একটা সময় ছিল যখন বিশ্বের সব দেশ কম সন্তান ধারণের জন্য প্রচার চালাত। ‘হাম দো হামারে দো’ কিংবা ‘হাম দো হামারে এক’-এর মতো স্লোগান উঠত কিন্তু আজ তার উলটোটা ঘটছে। এখন একে একে সব দেশই শিশুদের সংখ্যা হ্রাস এবং বয়স্কদের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং আগামী ৫০ বছরে এই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে। ভারতে, যেখানে ১৯৬০ সালের আগে প্রতিটি মহিলার ৫-৬টি সন্তান ছিল, আজ তা ১.৯, অর্থাৎ জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। চীনে, যেখানে এক সন্তান নীতির আগে, মহিলাদের ৫-৭টি সন্তান থাকত, আজ অনেক মহিলা সন্তানহীন এবং চীনের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে, আগামী ৫০ বছর পর অত্যন্ত বিপজ্জনক ফলাফল দৃশ্যমান।
নারীরা সন্তান ধারণের পরিবর্তে ভালো কেরিয়ার গড়তে আগ্রহী। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, সোমালিয়ার মতো যে-কোনও দেশেই হোক না কেন, নারীরা সন্তান ধারণের পরিবর্তে ভালো শিক্ষা এবং ভালো বাড়িতে থাকতে আগ্রহী হচ্ছে। অর্থনীতি এমন এক মোড় নিয়েছে যে, আজ বাড়ি আরও গুরুত্বপূর্ণ, বিলাসিতার জিনিসপত্র গুরুত্বপূর্ণ, গাড়ি গুরুত্বপূর্ণ, ছুটি গুরুত্বপূর্ণ, ভ্রমণ গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেকে মনে করেন সন্তান এসবের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এখন সন্তানের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। তাদের স্কুলের পড়াশোনা ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, বাচ্চাদের ন্যাপকিন ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, ক্রেশ পরিষেবা কোথাও নির্ভরযোগ্য নয়। সন্তান জন্মদানের ফলে দুই বছরের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় এবং মেয়েরা তাদের সমবয়সি অবিবাহিত মেয়েদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। যৌবনে এই বোঝা বহন করার পরিবর্তে, মহিলারা এখন অনেকে তাদের সময় কেরিয়ার এবং আনন্দ উপভোগের জন্য উৎসর্গ করতে চান। আসলে, পৃথিবীর সর্বত্র সমাজে নারীদের ইচ্ছাকৃত ভাবে সন্তান জন্মদানের যন্ত্র হিসেবে মনে করা হয়, যাতে তারা এই নিয়ে ব্যস্ত থাকে এবং পুরুষদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে না পারে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, ধর্ম সমাজকে এমন ভাবে গঠন করেছে যে, সন্তানের অজুহাতে নারীদের দাসত্বে আটকে রাখা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং সমতার অনুভূতি নারীদের স্বাধীনতা ও সম্মান দিয়েছে। নারীরা পুরুষদের সম্পত্তি নয়, নিজের সর্বসুখ বিসর্জন দিয়ে শুধু সন্তান ধারনের যন্ত্র নয়, সুখ প্রদানের জন্য পুতুল নয় অথবা সংসারে সবার সেবা করার জন্য নয় এবং খাবার রান্না করার জন্য দাসীও নয়— তারা পুরুষদের সমান।
এই কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নতুন ‘বিগ বিউটিফুল ল’ চালু করে প্রতিটি নবজাতকের জন্য ১০০০ ডলার দিতে শুরু করেছেন এবং প্রতিটি পরিবার এই অনুদানের সঙ্গে ৫০০ ডলার যোগ করতে পারে, যা শিশুটি ১৮ বছর বয়সের পর কর ছাড়াই পেতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জনসংখ্যা বাড়লে কার লাভ— ধর্মীয় নেতাদের, নাকি সরকারের? এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, উভয়ই তাদের জনগণের কাছ থেকে অর্থ চায়, একজন অনুদানের আকারে, অন্যজন করের আকারে। তারা নারীর সুখের কথা ভাবে না। আবার এও ভুলে যাবেন না যে, ধর্ম এবং সরকার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিবাহের মাধ্যমে নারীদের একে অপরের সঙ্গে আবদ্ধ করে আসছে, কিন্তু পুরুষদের সুখের জন্য পতিতালয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি প্রতিটি দেশেই বিদ্যমান। প্রতিটি ধর্মই পতিতাদের পাপের আঁতুড়ঘর হিসেবে বিবেচনা করলেও, পতিতার কাছে যদি কোনও পুরুষ সুখভোগের জন্য যায়, তাহলে সেক্ষেত্রে, পুরুষকে সমাজে নীচু নজরে দেখা হয় না।
আসলে, নারীরা তখনই স্বাধীনতা পাবে, যখন তাদের শুধু যৌনসুখের কিংবা সন্তান ধারণের যন্ত্র মনে করা হবে না। এক্ষেত্রে যে বিষয়টি সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, তা হল— নারীরা নিজেদের ইচ্ছে এবং মাতৃত্বের সুখলাভের জন্য যদি সন্তান ধারণ করে তাহলে ঠিক আছে, কিন্তু যদি স্বামী, সমাজ, ধর্ম কিংবা সরকারের স্বার্থে সন্তান ধারণ করতে হয়, তাহলেই তা নারীকে বশে রাখার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধর্মীয় নেতারা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য মহিলাদের বোকা এবং দাসী বানিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছে। তাই, এই থেকে মুক্তি চাই।





