“Love does not consist in gazing at each other, but in looking outward together in the same direction.” —Antoine de Saint-Exupéry
অর্থাৎ, ‘ভালোবাসা একে অপরের দিকে তাকানোকে বোঝায় না, বরং একই দিকে একসঙ্গে তাকানোকে বোঝায়।’ —অঁতোয়ান দ্য স্যাঁত-এগজ্যুপেরি-র এই উক্তির গভীর তাৎপর্য আছে ভালোবাসার ক্ষেত্রে।
আসলে, কিছু কিছু ভালোবাসা বেড়ে ওঠে বুকের গভীরে, শিকড় নামায় সংগোপনে। শীতের মোলায়েম রোদ্দুর আলিঙ্গনের মতো, ভালোবাসায় সুফল মেলে আদরে-আহ্বানে। ভালোবাসা বিশুদ্ধ বাতাসের মতো, অক্সিজেন জোগায়। তাই, ভালোবাসায় কখনও সাফল্য আসে নিরামিষ বয়সে, আবার কখনও দাম্পত্যে, উষ্ণ-সহবাসে।
ভালোবাসা-র মধ্যে এমন এক শক্তি আছে, যার জেরে সুস্থ-স্বাভাবিক থাকে মানুষের শরীর এবং মন। আর তা হতে পারে মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা, প্রেমিকের প্রতি প্রেমিকার ভালোবাসা, বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা, সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভালোবাসা প্রভৃতি।
অনেকে হয়তো মনে করেন, ভালোবাসা হল এক ধরনের আবেগ, যা মনকে আবিষ্ট করে, ভালোলাগার মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখে এবং সেই ভালো লাগা মানুষ বার বার পেতে চায়। আর ভালোবাসার সম্পর্কের নির্দিষ্ট কোনও নাম নেই। এটির ব্যাপ্তি বিশাল। আপনি যে-নামের সঙ্গেই একে জুড়ে দেবেন, তাকেই সে পূর্ণতা দেবে। তবে সম্পর্কের এই জাদুকাঠি, সবচেয়ে বেশি কার্যকর নারী ও পুরুষের ভালোবাসা-র মধ্যে।
ভালোবাসার মূল কথা বোঝানো সম্ভব নয়। ছোটো ছোটো অনুভূতিমালা ঘিরেই তৈরি হয় ভালোবাসা। কারওর জন্য অপেক্ষা, কারওর হাত শক্ত করে ধরে থাকা, ছায়াসঙ্গীর মতো থাকতে পারা, এমনকী খাবার ভাগ করে খাওয়া— সবই তো আসলে ভালোবাসা।
ভালোলাগা থেকেই একটি সম্পর্কের শুরু, যার রেশ টেনে তৈরি হয় ভালোবাসা। এর চূড়ান্ত প্রাপ্তি ভালোবাসার মানুষটিকে বিয়ে করে একসঙ্গে সংসার পাতা। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে কখনওই পরিণয় ডোরে বাঁধতে নেই। তাহলে তা খুব একঘেয়ে দাম্পত্যের চেহারা নেয়।
কেউ কেউ মনে করেন, বিষয়টা মোটেই এমন নয়। বৈবাহিক সম্পর্ক মানুষকে অনেকটাই বদলে দেয়। এই নতুন সম্পর্কে আচরণে পরিবর্তন আসে। অনেক বদভ্যাসও দূর হয়। এমনকী মাদকাসক্তরাও আসক্তি-মুক্ত হতে পারে ভালোবাসার স্পর্শ পেয়ে। বিবাহের সম্পর্ক দায়িত্ববোধ তৈরি করে। তখন ভালোবাসা রূপান্তরিত হয় মায়ায়। আপনি আপনার ভবিষ্যৎকে ঠিক কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছেন, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে এই সম্পর্কের উপর। তাই, ভালোবাসায় থাকা উচিত গভীরতা আর একে অপরকে বুঝতে পারার ক্ষমতা।
শুধু কি তাই? নাকি ভালোবাসা আমাদের শরীর এবং মনকে সুস্থ-স্বাভাবিক রাখার উপযুক্ত মেডিসিন ? এই বিষয়ে সমস্ত কৌতূহলের অবসান ঘটিয়েছেন সিনিয়র ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবদীপ রায় চৌধুরী।
ভালোবাসা মানুষের জীবন পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমগুলির মধ্যে একটি। কিন্তু কাব্যে, সিনেমায়, নাটকে, সংগীতে ভালোবাসাকে যে ভাবেই তুলে ধরা হোক না কেন, আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, ভালোবাসার সম্পর্কের ফলে শারীরবৃত্তীয়, মানসিক এবং স্নায়ু-রাসায়নিক (Neurochemistry) পরিবর্তন সূচিত হয়। ভালোবাসা আবেগগত ভাবে ভারসাম্যপূর্ণ বোধ প্রদান করে এবং স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে। এটি হরমোন এবং মস্তিষ্কের সার্কিটগুলিকে সক্রিয় করে, যা জীবনকে আনন্দের অনুভূতিতে ভরিয়ে রাখে। মনুষ্য-জীবনে ভালোবাসার সম্পর্ক, জীবনের সমস্ত চাপের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বাফার হিসেবে কাজ করে। এটি নিরাপত্তার ভিত্তি প্রদান করে, যা অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আত্মবিশ্বাস জোগায়।
ভালোবাসার স্নায়ু-রসায়ন (Neurochemistry of Love)
যখন ভালোবাসা থাকে, তখন নিউরোকেমিক্যাল নিঃসরণ ঘটায়, যা মেজাজ এবং শারীরবৃত্তের উপর তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল অক্সিটোসিন, ডোপামিন, সেরোটোনিন, এন্ডোরফিন, ভ্যাসোপ্রেসিন, টেস্টোস্টেরন এবং ইস্ট্রোজেনের মতো রাসায়নিক পদার্থ — যা আকর্ষণ, বন্ধন, আনন্দ এবং সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা ও সংযোগের অনুভূতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষকরে অক্সিটোসিনকে ‘ভালোবাসার হরমোন বলা হয়। কারণ এটি শারীরিক স্পর্শ এবং মানসিক সংযোগের সময় নিঃসৃত হয় এবং সুখের অনুভূতি প্রদান করে।
ভালোবাসার মূল হরমোন
অক্সিটোসিন: ‘ভালোবাসার হরমোন’ বা ‘আলিঙ্গনকারী রাসায়নিক’ নামে পরিচিত। আলিঙ্গন, চুম্বন এবং যৌন মিলনের মতো শারীরিক সংস্পর্শের সময় অক্সিটোসিন নিঃসৃত হয় এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে।
ডোপামিন: ভালোবাসার প্রাথমিক পর্যায়ে নিঃসৃত হয় এই ‘সুখী হরমোন’, যা আনন্দ এবং উচ্ছ্বাসের অনুভূতি দেয়। সেরোটোনিন: মেজাজ নিয়ন্ত্রণ এবং সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এই হরমোন। ভালোবাসা যত গভীর হতে থাকে, এই হরমোনের মাত্রা ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এন্ডোরফিন: এই হরমোনকে বলা হয় ‘প্রাকৃতিক আফিম’। উচ্ছ্বাস এবং আনন্দের অনুভূতি প্রদান করে এই হরমোন এবং গভীর সুখানুভূতি প্রদান করে।
ভ্যাসোপ্রেসিন: অক্সিটোসিনের মতো, ভ্যাসোপ্রেসিন আত্মপ্রেম জাগ্রত করে এবং পজিটিভ থিংকিং-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
টেস্টোস্টেরন এবং ইস্ট্রোজেন: এই সেক্স হরমোনগুলি প্রাথমিক ভাবে ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। সেইসঙ্গে, তীব্র যৌন আকর্ষণ তৈরি করে।
আসলে, ভালোবাসার সম্পর্কে এই হরমোনগুলি একসঙ্গে কাজ করে। ভালোবাসার প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে সম্ভোগক্রিয়া পর্যন্ত সুখের অনুভূতি প্রদান করে। যেমন— ডোপামিনের তীব্রতা উত্তেজনা তৈরি করে, অক্সিটোসিন এবং ভ্যাসোপ্রেসিন গভীর সংযোগ তৈরি করে এবং এন্ডোরফিন আরাম ও আনন্দের অনুভূতি প্রদান করে— যা সবই ভালোবাসার সামগ্রিক অভিজ্ঞতায় অবদান রাখে।
সাইকোফিজিওলজিক্যাল গবেষণা অনুসারে, যারা ভালোবাসার সম্পর্কের মধ্যে থাকেন, তাদের রক্তচাপের মাত্রা স্বাভাবিক থাকে, স্ট্রেসের ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দনের পরিবর্তনশীলতা কম থাকে এবং দ্রুত কষ্ট লাঘব হয়। ভালোবাসার মনস্তাত্ত্বিক উপকারিতা
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে, ভালোবাসা মানসিক বুদ্ধিমত্তা, সহানুভূতিশীলতার ক্ষমতা এবং আত্ম-সচেতনতা তৈরি করে। যখন কোনও সম্পর্কের মধ্যে গভীরতা বাড়ে, তখন একজন ব্যক্তি আরও সহানুভূতিশীল হন। এই ধরনের সম্পর্ক ব্যক্তিগত দুর্বলতা দূর করে, যার ফলে ব্যক্তিত্বের উন্নতি ঘটে।
ভালোবাসার সম্পর্কে থাকলে জ্ঞান এবং সৃজনশীলতা উন্নত হয়। কারণ, মস্তিষ্ক যখন আবেগগত ভাবে নিরাপদ বোধ করে, তখন এটি উচ্চতর জ্ঞান ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে।
রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা
ভালোবাসা স্বাস্থ্যকে পুষ্ট করে, যা মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করে। প্রতিটি গবেষণার ফল প্রমাণ করেছে যে, ভালোবাসার সম্পর্কে থাকলে, হৃদরোগ কম হয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হয় এবং দীর্ঘায়ু হয়।
একাকীত্বের ফলে অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় কর্টিসল হরমোন এবং এই হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলে রক্তচাপ এবং বিষণ্ণতা যেমন বাড়ে, ঠিক তেমনই শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু ভালোবাসার সম্পর্কে থাকলে সমস্ত ‘গুড হরমোনস’ ক্ষরিত হবে এবং সুস্বাস্থ্য বজায় থাকবে।
ভালোবাসার ফলে যেহেতু আদর-যত্ন বেড়ে যায়, তাই উদ্বেগ কাটানো যায় সহজে। এর ফলে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে। ভালোবাসার অনুভূতি আনন্দে রাখে, তাই ভালো ঘুম হয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এর ফলে আরও নানারকম রোগ প্রতিরোধ করা যায় সহজে।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে, ভালোবাসা একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, যা জীবনের মান উন্নত করে। এটি স্নায়বিক চাপ কমায়, যার ফলে মানুষের স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জীবন উন্নত হয়।





