এক

“না” বিয়ে করব না। করব না… করব না… করব না!’

তিন বোনই সমস্বরে বলেছে। একান্তেও বলেছে। বাবার সামনে, বাবা-মা দু’জনের সামনেও তিনজনেরই একই ডায়লগ। বছরের পর বছর ধরে ওই মতবাদে কোনও লয়, ক্ষয় নেই।

এই ২৯, ৩২ আর ৩৪-দের জীবনের ধ্রুবতারাটি কী তা বুঝে উঠতে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এমনকী রিকশাওয়ালা, সবজিওয়ালা, কাজের মাসিদেরও মাথা ঘামানোর অন্ত নেই। নয়ের বারো জগন্নাথ ঘোষ লেনের বিরাট গেটওয়ালা চারতলা বাড়ির দিকে চেয়ে এ-পাড়ার এক ভবঘুরেও বিড়বিড় করে খানেক। অরিত্র মৌলিক নিজের চোখেই তা দেখেছে চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে।

বিশুর চায়ের দোকানে আগে ব্যাপারটা নিয়ে মুখরোচক আলোচনা হতো। গল্পের গরু গাছে তুলে অনেক বান্দাই ঠ্যাঙের উপর ঠ্যাঙ তুলে বিড়ির বান্ডিল ফুরিয়ে ফেলত। কিন্তু তারাও মনে হয় আলোচনা চালাতে চালাতে ফেড-আপ হয়ে গেছে। আর কল্পনায় জোর নেই তাদের। বরঞ্চ তারা এখন জবকার্ড, দুয়ারে সরকার নিয়ে বেশি সময় ভাজে।

তো যে-কথা হচ্ছিল, অরিত্র মৌলিকের চোখে তিন বোন-ই সমান রূপসি। সে, এ পাড়ার গৃহশিক্ষক। গণিত আর ভৌতবিজ্ঞানের জন্য পাড়ার লোকেরা চোখ বুজে তাকেই পছন্দ করে। সেখানে কোনও স্কুলশিক্ষক বা কোচিং ক্লাসের কথা ভাবে না কেউ। অরিত্র-র সব ছাত্রছাত্রীই এই দুটো পেপারে মাধ্যমিকে ৯০-এর নীচে পায়নি। তো এই সিওর শট ছেড়ে কোন গার্জিয়ান অকূল পাথারে ভাসতে যাবে! যায়ওনি। ফলে এই নয়ের বারোর তিন মেয়েও তাদের ক্লাস টেনে অরিত্র স্যারের কাছে পড়েছে। তবে অরিত্র মৌলিকের ছাত্রছাত্রী বলতে ওই ক্লাস টেন। সে এর উপরের বা নীচের কোনও স্টুডেন্ট পড়ায় না।

২৯, মানে সবচেয়ে ছোটোটি আজ অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় অরিত্র স্যারকে দেখেছিল একবার চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে গ্যাজাতে। আজ একটু দিনে দিনে ফিরেছে বলে ওই দেখা। সে সন্ধ্যাবেলার ৩২-এর জন্মদিনের কেক-টেক কাটার পর কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল, ‘জানিস দিদি, আজ না পাড়ার মোড়ে অরিত্র স্যারকে দেখলাম। হেব্বি ড্রেস মেরেছে।”

৩২ বাবা-মায়ের মুখে কেক ফুঁসছিল। বলল, ‘তো!”

—না, অনেকদিন বাদে দেখলাম বলেই বললাম। জানিস তো, একদম একরকমই আছে চেহারা। একটুও পালটায়নি। ঝপ করে দেখলে রোনাল্ডো বা অক্ষয়কুমার মনে হবে।

৩২ এবার নিজের মুখে কেকের টুকরো নিয়েছে। সে বেশি কথা বলতেও পারবে না। কেকের স্নেহ আলটাকরা থেকে সরাতে সরাতে ওই ‘তো’-ই বলল।

—তো তো করিস না তো! ছোটো বলছিল এ কারণে যে, অরিত্র স্যার তোর মুখের উপর থেকে চোখ না সরিয়ে ফিজিক্সের থিওরি বোঝাত। আর মাঝে মাঝে ছোটোর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসত। ছোটো তখন ক্লাস সেভেন। বাবা ছোটোকে বসিয়ে রাখত পুলিশগিরি করার জন্য। কি বাবা ঠিক বলছি তো!

৩৪-এর এই অযাচিত উপস্থাপন বুদ্ধিমান বাবা লুফে নিয়ে বলল, ‘তা ঠিক আছে। আমাকে বলতেও তো পারে হারামজাদা অরিত্র। ও তো চাকরিও পায়নি। শুনেছি স্কুলসার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় দুবার বসেছিল, কিন্তু দুবারই ডাহা ফেল। আর ফেলু মাস্টারকে কে বিয়ে করবে! তো মেজো যদি রাজি থাকে আমি অরিত্রকে রাজি করিয়ে নিতে পারি। রাজি সে অবশ্যই হবে। আমার সুন্দরী মেজো মেয়ে। তায় আবার কলেজের অধ্যাপিকা। মেজোর মাইনে শুনলে ও ভিরমি খাবে। এরকম রাজকন্যা আর রাজত্ব কি হাতছাড়া করবে! করবে না।’

উপেন্দ্র সিংহরায় ছিলেন ঝানু আমলা। কত কত বেগকে তিনি আবেগে রূপান্তরিত করেছেন। এখানে বাড়িতে এসেই তিনি কুপোকাত। কিছুতেই কথার তোড়ে মেয়েদের জেদ ভাসিয়ে নিতে পারেননি। এখন পড়ে পাওয়া একটা সুযোগ কাজে লাগিয়ে মেয়েদের ইউনিটি ভাঙতে চাইলেন। হোক, মেজো মেয়েরই আগে হোক। মাঝখানের ইট সরিয়ে নিলে দুদিক থেকে বাঁধন আলগা হয়ে আসবে। তারপর এক তুড়িতেই উপর, নীচ দুটোর ভালো বিয়ে দেবেন। তার তিন মেয়েই যেমন সুন্দরী, তেমন উঁচু মাইনের চাকরি করে। আর এই মেজোটিকেও এক বছর বাদে ডিভোর্স করিয়ে এনে ভালো ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া তার কাছে কোনও হ্যাপা নয়। রিটায়ার করেও, তিনি রিটায়ার করেননি! এখন তিনি সরকারের একটি দপ্তরের মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে বেশ মোটা টাকা মাসান্তে ঘরে তোলেন৷

তো ৩২-এর মুখে বাঁধা একটা উত্তর ছিল। যা তিন বোনই বাবা-মার আবেদন-নিবেদনে বলে থাকে। তা হল বিয়ের অনুষ্ঠান চাই তো! তা তুমি আর একবার বিয়ে করো না কেন! আমরা তিন বোন একটু বাবার বিয়েটা দেখি। কিন্তু জন্মদিনের অনুষ্ঠান এসব বলে নষ্ট করতে চাইল না সে। বদলে সে বলল, ‘অরিত্র স্যার কিন্তু দিদির প্রতি দুর্বল ছিল। আমি দেখেছি দিদির দিকে তাকিয়ে কথা বলত না। এমনকী অংক বোঝানোর সময় মাটির দিকে তাকিয়ে থাকত।’

উপেন্দ্রবাবু ঘাবড়ে যান। হ্যাঁ, মনের ভিতর অশান্তি থাকলে চোখের দিকে চেয়ে কথা বলা যায় না। দুদে আমলা ছিলেন, তিনি জানেন এসব। সত্যি যদি অরিত্র মাস্টারের দুর্বলতা থাকে তাঁর বড়োটির উপর, মন্দ না। বড়োর বিয়ে দিয়ে পরেরটির জন্য ভাবাই রীতি। বড়ো রাজি হয়ে গেলে ছোটোরা তাকে অনুসরণ করবে নিশ্চিত।

বড়ো ৩৪, তার মেজো বোন ৩২কে বলল, “দিনদিন তোর ছ্যাবলামি বাড়ছে। এই ফিচলেমি নিয়ে তুই কী করে ছাত্রছাত্রী সামলাস! আমার অফিসে তো কেউই আমার দাঁত কোনওদিন দেখতে পায়নি তো ছোটো-বড়ো কথা। আমি কথার লোক যে নই, তা দারোয়ান থেকে আমার রিজিওন্যাল হেডও জানে। আর কথার বদলে কাজকে সময়ের আগে তুলে দিই বলে কর্তারা এবার আমাকে এশিয়ার চিহ্ন করে কানাডায় পাঠাচ্ছে দুবছরের জন্য। বছরে দেড় কোটির প্যাকেজ।”

—এই দিদি, এই খুশির খবরটা তুই এতক্ষণ দিসনি যে বড়ো! বদলে সেই থেকে মুখখানা হাঁড়ির মতো করে রেখেছিস!

২৯-এর কথার পক্ষ নিয়ে মা শৈলজা বললেন, ‘দারুণ খবর। আর দারুণ সুযোগও এসেছে বড়ো মেয়ের জন্য।” তিনি কর্তার দিকে ফিরে বললেন, ‘মেজো যখন বলছে আমাদের মাস্টার একটু বড়োর প্রতি দুর্বল, তখন তুমি তাকে ধরে আনো তো! রবিবার সকালে চায়ের নেমন্তন্ন দাও। বিয়ে করুক, আর না করুক— সে আমার বড়ো মেয়ের সঙ্গে দুবছর বিদেশে ঘুরে আসতে পারবে না! বিদেশ বিভুইতে একজন পুরুষ মানুষ সঙ্গে থাকা ভালো। আমরাও খানিকটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারব। এখানে কত টাকা সে টিউশনি করে পায়! সে টাকা না হয় তাকে হাতখরচ বলে দিয়ে দেবে।

( ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...