‘গাছ ফ্রেম’-এর মাঝে প্রপাতের দৃশ্য অনবদ্য। গ্রীষ্মে জল কম থাকায় এর স্ফীতি ও তীব্রতা যথেষ্ট কম। সেই জলধারা উপর থেকে নীচে পড়ে ওই পাহাড়ি গিরিখাত দিয়ে বয়ে চলেছে। একটা ভিউ পয়েন্টও রয়েছে কাছাকাছি। যেখান থেকে আরও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে প্রপাতকে। জায়গাটা অতীব নির্জন। মনে হচ্ছে গাছগাছালির আড়াল থেকে শয়ে শয়ে জন্তুজানোয়ার আমাদের ওয়াচ করছে। পাশেই সল্টপিটে নুন চাটতে আসত এক সময় জন্তুজানোয়ার।
মাওবাদী হামলার পর সব এখন পরিত্যক্ত। রিসর্ট ভস্মীভূত। ওয়াচটাওয়ার ভেঙে গেছে। সেই পরিত্যক্ত স্থানে গাছগাছালির আলো- ছায়ার পরিবেশের মাঝে আমরা একটু বিশ্রাম নিলাম। না ভাঙা কয়েকটা কটেজে কিছু বনকর্মী রয়েছে। এখানে এক বিল্ডিং- -এর সদৃশ ওয়াচটাওয়ারের ছাদে উঠে পাখির চোখে জঙ্গল দেখার চেষ্টা করলাম। তবে বিশেষ কিছু লাভ হল না। কারণ চারদিক প্রকাণ্ড সব গাছগাছালির আড়াল। তার মাঝে দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। সেই সবুজের সামান্য আস্বাদ নিয়েই পুনরায় গাড়িতে উঠলাম।

এবার চলেছি বরেহিপানির পথে। এই পথসৌন্দর্য নয়নাভিরাম। পথের দু’দিকে সবুজ পাহাড়ি পাদদেশ আর বাদামি রঙের মেশানো প্রাকৃতিক ক্যানভাস। মাঝে পড়ল নুয়ানা উপত্যকা। ঢেউ খেলানো অনেকটা অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত। যেখানে চাষবাস হচ্ছে। দু’দিকে পাহাড়। কয়েকটি আদিবাসী গ্রাম রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। এখানকার বাড়িগুলোতে সোলার প্যানেল নজরে পড়ল। রয়েছে একটা প্রাইমারি স্কুলও। গাইড জানাল, ব্রিটিশ জমানায় ন’আনা খাজনা দিতে হতো এখানকার আদিবাসীদের। সুদূর আফ্রিকা মহাদেশের একটা ফ্লেভার মেলে এখানকার ভূমিরূপে। সেই উপত্যকা পেরিয়ে আবার পাহাড়ি পাকদণ্ডি পথে। এই রাস্তাতেও দেখা মিলল বেশকিছু বাঁদরের। পেরিয়ে গেলাম হাতি চলাচলের করিডোর। দেখা হয়ে গেল সেই পলপলা নদীর সঙ্গে। ক্ষীণকায়া নদীটির জলের রং পান্না সবুজ। আড়ম্বরহীন ভাবে নিবিষ্ট চিত্তে সে বয়ে চলেছে আপন ছন্দে।
বরেহিপানি জলপ্রপাতের আগেই রয়েছে স্থানীয় আদিবাসীদের দ্বারা পরিচালিত একটা হোটেল। খড়ের চাল আর মাটির দেয়াল-সমৃদ্ধ এই হোটেলটিকে একটা হলঘরের মতো দেখতে লাগছে। ছবির মতো সুন্দর! প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই। আমাদের গাইড মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য ওখানে নেমে গেল। আমাদের সঙ্গে খাবার আছে। তাই এগিয়ে গেলাম জলপ্রপাতের দিকে। এ তল্লাটে শুনলাম ১২০ ঘর আদিবাসী বসবাস করে। অলস দুপুরে গবাদি পশুর দল চরে বেড়াচ্ছে। কয়েকটা বাচ্চাকে আদুল গায়ে খেলা করতে দেখলাম। মনে হল এইসব স্থানে হিংস্র পশুর আক্রমণ সেভাবে হয় না। একসময় পৌঁছে গেলাম বরেহিপানি জলপ্রপাতের সামনে। পার্কিং লট থেকে একটু এগোতেই দেখি সামনেই ফ্রেমজুড়ে অনবদ্য বরেহিপানি।

প্রথম দেখাতেই প্রপাতের রূপে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। জায়গাটা বেশ পরিপাটি করে রাখা। সামনেই মোরাম বিছানো চত্বর, নীচে গভীর গিরিখাত। খাদের ধার ধরে টানা রেলিং। খাদের ওপারে পাহাড় থেকে নেমে এসেছে এই জলপ্রপাত। মেঘাশুনি পাহাড়ের উপর দিয়ে আসা বুড়ি বালাম নদী এখানে ১,৩০৯ ফুট উচ্চতা থেকে দুটো ধাপে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এটি ভারতের দ্বিতীয় উচ্চতম জলপ্রপাত। প্রপাতকে উপর থেকে দেখার জন্য রয়েছে ওয়াচটাওয়ার। সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলাম ওর মাথায়। আর মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে থাকলাম পাহাড় থেকে সুতীব্র বেগে নেমে আসা জলধারার অনবদ্য রূপ। অনেকটা দূর হলেও, উঁচু থেকে জলের আছড়ে পড়ার একটানা আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। পাহাড় মাঝে ঘন সবুজ জঙ্গলের গায়ে শুভ্র সেই জলধারা যেন সবুজের উপর একটা আলপনা আঁকছিল।
বর্ষায় এই প্রপাতের চেহারা কেমন হয়, মনে মনে একটা আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলাম। সত্যি কথা বলতে, বরেহিপানিকে দেখে মনে হয় কোনও রূপকথার গল্পের অলংকরণ। মনে মনে ভাবি, যদি এখানে রোপওয়ে বা জিপ লাইনিং-এর ব্যবস্থা থাকত, তাহলে প্রপাতের কাছে গিয়ে এর রূপ মাধুর্য আকণ্ঠ পান করতাম। প্রপাত দেখার ফাঁকে, আমরা এক গাছতলায় বসে সঙ্গে আনা খাবার খেয়ে নিলাম। জঙ্গলে খাবারের গন্ধে বেশকিছু কীটপতঙ্গ এসে হাজির। এর মধ্যে ভিন্ন প্রজাতির কিছু মৌমাছির দেখা মিলল। ধুমা (ড্রাইভার) অবশ্য বলল, ‘গায়ে বসলেও এরা কামড়ায় না।’ খাওয়ার পরও বেশ কিছুক্ষণ প্রপাতের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। নিজের সমস্ত ব্যস্ততা ভুলে গিয়ে, শুধু প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলার মোক্ষম জায়গা মনে হল এটা।

অপার্থিব বুনো আদিমতা আর মদিরতা যেন আচ্ছন্ন করে ফেলেছে আমাদের। সময় কখন কীভাবে যে কেটে গেল টেরও পেলাম না। ফেরার ইচ্ছেটা যাচ্ছিল মরে! বরেহিপানি প্রপাত থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে উস্থি ফল্স। তবে এই গ্রীষ্মে ফসে জল নেই, জানার পর আর ওপথে এগোলাম না। সময়াভাবে যাওয়া হল না চাহালা ওয়াচটাওয়ার ও সীতাকুণ্ড। যা দেখার জন্য বাড়াতে হবে দিন এবং করতে হবে অরণ্যে রাত্রিবাস। এর মধ্যে গাইড এসে হাজির। আমরা যোশীপুর দিয়ে ফিরব না। অতএব ফেলে আসা পথ ধরেই ফিরতে হবে। আমাদের গাড়ি আগে ফিরলে কিছু জন্তুজানোয়ার কপালে জুটতেও পারে, এইরকম একটা সম্ভাবনার কথা শোনাল গাইড।
ফেরার পথে একস্থানে গাড়ি থেকে নেমে জংলি পথ ধরে এক ওয়াচটাওয়ারের কাছে পৌঁছালাম। পাখির চোখে সিমলিপালকে দেখার ইচ্ছে নিয়ে উঠে গেলাম টিলার মাথায়, নজরমিনারে। চারপাশে পাহাড়, মালভূমি আর শালের দুর্ভেদ্য জঙ্গল। একসঙ্গে এত কিছু দেখে চোখে রঙের নেশা লেগে গেল। প্রকৃতি এখানে মৌন তপস্বীর রূপ ধরে নিজের সৌন্দর্যের সব আকরটুকু মেলে ধরেছে। পাহাড়ের গায়ে জড়ানো বনানী ঠিক যেন কার্পেট বিছানো। ওয়াচটাওয়ার থেকে চারপাশের প্রকৃতি উপচানো অঢেল রূপের ডালি দেখে নামতেই ইচ্ছে করছিল না।

জঙ্গল ছেড়ে এখন লোকালয়ে। পিছনে পড়ে থাকে সিমলিপাল অরণ্য। আর সঙ্গে একটা পুরো দিন জঙ্গলের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার অদ্ভুত মাদকতা ভরা টাটকা স্মৃতি। আকাশের মেঘে অস্তরাগের আঁচড়। আগুনের গোলার মতো সূর্য পশ্চিমে ঢলে যেতে যেতে ডুব দিল অরণ্য গভীরে। সে এক অনবদ্য দৃশ্য! আকাশের বুকে রঙের সাপ-লুডো খেলার পর, অনেকটা সময় চরাচর জুড়ে লেগে থাকল দিনের নেভা নেভা আলো। ছুটে চলে গাড়ি পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের পথে। অন্ধকার ততক্ষণে জমাট বাঁধতে শুরু করেছে।
কীভাবে যাবেন: হাওড়া থেকে দক্ষিণ ভারতগামী যে-কোনও ট্রেনে বালাসোর। বালাসোর থেকে সরাসরি গাড়িতে বারিপদা, পিথাবাটা অথবা যোশীপুরে অবস্থান করে সিমলিপাল অরণ্য ঘুরে নিতে পারেন। আবার চাঁদিপুর বা পঞ্চলিঙ্গেশ্বর থেকেও ডে ভিজিটে ঘুরে নিতে পারেন। ইচ্ছে করলে বাংরিপোশি থেকেও সিমলিপাল অরণ্য ঘুরে নিতে পারেন।
কোথায় থাকবেন: সিমলিপাল জঙ্গলের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত ফরেস্ট বাংলোগুলিতে থাকতে পারেন। এগুলির অবস্থান চাহালা, বরেহিপানি, নওয়ানা, গুড়গুড়িয়া এবং যোশীপুরে। বারিপদাতে রয়েছে বহু প্রাইভেট হোটেল। যোশীপুরেও রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রাইভেট হোটেল।
কখন যাবেন: গরমের দিনগুলো বাদ দিয়ে বছরের যে-কোনও সময় যেতে পারেন। সেরা সময় অক্টোবর থেকে মার্চ। তবে আমাদের মতো গ্রীষ্মের দিনে ঘুরতে পারলে ফাঁকা ফাঁকায় নিজেদের মতো করে ঘুরতে পারেন।
প্রয়োজনীয় তথ্য: সিমলিপাল অরণ্য খোলা থাকে ১ নভেম্বর থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত। প্রবেশের সময় সকাল ৬টা থেকে ১২টা পর্যন্ত। অবশ্য বনবাংলো বুকিং থাকলে, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টো পর্যন্ত ভিতরে যাওয়া যায়। এন্ট্রি পারমিট সংগ্রহ করতে হবে পিথাবাটা চেকিং গেটে রেঞ্জ অফিসারের থেকে। কিংবা যোশীপুরে অ্যাসিস্ট্যান্ট কনজারভেট অফ ফরেস্ট অফিস থেকে।
সঙ্গে রাখবেন: সিমলিপাল অরণ্য ভ্রমণের সময় মশা নিরোধক ক্রিম, স্প্রে, পর্যাপ্ত পানীয়জল এবং শুকনো খাবার।
ছবি সৌজন্য: লেখক





