॥ দুই ॥
অরিত্র মৌলিক এই বাড়ির কালো গেট পুরোনো অভ্যাসে খুলে ভিতরে ঢুকে এল। এই বাড়ির গেট খোলার কারসাজি আছে দরজার পাশে সিমেন্টের থামের আড়ালে। সেখানে একটা সুইচ আছে। সুইচ টিপলে ভিতর থেকে লক চুম্বকের সাহায্য নিয়ে উপরে উঠে যায়, আর দরজা শব্দ করে খুলে যায়।
২৯ আগে থেকেই বসেছিল। সকাল সকাল চোখের প্রসাধন হয়েছে। স্মোকি আই দুর্দান্ত মানায়। পোশাক বলতে হট প্যান্ট আর টপ। চুল চূড়ো করা। সামনের ছোটো টেবিলের উপর এক মগ চা আর চপ্পল সহযোগে শ্রীমন্ত পা দু’খানি সে আন্দোলিত করছে কী এক ছন্দে। দরজা দিয়ে ঢুকতে গেলেই এই শ্রীমন্ত পায়ে পড়বে প্রথম নজর। পৌরাণিক লোকেরা বলবে ওই সেই লাল পদযুগল, যা দেখে ব্যাধেদের ভুল হয়েছিল। আর শ্রীকৃষ্ণ জঙ্গলে তিরবিদ্ধ হয়েছিলেন।
২৯ এই মহাভারত অন্তের গল্প না জানলেও বেশ জানে তার এই খোলা পায়ের এমন একটা সেক্স অ্যাপিল আছে যে, চোখে পড়লে নিজেকে সংবরণ করা মুশকিল। আজ ল্যাপটপে কাজ করতে করতে সে পরীক্ষা নেবে মাস্টারের। পায়ের বুড়ো আঙুলের নেল পালিশের দিকে তাকাল একবার। একেবারে টাটকা আছে। ঘন অপরাজিতার রং সেখানে। শ্বেতচন্দনের মতো ত্বকের উপর ওই নীলের তাকিয়ে থাকা ছেলেদের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
২৯ জানে তার মোম মসৃণ পা দু’খানি শরীরের তুলনায় বেশ খানিকটা লম্বা। আর হট প্যান্ট পরে আজ সে পা-কে যেন আরও খানিকটা লম্বা করে দিয়েছে। ২৯-এর থাই তেমন পেশীময় বা মাংসল নয়। দেবদারুর কাণ্ডের মতো সটান। পারফেক্টলি টোন্ড যাকে বলে।
অফিসে ফুল প্যান্টের আড়ালে এই সৌন্দর্য ঢাকা পড়ে যায়। তবুও। তবুও তার পায়ের আবেদনে কত চোখ যে মুহ্যমান থাকে! করিডোর দিয়ে নিজের চেম্বারে যেতে যেতে আড় চোখে অবশ্য নজর চালাতে ছাড়ে না। পাশের কিউবিকলস থেকে গোটা কয়েক যুবক চোখ যে তার পায়ের খোলা অংশটুকুতে চোখ ফেলার জন্য অপেক্ষা করে, তা সে জানে। সে জানে এটাই সেই বিখ্যাত ভিস্যুয়াল ফোর-প্লে। তার পা দুখানি থেকে একটা ফিসফিস হাতছানি ঝরে পড়ে যে! ছেলেগুলো কামনায় জ্বলে গেলে তার তৃপ্তি। আহ্!
মুখ থেকে একটা গাঢ় ভিজে শব্দ বেরিয়ে এসেছে বুঝি। ৩২ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পাশে বসেছিল। একই সোফায়। সে বোনের মুখ থেকে নির্গত এই আহ্ ধ্বনিতে চমকেছে। এ তো একেবারে রসসিক্ত স্বর! উঁকি মারে ৩২ বোনের ল্যাপটপে। সকাল সকাল বোন কোনও সফট পর্ণো নিয়ে সেঁটে নেই তো! কিন্তু তার নজরে পড়ে চার্ট তৈরি হচ্ছে। পাশের মোবাইলে বুঝি ডাটা আছে। সেই অনুযায়ী তৈরি হচ্ছে কমপারেটিভ রেখাচিত্র।
সেরকম কিছু খুঁজে না পেয়ে ৩২ বলল, ‘কী রে আহা,উহু করছিস কেন! বাবা বলেছে পাড়ার ছেলে হলেও পুরোনো মাস্টারমশাই তো, সে যেন মেয়েদের অভদ্র না ভাবে!”
২৯ শব্দটা করেই বুঝতে পেরেছিল দিদি প্রতিক্রিয়া দেবে। এই দিদি প্রতিক্রিয়া চাপতে পারে না। মাস্টারি করে যে! শুধু কলেজে মাস্টারি করে তার চলে না, বাড়িতেও সুযোগ পেলে মাস্টারি চালিয়ে দেয়।
দামি চায়ে চুমুক দিয়ে একটা আরামের শব্দ করে অরিত্র মৌলিক নিজেই চমকায়। এই শব্দ চায়ের দোকানে চলে, প্রাক্তন আমলা উপেন্দ্র সিংহরায়ের ড্রইংরুমে চলে না। এ-বাড়ির পুরোনো মাস্টার দ্রুত নিজেকে সামলে নিতে মুখ খোলে। খানিকটা দূরে কোনাকুনি বসা বাড়ির ছোটো মেয়ে, মানে ২৯-এর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘একটা অ্যাংকেট ইভিল আই পরতে পারো তুমি। যে-কোনও পায়ে। খুব মানাবে।’
উপেন্দ্র সিংহরায় সহ ঘরের ভিতরের সবার চোখই অরিত্র মৌলিকের মুখের উপর ফ্যালফ্যাল করে ড্রপ খায়। কিন্তু ২৯ চোখ নামিয়ে তার পা দুটিকে লুকোনোর চেষ্টায় রত। সামনের ছোটো টি-টেবলের উপর থেকে নামিয়ে এনেছে পা। এমন করে এদিক ওদিক করছে, পায়ে পায়ে ক্রস করছে যে-কারওর মনে হবেই হবে- -পা-দুখানি লুকোনোর জায়গা খুঁজছে।
পাঁচ-সাত বছর আগের অরিত্র মৌলিক আর এখনকার অরিত্র-র ভিতর বেশ অনেকটা ব্যবধান রচিত হয়ে গেছে যে— তা এই বাড়ির বাসিন্দারা টের পেল মুহূর্তে। ভিতরের দরজায় কৌতূহল নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিন মেয়ের মা। তার ভাবনা কী হয়, কী হয়। তার বড়ো মেয়েকে একলা বিদেশে যেতে না হলে তিনি স্বস্তি পান। দু-বছর যদি এই মাস্টার ওকে সঙ্গ দেয়, মানে বিদেশে অভিভাবকের দায়টা নিয়ে নেয় তো বেশ। তিনি জানেন, আজকাল টাকা দিলে সব হয়। কাগজে এই মর্মে একটা গভর্নর চাই বলে বিজ্ঞাপন দিলে লোকে হামলে পড়বে। কিন্তু সেসব তো অচেনা মানুষ। কে কোথা থেকে কী রূপে প্রকাশ পাবে তা কে বলতে পারে ! সেদিক থেকে পাড়ার মাস্টার হলে তাঁরা অনেক নিশ্চিন্ত হতে পারেন।
তিনি দেখলেন মাস্টার ঝপ করে একটা ফিচেল ছোঁড়ার মতো যেন কথা বলল। ক’বছর আগের সেই গম্ভীর, প্রাজ্ঞ মানুষটা যেন উধাও! তিনি বিস্মিত হলেন। মৃদুপায়ে ঘরের ভিতর ঢুকে এসে কর্তার পাশটিতে বসলেন।
অরিত্র মৌলিক সোজা ব্যাটে খেলতে এসেছে আজ। এইসব উপরতলার কারসাজিতে সে এখনও গৃহশিক্ষক আর সাইকেল আরোহী। অন্যদিকে এই বাড়িতে চারটি চারচাকা। একটা এ-বাড়ির মালিকের, অন্য তিনটি তিন মেয়ের। সে আজ মন মেলে প্রাণকে শান্তি দিতে এসেছে। প্রাক্তন আমলাকে পাত্তাই দেবে না। সুন্দরীদের পাত্তাই দেবে না। এই বাড়ির বৈভবকে পাত্তাই দেবে না। এতদিনে জেনেছে, মডেস্টি বা ভদ্রতা ধুয়ে জীবন কাটানো যায় না।
অরিত্র তার ছাত্রীর মুখের দিকে না তাকিয়ে দামি ক্রিম বিস্কুট চায়ের কাপে চুবিয়ে নিতে নিতে বলল, ‘লজ্জা কোরো না, তোমার পা দুটি নিজের মতো করে দুর্দান্ত। একটা নবীন ইউক্যালিপ্টাস কাণ্ডের মতো পেলব। পায়ের এমন দৈর্ঘ্য সাধারণ ভাবে কম হয়। তোমার শরীরের ভিতর পা দুটিই আলাদা করে চিহ্নিত হওয়ার উপযোগী। এরকম পা পাওয়া ভাগ্যের। তুমি নিজেই দ্যাখো— তোমার অন্য দুই বোনের পা অত লম্বা আর মোমবাতির মতো মাধুর্যমণ্ডিত নয়।
( ক্রমশ…)





