্পিথিয়েটারের মতো জায়গায় গ্যালারিতে গোল হয়ে বসলাম সবাই। প্রত্যেকটি জিপসির গাইড পর্যটকদের হাতে দুধ ছাড়া চা আর বিস্কুটের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে কেটে পড়লেও, ড্রাইভাররা মেইন গেট পর্যন্ত পৌঁছে দেবে বলে থেকে গেল। ভাগ্যিস! না হলে মায়ের পায়ে চোট নিয়ে বিপদে পড়তাম। যাইহোক, মোট ন’জন মেয়ের একটি দল ‘নৃত্য’ পরিবেশন করল। তাদের একজন প্রতিটি নাচের আগে একটু বিবৃতি দিয়ে দিচ্ছিল। আদিবাসী নাচের কোরিওগ্রাফিতে বৈচিত্র্য না থাকলেও শেষের পরিবেশনায় মাথায় তিনখানা কলসি বসিয়ে তার উপর প্রদীপ জ্বালিয়ে সাদামাটা পদক্ষেপগুলোই বেশ কঠিন হয়ে যায়।

এক অবাঙালি ভদ্রলোক আমার মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলেন, হাথি দেখি? ভাবলাম বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে এমনিই আলাপ জমানোর জন্য বলছেন। কিন্তু তাঁর স্ত্রীর কথায় নড়চড়ে বসতে হল। ‘আপলোগো কী গাড়ি হামারা গাড়ি ওভারটেক করকে নিকল গয়ি। উসিকে বাদ হি দশ-বারা হাথি-কা পুরা ঝুণ্ড সড়কপে আ গয়ে।’

আমাদের সঙ্গেই কেন এমন হয়? সেবার আমরা ছাঙ্গুতে ঠান্ডায় কাবু হয়ে ড্রাইভারের তাড়নায় ঝটপট গ্যাংটকে নেমে এলাম। পরেরদিন নিউজলপাইগুড়ি ফেরার পথে গাড়ি থামতে রাস্তায় দেখা হয় আমাদের সঙ্গেই ছাঙ্গু যাওয়া একটা দলের সঙ্গে। তারা ছাঙ্গুতে আরও আধ ঘণ্টা দেরি করার পুরস্কারস্বরূপ ভরপুর তুষারপাত পেয়েছে। শেষে সেনা গিয়ে তাদের গাড়ি উদ্ধার করে নিয়ে আসে। তবে, ড্রাইভার, গাইড— এরা সব টের পায়। বেদের সাপের হাঁচি চেনার মতো। আর জানে বলেই অনেকেই ঝামেলা আর দেরি এড়াতে ইচ্ছা করে পর্যটককে কিছু দেখা যাবে না, পাওয়া যাবে না ইত্যাদি বলে বিভ্রান্ত করে নিজেরা তাড়াতাড়ি ডেরায় ফিরতে চায়! ওদের কাছে তো এইসব দৃশ্য মামুলি ব্যাপার, দর্শনীয় কিছু নয়।

যাইহোক, মন দমে গেলেও দুরাশা পুষে রাখালাম। রাস্তা আটকে হাতি পেরোনোর ঘটনা এর মধ্যে যে-কোনও দিনই ঘটতে পারে। এমনকী আর্মি ক্যাম্পেও তারা মাঝেমধ্যেই হানা দেয়। কেবল আমার মতো উৎসাহী দর্শককে হতচ্ছাড়াগুলো কেন এত লজ্জা পায় কে জানে! আমাদের জিপসিটা একেবারে রিসর্টের গেটে নামিয়ে দিয়ে গেল। গরুমারা থেকে গাড়ি নিয়ে চাপরামারি অভয়ারণ্য, চাপরামারি ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারিও ঘুরে আসা যায়। এবারে মাকে নিয়ে সময় কিংবা শক্তি কোনওটাতেই পোষাল না৷ চাপরামারি অভয়ারণ্য

সেই হাতি, সম্বর ও বার্কিং ডিয়ার, বুনো শুয়োর, প্যাঙ্গোলিন এরাই লুকিয়ে আছে জঙ্গলে এবং তারা আপন মর্জিমতো দর্শন দিতে পারে আবার নাও পারে। তবু বনের মধ্যে দিয়ে গাড়িতে ঘোরা ব্যাপারটাই আনন্দের। তাছাড়া কপালে থাকলে তাদের আরও কাছ থেকে দেখা যায়। আয়তনে ছোটো হলেও পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম অভয়ারণ্য এই চাপরামারি। ১৯৩৯ সালে Game Sanctuary হিসাবে ঘোষিত এই বন ১৯৯৮ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র হিসাবে ঘোষিত হয়। ‘চাপরা’ অর্থাৎ মাছ এবং ‘মারি’ মানে সুপ্রচুর। মূর্তি নদীর তীরে কালিম্পং পাহাড়ি মহকুমার ঠিক পাদদেশে স্থিত এই অরণ্য আকর্ষণীয় তার উদ্ভিদ, পাখি ও বন্যপ্রাণী সম্ভারের জন্য। বৃক্ষের পাশাপাশি রয়েছে বিচিত্র অর্কিড।

গতবারে মারুতি জিপসি করে মোটামুটি একইরকম দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে ওয়াচ টাওয়ার পৌঁছানোর পথে বার্কিং ডিয়ারের একটা ঝাঁক দেখেছিলাম। আর নানা ধরনের পাখি, যার মধ্যে শালিক, চড়ুই ছাড়া আর কিছু চিনতে পারিনি। ওয়াচ টাওয়ার থেকে অনেক দূরের বুনোমোষ আর একটা গণ্ডার ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি। সেবার ছিল শীতকাল। সময়টা ঝাঁ-ঝাঁ দুপুর। ফেরার সময় ভাবছিলাম দলমার দস্যুদের জাত ভাইবোনেরা যদি আবার পথ অবরোধ করে তো বেশ হয়। রাতের সাফারি বা বনবাংলোয় রাত্রিবাস পশু দর্শনের মোটামুটি গ্যারান্টি দিতে পারে। রাতে লবণের গর্তে বা সল্ট-পিটে নুন খেতে তারা আসবেই। চাপরামারি যে আলাদা কোনও বন নয়, গরুমারা জাতীয় উদ্যানেরই (National Park) বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অঞ্চল (Wild Life Santuary), তা জানতে পেরেছি অনেক পরে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে।

গরুমারার প্রবেশ মূল্য

ওয়াচ টাওয়ারের প্রবেশমূল্য ও জিপ সাফারির ভাড়া পরিবর্তনশীল। কিন্তু জানা যায়, মোট চারটে শিফটে গাড়ি যায়। জনপ্রতি প্রবেশমূল্য ছাড়াও প্রতিটি গাড়ির জন্য পৃথক প্রবেশমূল্য আছে। মেঢলায় মোষের গাড়ি ভাড়া করলেও, মানুষপিছু ও গাড়িপিছু ভাড়া লাগে৷ মেঢলা ও চন্দ্রচূড় ছাড়া নৈশভ্রমণের জন্য সর্বত্র বাড়তি মূল্য দিতে হবে। কারণ শেষ ট্রিপে আদিবাসী নৃত্যও সংযোজিত।

জিপসি-র ভাড়া অবশ্য খুব বেশি ছিল না। যাত্রাপ্রসাদ, মেঢলা ও চন্দ্রচূড় প্রায় সমান, আর চাপরামারি সর্বাধিক। একটা গাড়িতে সর্বাপেক্ষা ৬ জন। সঙ্গে লাগুক না লাগুক গাইড নিতে হবে গাড়ি পিছু দক্ষিণা দিয়ে। এছাড়া ভিডিও ক্যামেরা থাকলে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে টিকিট করানোর কথা।

গাড়ি ভাড়া করার সময় সহযাত্রীরা একই পরিবারভুক্ত না হলে হিসাব-নিকাশ বেশ জটিল হয়ে যেতে পারে। যদি মন্ত্রী-আমলা পর্যায়ে যোগাযোগ থাকে গরুমারা বা চাপরামারির বনবিভাগের কটেজে অবশ্যই রাত্রিবাস করুন। বন্যপ্রাণীরা নুন চাটতে সল্ট পিটগুলোতে আসে, যেগুলো ওয়াচ টাওয়ার ও বনবংলোর কাছাকাছি। বনের ভিতর কোর এরিয়ায় থাকতে পারলে, মূল ফটকের কাছে এসে সন্ধেবেলায় স্থানীয় আদিবাসী নাচ-গানের জলসা দেখে নিতে পারেন। আজকাল প্রায় সব ট্যুর অপারেটরই এই বাড়তি বিনোদনটুকু তাদের ভ্রমণসূচিতে রাখে।

প্রতি বছরই ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গরুমারা ও বক্সা জঙ্গল পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকে। গরুমারা জিপ সাফারি ও চাপরামারির টিকিট পাওয়া যায় লাটাগুড়ির Nature Interpretation Center Ticket Counter থেকে। তবে মেঢলা ওয়াচ টাওয়ারের টিকিট সারা বছর রামসাই টিকিট কাউন্টার থেকেও উপলব্ধ। অনেক আগে লাইনে দাঁড়িয়ে কেটে নেওয়াই নিরাপদ। সময়সূচি কিন্তু বদলাতে থাকে। সাম্প্রতিক সূচি জানতে কাউন্টারে গিয়ে আগে থাকতে খোঁজ নিন। শিলিগুড়ি থেকে চাইলে চালসা বা নাগরাকোটাগামী ট্রেনে করেও গরুমারা ঘুরে আসা যায়।

ফেরার পথেও সেই কিছুদূর বনভূমি চিরে ছোটা, ফাঁকা পথে মরীচিকার জলছবি, মাঝামাঝে পাহাড়ি ঝোরা বা বৃষ্টিধারার জেব্রাক্রসিং মানে ‘কজ-ওয়ে’ (causeway), গজলডোবার বাঁধ আর রাস্তার দুই পাশে চা-বাগান ও নাতিবৃহৎ বৃক্ষের নয়নাভিরাম যুগলবন্দী। ২৩ তারিখই শিলিগুড়ি ফিরলাম।

বদ হজমের মধ্যে বাইরের খাওয়া উচিত হবে কি না হবে ভেবেও যথারীতি রেস্তোরাঁ থেকে দুপুরের খাবার কিনতে হল। কিন্তু সেবক মিলিটারি স্টেশন ঢুকেই বুকে জোর ধাক্কা— আফশোসের! শুনলাম হাতির একটা ছোটো দঙ্গল এসে অনেক অনর্থ করে গেছে। হায় রে, গরুমারা, হায় রে উজিয়ে ঘোরা!

প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা

যাত্রার উপায়: কলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ির অজস্র ট্রেন। শিয়ালদা থেকে দার্জিলিং মেল, পদাতিক, উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস, কাঞ্চনকন্যা, কাঞ্চনজঙ্ঘা, হাটেবাজারে ইত্যাদি। কলকাতা স্টেশন থেকে গরিব রথ, কলকাতা-হলদিবাড়ি, কলকাতা-ডিব্ৰুগড় ইত্যাদি। হাওড়া থেকে শতাব্দী, তিস্তা তোর্সা, হাওড়া-এনজেপি এসি এক্সপ্রেস (সপ্তাহে ২ দিন), গুয়াহাটি এক্সপ্রেস, হাওড়া- কাটিহার এক্সপ্রেস, কর্মভূমি ইত্যাদি। মরশুমে এত ট্রেনেও টিকিটের আকাল পড়ে যায়। তাছাড়া ধর্মতলা থেকে রাজ্য সরকারের রকেট ও বিভিন্ন প্রাইভেট ভলভো ছাড়ে শিলিগুড়িগামী। আসানসোল, অণ্ডাল ও বোলপুর থেকেও এনজেপি-র ট্রেন আছে।

থাকার আশ্রয়: গরুমারা, চাপরামারি অরণ্য দেখতে হলে লাটাগুড়ি, চাপরামারি ও চালসাতে অনেক বিলাসবহুল থেকে সাধারণ হোটেল ও রিসর্ট পাবেন। ভুটান পাদদেশে জয়গাঁও ও ফুন্টশোলিং ভুটান গেটের এপার-ওপারের জোড়া শহর। দুই স্থানেই বহু হোটেল আছে। তবে আমার ব্যক্তিগত মত, জয়গাঁওতে থাকা ও খাওয়া তুলনামূলক বেশি ভালো ও সাশ্রয়কর। আপনার মোবাইলে আইএসডি রোমিংও করতে হবে না।

সঙ্গের সহায়: ছাতা, ওষুধ, যথেষ্ট শীতবস্ত্র, ক্রিম, লোশন, সানস্ক্রিন লোশন। আর ভুটান যেতে হলে অবশ্যই নিজের ছবি ও পরিচয়পত্র। ভুটানের জন্য মুদ্রা পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। সর্বত্র ভারতীয় টাকা চলে ও বিনিময় একই।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...