মাইল তিনেক যাওয়ার পর একটা মোড় আসে। বড়ো রাস্তা ছেড়ে তারা ছোটো রাস্তায় পা বাড়ান। চমকাইতলায় ঢোকার ঠিক মুখেই একটি বেশ বড়ো মাঠ পড়ে। তার এক ধারে দু-তিনটি বিশাল বড়ো বড়ো গাছ ঘন ছায়া ফেলে কীসের অপেক্ষায় যেন দাঁড়িয়ে। নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল ছিলেন সুবিমল ও কুন্তলা। আচমকা চার-পাঁচজন কালো কালো মানুষ বুঝি মাটি ফুঁড়ে জেগে ওঠে।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিন-চারজন মিলে সুবিমলকে পিছমোড়া করে বেঁধে মুখে গামছা জাতীয় কিছু গুঁজে দেয়। বাকি দু’জন কুন্তলার মুখ চেপে ধরে হাত বিশেক দূরের গাছটির দিকে টানতে টানতে নিয়ে যায়।

কী যেন বলতে যাচ্ছিল কুন্তলা, সঙ্গে সঙ্গে একজন চাপাকণ্ঠে বলে উঠল, ‘চোপ শালি, টু শব্দ করবি তো এক্ষুণি হাসুয়া দিয়ে দু’জনের গলা নামিয়ে দেব।’ আর কোনও প্রতিবাদসুলভ শব্দ কানে আসে না সুবিমলের।

ধাক্কা-ধাক্কিতে চশমাটা হারালেও গাছের গোড়ায় হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থায় প্রবল জ্যোৎস্নায় সুবিমল পরিষ্কার দেখতে পান- এক-দুই-তিন-চার-পাঁচ, মনে হচ্ছে মোট ছ’জন বুনো নেকড়ে একসঙ্গে ছিঁড়ে খাচ্ছে মেদ-মাংসে ভরপুর কুন্তলার থলথল যৌবন। একটি অসহায় রাতপাখি ডানা ঝেড়ে ঝটপটিয়ে গাছের বুক থেকে উড়ে গেল জ্যোৎস্নামাখা উজাগর রাতের ধূমল মিহি কুয়াশায়। শেষ রাতের দিকে কালো মানুষগুলি দল বেঁধে মিলিয়ে গেল মাঠের ঝাপসায়। ওদের উল্লাস জানান দিচ্ছে আকণ্ঠ তৃপ্ত ওরা। যাওয়ার সময় সুবিমলের দিকে ফিরেও তাকাল না কেউ। সুবিমল ভাবলেন, কুন্তলা নিশ্চয়ই প্রাণে মারা যায়নি। স্বামীর দিকে কোনওমতে উঠে এল কুন্তলা। আবছা ভোরের আলোয় সুবিমল দেখলেন, ওর ঠোঁট রক্তাক্ত, গালে নীলচে রক্তছোপ, দাঁতের দাগ বসেছে কিনা বোঝা গেল না। গায়ে ব্লাউজ নেই। শাড়িটা কোনওমতে জড়িয়ে এগিয়ে এসেছে ও। দু চোখ দিয়ে জল ঝরছে অপমানে। কুন্তলা স্বামীর মুখের বাঁধন খুলে, হাতের বাঁধন খোলার চেষ্টা করতে লাগল। গোরু বাঁধার কাছিতে বেঁধেছে শক্ত করে। অনেক কষ্টে কোনওমতে বাঁধন খোলা হলে দেখা গেল দড়ি কেটে বসে গিয়েছিল, রক্ত জমে নীল। বহুক্ষণ হাতে সাড় পেলেন না তিনি। কুন্তলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘পশুগুলো আমাকে একদম শেষ করে দিল গো।’

সুবিমল ওকে বুকে টেনে নেন, হাত দিয়ে মাথায় আলতো করে আদর করতে থাকেন। মুখে কিছু বলেন না। অনেকক্ষণ কান্নাকাটির পর চুপ করে কুন্তলা। তারপর বলেন, “চলো বাড়ি যাই। সকালের আগে ঘর যেতি হবে।’

আস্তে আস্তে সুবিমল বলেন, ‘তার আগে একবার থানায় যেতে হবে কুন্ত। রাঘব জানার বিরুদ্ধে রেপ কেস লজ করতে হবে। এত বড়ো একটা অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করে যাবে?’

‘সে কী! উনি তো ওই দলে ছিলেননি,’ বিস্মিত কুন্তলা।

‘ছিলেন, অবশ্যই ছিলেন। ওর সঙ্গে আরও পাঁচজন ছিল— একথাই তুমি বলবে থানায়। বুঝতে পেরেছ? একটুও নড়চড় হয় না যেন।” অসম্ভব শীতল শোনায় সুবিমলের কন্ঠস্বর।

খানিকটা গুম মেরে বসে থেকে কুন্তলা বলে, “তা হলে লোক জানাজানি হবেনি? পাড়ায় আর আমি মুখ দেখাতি পারব?’ ‘আর অরুর কথাটা সকলকে বলে দিলে? মুখ দেখাতে পারবে তো?” একটু হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে যায় সুবিমলের ঠোট থেকে।

কুন্তলাকে বুঝি গোখরোয় কাটে। সে শিউরে ওঠে স্বামীর কথায়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত থরথর করে কাঁপতে থাকে তার। সে তার দিকে তাকায়, তারপর চোখ নামায়। সুবিমল নির্বিকার।

কুন্তলার মুখে কথা নেই।

খানিক পরে সুবিমল উঠে দাঁড়ান। বলেন, ‘সামনে এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ কুম্ভ। থানায় যেতে হবে, ৩৭৬ ধারায় একটা এফআইআর দায়ের করতে।’ বিড় বিড় করে ফের বলতে থাকেন, ‘থানা থেকে তোমাকে মেডিকেল করানোর জন্য বোধহয় সদর হাসপাতালে পাঠাবে, ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে, অনেক হ্যাপা। তারপর বিকেলে ঘটনাটাকে ইস্যু করে এলাকায় একটা মিছিল করতে হবে। মিডিয়াকে জানাতে হবে।

ভোটে দাঁড়াবার অপরাধে মাস্টারমশাইয়ের স্ত্রীর শ্লীলতাহানি— উফ্, পাবলিক যা খাবে না! সেন্টিমেন্ট কাকে বলে এবার দেখবি হতচ্ছাড়া রাঘব। একটা ভোটও তোর বাক্সে পড়বে না রে গাধা। গতকাল সন্ধ্যায় এসে গালাগাল করে খুব উপকার করেছিস আমার। বেচারা অমলদা। আমাকে চিনতে তোমাদের এখনও ঢের বাকি।’

হঠাৎ কুন্তলা দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে ওঠে, ‘ওগো আমার কী সর্বনাশ হল গো-ও-ও।’

চুক চুক করে সান্ত্বনাসূচক শব্দ করেন সুবিমল। আকাশ এখন ফর্সা হয়ে আসছে দ্রুত।

সুবিমলের হঠাৎ নজরে পড়ে মাঠ পার হয়ে দলের লোকজন এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে ওদের মুখ— আরে হ্যাঁ, ওই তো অরু, গদাই, রঘু, কানাই, সত্যেন। মনে হচ্ছে রাতে বাড়ি না ফেরায় ভোর হতেই আমাদের খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছে ওরা। ভালোই হল, ‘কাঁদো কুন্ত। আরও জোরে জোরে কাঁদো। পুলিশের কাছে হান্ড্রেড সিক্সটি ওয়ান করতে কাজে লাগবে!”

সুবিমল দেখতে পেলেন, ওদের মাথা বেয়ে কালচে কুয়াশা ফুঁড়ে শীতল নরম সূর্য ধীরে ধীরে পুব আকাশে উঠছে, আলোয় ক্রমশ হেসে উঠছে চমকাইতলার মাঠ। নতুন ভোরের গন্ধে হইহই করে গাছ ছেড়ে উড়ে গেল এক ঝাঁক পাখি। উড়তে উড়তে ওরা চলে যাচ্ছে দূরে। ওদের ডানায় সেই চিরায়ত আকাশ জয়ের উচ্ছ্বাস। ক্রমশ পরিবর্তনের কমলা আলোয় হারিয়ে যাচ্ছে ওরা।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...