প্রবালের মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী শেলী সম্পূর্ণ একা। অসহায়। আনমনা। একাকিত্বের দুঃসহ কষ্ট বুকে আঁকড়ে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেল শেলী। প্রাণচঞ্চল সদা হাস্যময়ী শেলীকে চেনাই যাচ্ছে না এখন। এই ক’দিনেই দ্রুত বদলে গেছে সে। এতদিনের সংসার জীবনের ইতি হয়ে গেল এক মুহূর্তে।

শেলী কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না প্রবালের এভাবে চলে যাওয়াটা। কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না সে। বেশ তো ছিল প্রবাল। খুব সাবধানী মানুষটার জীবন হঠাৎ এভাবে থেমে যাবে, ভাবাই যাচ্ছে না। আসলে প্রবালের হঠাৎ করে সিভিয়ার অ্যাটাক হয় শেষ রাতে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সব শেষ। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও দিল না।

ঢাউস বাড়িটা যেন গিলতে আসছে। শেলীর মনে তোলপাড় হতে থাকে ফেলে আসা দিনগুলো। নানান ঘটনার কথা ওকে বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় অতীতে।

প্রবালের সঙ্গে প্রথম আলাপ রানুদির বিয়েতে। রানুদি ওর মাসতুতো দিদি। অতীনদার বন্ধু এই প্রবাল তখন বেঙ্গালুরুতে পোস্টেড। বন্ধুর বিয়ের জন্যই কলকাতায় আসা। রানুদির বাসরঘরে শেলীর গান শুনে প্রশংসায় পঞ্চমুখ প্রবাল। দুদিন বাদেই প্রবাল বেঙ্গালুরু ফিরে যাওয়ার আগে, হঠাৎ করে শেলীর মোবাইলে কল করে নিজের নাম্বার দিয়ে ফোন করতে বলে। সৌজন্যমূলক কথাবার্তা চলে। এভাবে ফোনেই কথা চলতে থাকে। অতীনদা অবশ্য খানিকটা রসদ জোগায়। প্রেমপর্ব চলে ফোনেই। বছরখানেক বাদে কলকাতায় বদলি হয়ে আসার পর ওরা অনেকটা ঘনিষ্ঠ হয়। শেলী ততক্ষণে বিএ পাশ করে টিউশন করছে।

না, আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি ওদের। রানুদি আর অতীনদার দৌলতে বাড়িতে কথাটা পাড়তেই, শেলীর মা-বাবা রাজি হয়ে যান। জামাই হিসেবে প্রবালকে ওনাদের পছন্দ হয়। সুতরাং এক মাঘের শেষ রাতে সানাই বাজল ঘোষাল বাড়িতে।

প্রবালের অফিস কলিগ বিকাশের সঙ্গে আলাপ হয় শেলীর। ওরা তিনজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যায়।

তৃণা রাতে মায়ের সঙ্গে শুচ্ছে ক’দিন। শেলী রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারে না। সারাক্ষণ প্রবালের কথা মনে পড়ে। সাতাশটা বছর শেলী আর প্রবালের দাম্পত্য জীবন। বিয়ের পরের বছরই তৃণার জন্ম। মেয়েকে নিয়ে সংসারটা আরও খুশিতে ভরে ওঠে।

তৃণা অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ওর উপর দিয়ে অনেক ঝড় গেল এই ক’দিনে। শেলী মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্টটা দমিয়ে রাখার চেষ্টা করল। ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে খোলা জানলার কাছে এসে দাঁড়াল। রাতের আকাশ হালকা নীল জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। সেবার নৈনিতালে বেড়াতে গিয়ে এরকম জ্যোৎস্না রাতে ওরা হোটেলের বারান্দা থেকে পাহাড়ের গায়ে অজস্র জোনাকির মতো আলো দেখে বিভোর দু’জনেই। প্রায় প্রতি বছর কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাওয়া চাই। কত হই হুল্লোড়। অনেকসময় ওদের সঙ্গে কনফার্মড ব্যাচেলর বিকাশদাও যেত। সেসব দিনের কথা বড়ো মনে পড়ছে এখন। সবই স্মৃতি হয়ে রয়ে গেল।

একটা অব্যক্ত কষ্ট দলা পাকিয়ে ওর কণ্ঠ রোধ করছে। কান্না কান্না পাচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদ মেঘের খেলা দেখতে দেখতে অনেকটা সময় কেটে যায়। রবি ঠাকুরের গানের কলি মনে পড়ছে। ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে…। এসময় তোমাকে যে চাই প্রবাল৷ তুমি কেন চলে গেলে? একা একা কী করে থাকি বলো তো। এই নরম মোলায়েম জ্যোৎস্নার আবেশ জড়ানো রাতে তোমার পরশ উষ্ণতা ঢালুক মনের ক্ষত স্থানে। তুমি ফিরে এসো। এই জ্যোৎস্না রাতে তুমি থাকো আমার সঙ্গে। একটা বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস তাকে দুর্বল করে তোলে।

একসময় শেলী ধীর পায়ে বিছানায় এসে বসে সন্তর্পণে। পাছে মেয়ের ঘুম ভেঙে যায় তাই কাঁদতেও পারে না। নিজেকে সামলে নেয়। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠিক বাবার মুখের আদল পেয়েছে মেয়েটা। সেও তো বাবাকে বেশি দিন পেল না। চাকরির সুবাদে পুণেতে প্রায় দু-বছর হল। পুজোর সময় ছাড়া আসতে পারে না। এই তো গতবার পুজোতে ভোরবেলা গাড়ি নিয়ে ঠাকুর দেখতে সিলেক্টেড কিছু প্যান্ডেল ঘুরে এসেছে ওরা তিনজন।

তৃণার হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেতেই মাকে বিছানায় বসে থাকতে দেখে উঠে বসে।

—কী শরীর খারাপ লাগছে? জল খাবে ? তৃণা উঠে গিয়ে জল নিয়ে এসে মাকে খাইয়ে দিয়ে বলে, বসে আছো কেন? ঘুম আসছে না? বাবার কথা মনে পড়ছে?

এতগুলো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না শেলী। নিজেকে সামলাতে না পেরে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে।

কাজ মিটে যেতেই তৃণা পুণে ফিরে গেছে। কাজের খুব চাপ। কলকাতায় মায়ের কাছে আর থাকা সম্ভব নয়। নিজের সঙ্গে মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল তৃণা। শেলীই রাজি হয়নি। পুণেতে একাই থাকে তৃণা। মা গেলে ওরই সুবিধে হতো আর মায়ের একাকিত্বও কাটত। কিন্তু শেলীই না করে দিল।

( ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...