আজকের প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতার প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে সন্তান ছোটো থাকা অবস্থাতেই। কারণ, সে যে-অভ্যাস নিয়ে বেড়ে উঠবে, তার প্রতিফলন পড়বে তার ভবিষ্যৎ জীবনে। ফলে এই শিক্ষা যতটা সঠিক হয়, ততটাই মঙ্গলজনক। জীবনটা যে আগাগোড়াই মসৃণ হবে তা নয়, অনেক সংঘর্ষও করতে হবে জীবনপথে চলতে গিয়ে। আপনার সন্তানকে এই মানসিকতার সঙ্গে পরিচয় করান। তার গুণগুলো ছোটো থেকেই বিকশিত হতে দিন, যাতে এর প্রতিফলন সে তার আগামী দিনগুলোয় উপলব্ধি করতে পারে।
মনে রাখবেন, ভিজে মাটিকে যেমন ইচ্ছেমতো আকারে গড়ে নেওয়া যায়, শিশুদের মন হল তেমনই। তাই সঠিক শিক্ষা দিয়ে ওদের জীবনটা আপনি সুন্দর করে গড়ে দিতে পারেন। ভালো অভ্যাস ওদের সাহায্য করবে সুনাগরিক হিসাবে বেড়ে উঠতে। এতে ব্যক্তিগত সুবিধা যেমন হবে, তেমনই সমাজের প্রতি তার একটা দায়বদ্ধতাও তৈরি হবে।
আত্মনির্ভরতার বোধ শৈশব থেকেই গড়ে ওঠা প্রয়োজন। তাই পরিবারের মধ্যে এমন পরিবেশ বজায় রাখুন, যেখানে বাচ্চা নিরাপত্তা বোধের পাশাপাশি, আত্মনির্ভর হয়ে ওঠার ইন্ধন পায়। বাচ্চাদের যে-কোনও কাজে উৎসাহ দিন, কিছু শেখার সুযোগ করে দিন। এমন একটা পথ তাকে দেখান, যে-পথে চললে সে সাফল্য পাবে। এতে তার মধ্যে একটা আত্মসম্মান গড়ে উঠবে। নিজের কোন বিষয়ে তার দক্ষতা রয়েছে, সেটাও সে চিহ্নিত করতে পারবে।
আত্মনির্ভরতার প্রথম ধাপ হল, নিজের প্রতি বিশ্বাস অটুট রাখা। অর্থাৎ কোনও কাজ সে সফল ভাবে যাতে করতে পারে, তাকে সেই সাপোর্ট দেওয়া দরকার। ছোটো ছোটো সাফল্য তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস এনে দেবে। এর ফলে তার ব্যবহার ও ব্যক্তিত্বেও একটা বদল আসবে। তার মধ্যে দায়িত্বশীলতা তৈরি হবে। আত্মসম্মানবোধ তৈরি হবে।
তবে আত্মনির্ভরতার পথে যে শুধু সাফল্যই আসবে এমন নয়। তাকে এমন ভাবে মানসিক প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করুন, যাতে সফল না হলেও সে যেন ভেঙে না পড়ে। নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তের পরিণাম ভালো বা মন্দ যেটাই হোক— সেটাকে হ্যান্ডেল করতে শিখতে হবে। মুশকিল আসান করার মানসিকতা থাকতে হবে। হেরে যাওয়া বা হতাশ হওয়ার মতো পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়।
অনেক সময় দেখা যায়, বাচ্চারা অতরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়। পরাজয় সে সহজে মেনে নিতে পারে না। তার শরীরের উপর এর ফলে প্রবল চাপ পড়ে। এমনকী মানসিক ভাবেও সে বিপর্যস্ত হতে পারে। আপনার সন্তানকে শুরু থেকে জীবনের ভালো এবং মন্দ দুটি পরিণাম সম্পর্কেই সচেতন করুন। যাতে সে হেরে যাওয়াটাকে লজ্জাজনক বলে ভেবে নিয়ে, কোনও ভুল সিদ্ধান্ত না নেয়। আপনি তাকে এটুকু বিশ্বাস জোগান যে, ভালোমন্দ সবেতেই আপনি তার পাশে আছেন।
সাফল্য ও ব্যর্থতা
অনেক সময় ছোটোরা সহজে সাফল্য পেতে অসাধু উপায় অবলম্বন করে। বন্ধুদের সঙ্গে মারপিট করে নিজের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায়৷ তাই, অভিভাবক হিসাবে আপনি সজাগ দৃষ্টি রাখুন সন্তানের উপর। যাতে সে এরকম ভুল পদক্ষেপ না করে। তার আচার ব্যবহারের প্রতি সজাগ থাকুন। তার কাজকর্মের ভুল শুধরে দেওয়া আপনারই কর্তব্য।
আপনিই আপনার সন্তানের রোল মডেল। আপনি সন্তানের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করবেন, সেই ব্যবহারই আপনার কাছেও ফিরে আসবে। তাই অযথা ওদের সঙ্গে কথায় কথায় কলহে জড়াবেন না। আপনি আপনার মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে ওর মন জয় করতে পারবেন। হয়ে উঠতে পারবেন ওর বিশ্বস্ত জন। আপনার সাফল্যের পথ ওকে অনুসরণ করতে দিন। ধীরে ধীরে আপনাকে আইকন মনে করেই ও বেড়ে উঠবে। তবে খেয়াল রাখবেন, সন্তান যেন ওভার কনফিডেন্ট না হয়ে ওঠে। এতে কিন্তু ওর লাভের চেয়ে ক্ষতিই হবে বেশি।
অহংকার বর্জনীয়
আত্মবিশ্বাস অতি প্রয়োজনীয় একটি জিনিস। কিন্তু আপনি সন্তানের সাফল্যে এত বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে যাবেন না, যাতে সে অহংকারী হয়ে ওঠে। তার প্রশংসা করুন, কিন্তু অতিরিক্ত প্রশ্রয় দেবেন না। কারণ, আপনার দেওয়া অতিরিক্ত প্রশ্রয়ে, সন্তান হয়ে উঠতে পারে দাম্ভিক। সাফল্যে তারিফ যেমন করবেন, অসাফল্যে আবার বেশি বকাবকি করে ফেলবেন না। এতে তার কনফিডেন্স তলানিতে এসে ঠেকবে।
একটা ব্যালেন্স রাখুন আদর ও শাসনের। সন্তানকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিন। কিন্তু এমন যেন না হয় যে, সে আপনার কোনও পরামর্শকেই গুরুত্ব দিতে চাইবে না। তাকে পরিশ্রমে উৎসাহ দিন ও ব্যর্থ হলে পুনরায় চেষ্টা করার শিক্ষায় গড়ে তুলুন। তাকে বোঝান যে, পরিশ্রম করলেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। তাতে হার না মেনে, নতুন করে চেষ্টা করা উচিত।
দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুন
মা-বাবা হল সন্তানের সবচেয়ে বড়ো শক্তি। এটা আপনার সন্তানকে ছোটো থেকে অনুভব করতে দিন। পরিবারে শান্তি বজায় থাকলে, সন্তানের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কমবে এবং তার মানসিক শক্তি বজায় থাকবে। মা-বাবার আচার ব্যবহার বাচ্চারা অনুকরণ করে। আপনারা নিজেরাই তার কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুন, যাতে সে আপনাদের দেখানো পথ অনুসরণ করতে পারে। আপনাদের জীবনের নানা ঘটনা তার সঙ্গে শেয়ার করুন। যাতে সে এগুলিকে একেকটা উদাহরণ হিসাবে দেখে। কোন পরিস্থিতিতে পড়লে, কী কী করা উচিত, তার একটা ধারণা তৈরি করাও তার পক্ষে সহজ হবে।
অনেক মা-বাবাই শাসন করে বাচ্চাকে তাদের দেখানো পথে চলতে বাধ্য করেন। এতে প্রাথমিক ভাবে আপনি কিছুটা ফল পেলেও, একটা পর্যায়ে গিয়ে সন্তান বশ্যতা মেনে নিতে চাইবে না। এতে ফল হবে বিপরীত। ছোটো ছোটো ব্যাপারে মারধর করে সন্তানকে জেদি করে তুলবেন না, বরং তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন। আপনি তার জায়গায় থাকলে কী সিদ্ধান্ত নিতেন, এভাবে তাকে বোঝান।
অনেক সময় দেখা যায়, আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল বাচ্চারা, মা-বাবার ভুল আচরণের ফলে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। অতিরিক্ত চাপ পরিবারের তরফে যদি তার উপর থাকে, সে সিদ্ধান্ত নিতে অপারগ হয়। তার ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথেও বাধা তৈরি হয়। সারা জীবন তাকে এই ব্যবহারের মাশুল দিতে হতে পারে। তাই নিজের অতিরিক্ত ইচ্ছা সন্তানের উপর চাপিয়ে দেবেন না। কিছু কিছু সিদ্ধান্ত ওকে গ্রহণ করতে দিন ও আপনি ওকে সমর্থন করুন।
স্বাধীনতা
ছোটোরাও স্বাধীনতা চায়। ওদের নিয়মের বেড়াজালে বাঁধার আগে, মনে করুন আপনার শৈশবে আপনি স্বাধীনতার অভাবে কী কী খুইয়েছেন। ওদের সঙ্গে একই আচরণ করবেন না। একটা অনুশাসন অবশ্যই রাখুন, পারিবারিক শৃঙ্খলাবোধের সঙ্গে ওকে আগে অভ্যস্ত করুন। তারপর দেখবেন সে স্বাধীনতার অপব্যবহার করবে না। উচিত-অনুচিত এটা ছোটো থেকেই শিশুদের মধ্যে গড়ে দিতে হবে। তাহলেই কথায় কথায় আপনি তার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়বেন না। কোনটা করা উচিত আর কোনটা নয়, এটা সে বুঝে ফেলবে।
তার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হচ্ছে এটা মনে হলে, বাচ্চারা আরও জেদি হয়ে যায়। তাই তাকে তার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলির পরিণতির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল করুন। এর ফলে সে স্বাধীন ভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার আত্মবিশ্বাস পাবে।
জীবনে আমরা আমাদের ভুলগুলো থেকেই শিক্ষা নিই। তাই দু-একটা ভুল যদি সে করেই ফেলে, তাকে তার জন্য অতিরিক্ত শাস্তি দেবেন না। সে যাতে এটাকে একটা দৃষ্টান্ত হিসাবে মনে রাখে, সেটাই তাকে বুঝতে সাহায্য করুন।
দায়িত্ববোধ
ছোটো থেকেই সন্তানকে ছোটো ছোটো কাজের দায়িত্ব দিন। যেমন বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় গ্যাস বন্ধ করা, জানলা দরজা বন্ধ করা, তালা দেওয়া প্রভৃতি। এর ফলে তার দায়িত্ববোধ যেমন তৈরি হবে, তেমন সে নিজেকে সংসারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসাবেও ভাববে। প্রতিটি মানুষ গুরুত্ব পেতে পছন্দ করে। তাই তার ছোটো ছোটো সিদ্ধান্তকে আপনারা পূর্ণ সমর্থন করুন। এর ফলে সে সেই দায়িত্বের পরিণাম সম্পর্কেও সচেতন হবে।
পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে, আপনার সন্তানকে শেখান— সে কীভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে এবং কীভাবে রোগীর সেবা করবে। বৃদ্ধ বয়সে যাতে সে মা-বাবাকে দেখে, সেই মানসিকতা এর থেকে তৈরি হবে। ছোটো ভাইবোন থাকলে তাকে সামলানো বা স্কুলে পৌঁছে দেওয়া, হোমওয়ার্ক করতে সাহায্য করা ইত্যাদি কাজে নিয়োগ করুন। এতেও তার দায়িত্ববোধ তৈরি হবে, একই সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় হবে। বাড়িতে দাদু-ঠাকুমার দেখাশোনা করাও যে তার দায়িত্বের অঙ্গ, সেটাও তাকে বুঝতে দিন।





