বহু-তারকা নিয়ে সিনেমা তৈরির যুগ শুরু হয়েছিল ৬০ বছর আগে ‘ওয়াক্ত’ ছবির মাধ্যমে। যশ চোপড়া পরিচালিত ‘ওয়াক্ত’ (১৯৬৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত) ছবিতে বলরাজ সাহনি, সুনীল দত্ত, রাজকুমার, শশী কপূর, শর্মিলা ঠাকুর এবং সাধনার মতো কিংবদন্তি অভিনেতাদের এক ফ্রেমে রাখা হয়েছিল, যা বহু তারকা যুগের সূচনা করেছিল।

জনপ্রিয় ‘ওয়াক্ত’ ছবিটি সেই সময়ের একটি সুপারহিট ছবি ছিল, কারণ একটি বহু-তারকা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে, দর্শকরা তাদের প্রিয় অভিনেতাদের এক টিকিটেই দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন।

এই ছবির জনপ্রিয়তার পর ‘রোটি কাপড়া অর মকান’, ‘ক্রান্তি’, ‘দান’, ‘নমক হালাল’, ‘শান’, ‘শোলে’, ‘মুকাদ্দার কা সিকন্দার’, ‘অমর আকবর অ্যান্টনি’, ‘পূরব পশ্চিম’ ইত্যাদি মাল্টি-স্টারার সিনেমা তৈরি হয়েছিল এবং প্রত্যেকটি সিনেমা চূড়ান্ত সাফল্য পেয়েছিল।

এরপর শাহরুখ খানের ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘কভি খুশি কাভি গম’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ কিংবা সলমন খানের ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’, ‘জুড়ওয়া’, “হাম সাথ সাথ হ্যায়”, “থ্রি ইডিয়টস’ ইত্যাদি সিনেমা তৈরি হয়েছিল এবং হিট করেছিল। কিন্তু যা বলতে চাইছি তা হল, সুনীল দত্ত, রাজ কুমার, শত্রুঘ্ন সিনহা থেকে শুরু করে অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র, অনিল কপূর, নানা পাটেকর, শাহরুখ খান, সলমন খান, আমির খান কিংবা অক্ষয় কুমারের মতো স্টাররা প্রায় সকলেই মাল্টি-স্টারার সিনেমায় কাজ করেছেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে, ওই রকম মাল্টি-স্টারার সিনেমার সংখ্যা কমে গেছে। এর কারণ কী? মাল্টি- স্টারার সিনেমা তৈরির সুবিধা এবং অসুবিধাগুলি তাহলে কী কী?

এমন একটা সময় ছিল, যখন অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র, বিনোদ খান্না, শশী কপূর, রেখা, হেমা মালিনী প্রমুখ অভিনেতাদের সিনেমা দেখার জন্য দর্শকরা সবসময়ই মুখিয়ে থাকতেন। এমন পরিস্থিতিতে, যখন নির্মাতারা এই তারকাদের এক ফ্রেমে রেখে একটি সিনেমা তৈরি করতেন, তখন সেই মাল্টি-স্টারার ছবিটি জনপ্রিয়তা পেত। সুভাষ ঘাইয়ের ‘রাম লক্ষণ’-এর মতো সিনেমাও এভাবেই সুপারহিট হয়ে উঠেছিল। বিধাতা, খলনায়ক, কর্মা, তাল, আঁখে, হাতকড়ি, পাপ কি দুনিয়া, মুকাদ্দার কা সিকন্দার, নমক হালাল, শরাবি ইত্যাদি সিনেমাও মাল্টি-স্টারার হওয়ার কারণেই হিট করেছিল।

যখন থেকে মাল্টি-স্টারার চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়, তখন থেকেই ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’, ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’, করণ জোহরের ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘কভি খুশি কাভি গম’, ‘কাল হো না হো’ প্রভৃতি মাল্টি-স্টারার সিনেমা পরপর তৈরি হতে থাকে এবং সাফল্যও পায়। এই কারণেই বহু তারকার অভিনয়ে সমৃদ্ধ সিনেমাগুলি বছরের পর বছর ধরে দর্শকদের পছন্দ হয়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি, এমন একটি সময় এসেছে, যখন বহু তারকা চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে, যার প্রধান কারণ হল— শেষ কয়েক বছরে কিছু মাল্টি-স্টারার সিনেমার অসাফল্য।

রণবীর কপূর, সলমন খান, রানি মুখোপাধ্যায়, সোনম কপূর অভিনীত, সঞ্জয় লীলা বনসালির ‘সাওয়ারিয়া’র মতো বড়ো বাজেটের মাল্টি-স্টারার চলচ্চিত্র, বনি কপূরের ‘রূপ কি রানি চোরোঁ কা রাজা’, শ্রীদেবী এবং অনিল কপূর অভিনীত মাল্টি-স্টারার ‘জানি দুশমন’, সলমন খান অভিনীত ‘কিসি কা ভাই কিসি কি জান,’ ‘সিকান্দার,’ ‘রেস থ্রি,’ ‘’টিউবলাইট,’ ‘আন্দাজ আপনা আপনা’ খুব বেশি সাফল্য পায়নি।

অক্ষয় কুমার অভিনীত ‘সম্রাট পৃথ্বীরাজ’, ‘সেলফি’, ‘বড়ে মিয়াঁ ছোটে মিয়াঁ ২’, ‘খেল খেল মে’, শাহরুখ খান অভিনীত মাল্টি-স্টারার ছবি ‘ত্রিমূর্তি’, ‘জিরো’, ‘দিল সে’, ‘কিং আঙ্কেল’ ইত্যাদি ফ্লপ করেছে। এরপর, নির্মাতারা এত বড়ো মাল্টি-স্টারার ছবি তৈরি করা থেকে বিরত থাকতে শুরু করেন। কারণ, মাল্টি-স্টারার ছবির বাজেট অনেক বেশি। আর সকলকে একত্রিত করা এবং সকল অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয় করানোর জন্য ‘ডেট ব্যালেন্স’ করা সহজ নয়। তাই সবকিছুর পর যদি সেই মাল্টি- স্টারার সিনেমাটি সফল না হয়, তাহলে এর প্রভাব অভিনেতাদের চেয়ে নির্মাতাদের উপর বেশি পড়ে।

বলিউডে অনেক অভিনেতা আছেন যারা হয়তো পুরোনো ধারা মাথায় রেখে বহু তারকাযুক্ত ছবি করতে আগ্রহী, সে অক্ষয় কুমার, আয়ুষ্মান খুরানা, শাহরুখ খান কিংবা সলমন খানই হোক না কেন। আবার অনেক অভিনেতা আছেন যারা বহু-তারকা যুক্ত ছবি করতে দ্বিধা করেন। কারণ তারা বহু তারকা ছবিতে ভিড়ের অংশ হতে অস্বীকার করেন।

আজকাল অনেক অভিনেতাই বহু-তারকা সমৃদ্ধ ছবি প্রত্যাখ্যান করছেন। কারণ তাদের ভূমিকা সম্পাদনায় কাটা বা কমিয়ে দেওয়া হবে অথবা একজন বড়ো অভিনেতার সঙ্গে কাজ করার সময় তাদের উপস্থিতি কম দেখা যাবে ইত্যাদির ভয় থাকে। যদিও কিছু পুরোনো নির্মাতার মতে, আগের অভিনেতারা একসঙ্গে কাজ করতে এতটাই পছন্দ করতেন যে, তারা ছবির গল্পও শুনতেন না। তাঁরা কেবল তাঁর প্রিয় অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করার জন্যই ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হতেন, যাতে কাজের পাশাপাশি আনন্দ করার সুযোগও পান।

এছাড়াও, আগেকার অভিনেতারা তাদের অহংকারকে দূরে রেখে অন্যান্য অভিনেতাদের সঙ্গে তাদের শুটিংয়ের ‘ডেট’ অ্যাডজাস্ট করতেন। কিন্তু আজকের দ্রুতগতির যুগে, প্রযোজকদের পক্ষে শুটিংয়ের জন্য অভিনেতাদের ‘ডেট ব্যালেন্স’ করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

এই কারণেই অতীতের তুলনায় বর্তমানে কম মাল্টি-স্টারার সিনেমা তৈরি হচ্ছে। যদিও মাল্টি-স্টারার সিনেমার চাহিদা অতীতের মতো না হলেও, কমবেশি আছে আজও।

আরতি সাক্সেনা

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...