তানিয়ার জন্ম কলকাতা শহরে। তিনি সাধারণ বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, কিন্তু ব্যতিক্রমী। কারণ, তিনি পরিশ্রমী, আত্মবিশ্বাসী এবং চ্যালেঞ্জিং পদক্ষেপ নিয়েছেন জীবনে। তাই, প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি, পেশাগত প্রশিক্ষণ তাঁর হাতে তুলে দিয়েছে সাফল্যের চাবিকাঠি। বিমানবন্দরে কিংবা বিমানে আগুন লেগে মানুষের জীবন সংশয় হলে, সেই জরুরি পরিস্থিতিতে হোসপাইপ, ফোম কিংবা আগুন নেভানোর অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে তিনি মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজ করেন।

কিন্তু উচ্চশিক্ষিতা এই তরুণী খুব সহজেই যে-কোনও ক্ষেত্রে চাকরি কিংবা ব্যাবসা-কে মাধ্যম করে জীবনকে অনেক আরাম-আয়াসের এবং নিরাপদ করতে পারতেন। অথচ তিনি সেই চেনা পথে হাঁটেননি। তিনি ছক ভেঙেছেন। বেছে নিয়েছেন চ্যালেঞ্জিং ফিল্ড-এর সার্ভিস। বিমানবন্দরে অগ্নি-নির্বাপণের সেই চ্যালেঞ্জিং কাজে যোগ দেওয়া এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সাফল্য অব্যাহত রেখে নজর কাড়া, সবকিছু অকপটে শেয়ার করছেন এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া-য় (এএআই) কর্মরতা, ভারতের প্রথম মহিলা এভিয়েশন ফায়ারফাইটার তানিয়া সান্যাল।

পেশাপ্রবেশ

ছোটোবেলা থেকেই আমি এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম, যা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। আমি এমন কিছু করতে চেয়েছিলাম, যা অপ্রচলিত এবং চ্যালেঞ্জিং! সত্যি বলতে কী, ‘এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া’ আমাকে এমন চ্যালেঞ্জিং কাজের সুযোগ দিয়েছে, যা আমার মনের ইচ্ছে পূরণ করেছে। এভিয়েশন ফায়ারফাইটার হতে পারাটা একটা বিরল অভিজ্ঞতা এবং গর্বের বিষয়। মাস্টার্সের পর আমি সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবং যখন পত্রিকায় এই কাজের বিজ্ঞাপনটি দেখেছিলাম, তখন আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, এই কাজটি পাওয়া সম্ভব। তাই আমি আবেদন করেছিলাম এবং আজ এখানে একজন সফল অগ্নিনির্বাপক হিসেবে সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছি।

আদর্শ

আমি সবসময় আমার মাতামহীকে অনুসরণ করেছি। আমি তাঁকে আমার আদর্শ গুরু মেনেছি ছোটো থেকেই। তাই, খুব স্বাভাবিক ভাবে তিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো অনুপ্রেরণা। তিনিও একজন ব্যতিক্রমী সরকারী কর্মী ছিলেন। তবে আমার দিদিমা ছাড়াও, স্বামী বিবেকানন্দ এবং শ্রদ্ধেয় এপিজে আব্দুল কালাম স্যারের উক্তিগুলো আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে।

শিক্ষা এবং আগ্রহ

ছোটোবেলা থেকেই আমার বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ ছিল। আমি উদ্ভিদবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে আমার প্রচলিত শিক্ষা শেষ করেছি। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল যে, ব্যতিক্রমী কিছু করার চেষ্টা করব। বর্তমানে আমার কাছে এমএসসি এবং এমবিএ উভয় ডিগ্রিই আছে।

সঠিক সিদ্ধান্ত

সমস্যা শুরু হয়েছিল মেধা তালিকা বের হওয়ার পর থেকে। সবাই বলতে থাকে যে, আমি এই ধরনের চাকরি করতে পারব না। আমার পরিবারের বিশ্বাস এবং আস্থা আমাকে সেই কঠিন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, যখন আমার মন দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। যাইহোক, অবশেষে এভিয়েশন ফায়ারফাইটার হয়ে আমি অবাক করেছি অনেককে এবং এখন আমার সেই কর্মসফরের কাহিনি তুলে ধরতে পেরে ভালো লাগছে। (হাসি)

 

অভিজ্ঞতা

সত্যি বলতে কী, পেশাগত এবং প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ বাদ দিয়ে, আমার এই কর্মসফরে আমি কোনও অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। আমাকে এই কাজে দেখে আমার পুরুষ সহকর্মীরা অবাক হলেও, তাদের আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছি। প্রশিক্ষণ আমার প্রাথমিক প্রশিক্ষণটি হয়েছিল নয়াদিল্লির অগ্নিনির্বাপণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। প্রশিক্ষণটি সম্পন্ন করতে প্রায় ৫ মাস সময় লেগেছিল। আমি ছিলাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের একমাত্র মেয়ে। এটি ছিল কঠিন এবং খুব ক্লান্তিকর, তবুও আমি এটি পুরোপুরি উপভোগ করেছি। আমি অগ্নিনির্বাপণ সম্পর্কে অনেক কিছু শিখেছি। আমার মনে হয়, আপনি যদি চ্যালেঞ্জিং কিছু করতে চান, তাহলে আপনাকে আপনার কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমিও তাই করেছি।

আত্মবিশ্বাস এবং দৃঢ় সংকল্প

প্রশিক্ষণের প্রথম দিনগুলি আমার কাছে পাহাড়ের মতো ছিল, যেখানে আমাকে আমার পথ তৈরি করতে হয়েছিল। আমি এর আগে কখনও এত গুরুতর শারীরিক অনুশীলন করিনি। এটি আমার জন্য কঠিন এবং খুব কঠিন ছিল। এর পরে, বিভিন্ন অনুশীলন এবং ক্লাসের সময়সূচী আমার জন্য আরও কঠিন ছিল। কিন্তু আমি সবসময় বিশ্বাস করতাম যে, ‘অসম্ভবকে সম্ভব করা’-র অর্থ হল ‘আমি পারব’ এই আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা। তাই আমি মনে করি যে, এমন কিছুই নেই, যা আমরা করতে পারি না। অবশ্য শুধু স্বপ্ন দেখলে চলবে না, লক্ষ্যে অবিচল থেকে পরিশ্রম, নিষ্ঠা এবং দৃঢ়সংকল্পকে মাধ্যম করতে হবে। সেইসঙ্গে, সবরকম প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার সাহস রাখতে হবে মনে।

অনুভূতি

যখন আমি দেখি আরও বেশি মেয়ে এই ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তখন আমি সত্যিই নিজেকে নিয়ে গর্ববোধ করি। এই চ্যালেঞ্জিং কাজে আমার প্রথম পদক্ষেপের অনুভূতিকে আমি ছড়িয়ে দিতে চাই, যাতে আরও বেশি নারী প্রার্থী এই পেশায় আগ্রহী হন। যখন আমি দেখি একদল পুরুষ অবাক চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে, তখন আমার মনে হয়, মেয়েরাও যে এইরকম চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে পারে, এটা আমি প্রমাণ করতে পেরেছি। আমার এই আনন্দের অনুভূতি ভাষায় সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারছি না। পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে আমার কর্তব্য পালন করে আমি এত জীবনকে স্পর্শ করেছি যে, এই অনুভূতি আমাকে চূড়ান্ত তৃপ্তি দেয়।

জোরালো বার্তা

সবসময় নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন। অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকবেই, কিন্তু সমস্ত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আপনাকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আমরা যে-কোনও ক্ষেত্রেই সমস্ত কষ্ট সহ্য করে উঁচুতে উঠতে পারি। আর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। আমি অন্যদের উৎসাহিত করতে চাই, বিশেষকরে তরুণীদের। আমি বিশ্বাস করি যে, মানসিক শক্তি রাখলে সাফল্য পাওয়া সহজ হয়ে যায়।

চিন্তাধারা

আমি দলবদ্ধ ভাবে মানুষের সেবা করে যেতে চাই। আমি এরজন্য যে-কোনও রকম ঝুঁকি নিতে সর্বদা প্রস্তুত। জরুরি পরিস্থিতিতে যাতে সমস্ত চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে পারি, সবসময় সেই প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রস্তুত করে রাখি নিজেকে। আমি মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজ করি এবং আমি মনে করি, এর চেয়ে বড়ো বিষয় আর কিছু হতে পারে না। আমি মনে করি, যখন আমরা একটি জীবন বাঁচাই, সেই জীবনের সঙ্গে একটি পরিবারও রক্ষা পায়। এই কারণে আমি এই কাজ বেছে নিয়েছি।

বাবামায়ের অবদান

আমার বাবা-মা সবসময় একটা বিষয়ে জোর দিয়ে বলেছেন, যা ইচ্ছা করো, কিন্তু মর্যাদার সঙ্গে কোরো। এমনকী আমার স্কুলের দিন থেকেই, আমাকে শেখানো হয়েছিল যে, আমি যে-কোনও পেশা বেছে নিতে পারি। তবে, যখন আমি এই বিশেষ চাকরিটি পেয়েছিলাম, তখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই মা-বাবা হিসাবে তাঁরা প্রথমে হতবাক এবং দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কারণ, আমার কাজটি ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু অবশেষে তাঁরা আমার আত্মবিশ্বাস দেখে খুব খুশিও হয়েছিলেন এবং আমাকে আরও মানসিক শক্তি জুগিয়েছিলেন। আমার এই পুরো কর্মসফরে আমার মা-বাবার সমর্থন আমাকে সবচেয়ে বেশি শক্তি জুগিয়েছে।

ভারসাম্য

একজন মহিলা হিসেবে বিমানবন্দরে অগ্নিনির্বাপণের কাজ করা, ব্যক্তিগত জীবনকে স্বাভাবিক রাখা, পরিবারের যত্ন নেওয়া, একসঙ্গে এতগুলো ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা খুব-ই চ্যালেঞ্জিং— কিন্তু আমি পেরেছি। কারণ, আমি আমার পরিবারের সমর্থন পেয়েছি, ভালোবাসা পেয়েছি। তাই, কাজের প্রতি আমার আগ্রহ আরও বেড়েছে এবং আমাকে আমার লক্ষ্যে অবিচল রেখেছে। তাছাড়া, আমি আমার সহকর্মীদের সঙ্গে সু-সম্পর্ক বজায় রেখে সংগঠিত থাকি। ব্যস্ততার মধ্যেও আমি আমার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করি। আমার পরিবারের জন্য, বিশেষকরে আমার বাবা-মা এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের চোখে ‘একজন আদর্শ নারী’ হতে পেরে আমি তৃপ্তি অনুভব করি। সেইসঙ্গে, আমার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক তরুণী এই কাজে আগ্রহী হয়েছেন জেনে আমি গর্ব অনুভব করি।

শরীরচর্চা

জিম-এ যাওয়ার থেকে আমি যোগব্যায়াম এবং ফ্রি-হ্যান্ড ব্যায়াম বেশি পছন্দ করি। আমি ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করি, যা আমাকে ফিট থাকতে সাহায্য করে।

প্রিয় খাবার

একজন বাঙালি নারী হিসেবে আমি বাঙালি খাবার খেতে পছন্দ করি, বিশেষকরে বাড়িতে তৈরি খাবার। আসলে, আমি এমন খাবার খেতে পছন্দ করি, যা স্বাস্থ্যকর এবং একইসঙ্গে আমার স্বাদ পূরণ করতে পারে।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...