বাবা-মায়েরা প্রায়ই অভিযোগ করেন, ‘আমার সন্তান কখনও স্থির হয়ে বসে না, লাফিয়ে বেড়ায়।’ অথবা ‘আমার সন্তান কিছু না ভেবেই কাজ করে ফেলে৷’ আসল কথা হল, শিশুরা যতই আদরের হোক-না কেন, ওদের অতিরিক্ত চঞ্চলতার বিষয়টি বাবা-মায়ের জন্য ক্লান্তিকর হতে পারে। তবে সুসংবাদ হল এই যে, অতি চঞ্চলতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। প্রকৃতপক্ষে, অনেক অতিচঞ্চল শিশু সঠিক পরামর্শ পেলে বড়ো হয়ে সৃজনশীল, উদ্যমী এবং বিচক্ষণ মানুষে পরিণত হয়। মূল বিষয়টি হল— শিশুর মস্তিষ্ক, আচরণের ধরন এবং আবেগীয় জগৎকে বোঝা এবং তারপর এমন ভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত, যা সুশৃঙ্খল, প্রেরণাদায়ক এবং সহানুভূতিপূর্ণ।

অতি চঞ্চলতা বুঝবেন কীভাবে?

অতিরিক্ত চঞ্চলতা কোনও ‘দুষ্টুমি’ নয়। এটি আসলে উগ্রতা এবং ক্ষতিকারক কার্যকলাপ। বিকাশমূলক স্নায়ুবিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, অতিরিক্ত চঞ্চলতার ফলে শিশুদের মস্তিষ্কের সেই নেটওয়ার্কগুলির বিকাশে বিলম্ব ঘটে, যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ, পরিকল্পনা এবং কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এর মানে এই নয় যে, এই শিশুরা কম বুদ্ধিমান। বরং তাদের অনেকেরই গড় বুদ্ধিমত্তার চেয়ে বেশি বুদ্ধি থাকে। সেইসঙ্গে এদের, সৃজনশীলতা, মৌলিকতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বেশি থাকতে দেখা যায়। এর সহজ অর্থ হল— ওদের মস্তিষ্কের ‘ব্রেকিং সিস্টেম’ এখনও বিকশিত হচ্ছে। তাই, সমস্যার বিষয়টি বুঝতে পারলে, এই শিশুদের বিশেষ যত্ন নেওয়া উচিত। যখন বুঝতে পারবেন যে, আপনার সন্তান যা করছে তা ইচ্ছাকৃত দুষ্টুমি নয়, তখন তার উপর রাগ করে কিংবা শাস্তি না দিয়ে বরং চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সমস্যার সমাধান করা দরকার। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত চঞ্চল শিশুরা ইচ্ছাকৃত ভাবে সমস্যা তৈরি করে না। আসলে, ওদের মস্তিষ্কে এবং পুরো শরীরে এমন কিছু সমস্যা আছে, যার ফলে ওরা অতিরিক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে।

সমস্যা সমাধানের কার্যকরী কৌশল

  • প্রতিটি কাজের পর ২০-৩০ মিনিট বিরতি নিতে বলুন আপনার সন্তানকে
  • পড়ার সময় দাঁড়িয়ে থাকতে বলুন কিংবা হাঁটাচলা করতে দিন
  • দিনের শুরুটা হাঁটা, দৌড়ানো, সাইক্লিং কিংবা নাচকে মাধ্যম করতে পারে
  • ভারী কিছু কাজ করান। যেমন— মুদি দোকানের জিনিস বহন করা, গাছে জল দেওয়া, চেয়ার ঠেলে সরানো ইত্যাদি।

এক্ষেত্রে অনেক সময় বাবা-মায়েরা ভাবতে পারেন যে, সন্তানের নড়াচড়া বন্ধ করালেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু তা ভুল পদক্ষেপ হবে। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ মতো সমস্যার সমাধান করা উচিত। গবেষণায় দেখা গেছে যে, যখন কার্যকলাপ সংক্ষিপ্ত, সুনির্দিষ্ট এবং তাৎক্ষণিক হয়, তখন অতিসক্রিয় শিশুরাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। তাই এই ভাবে নির্দেশ দিতে পারেন—‘ভিতরে যাও, জুতো নির্দিষ্ট জায়গায় রাখো, হাত ধোও, তোমার ব্যাগ গুছিয়ে নাও, খাবার খাও এবং গল্প বলো।”

এইভাবে কাজ করান:

ধাপ : জুতো র‍্যাকে রাখো। (কাজটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো।

ধাপ : হাত ধোও।

অতিসক্রিয় শিশুরা একবারে একটি করে কাজ করে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সামলায়। দীর্ঘ বাক্য তাদের অ্যাক্টিভ ব্রেন-কে ভারাক্রান্ত করে তোলে। তাই, দীর্ঘ পাঠ কিংবা বড়ো হোমওয়ার্কের পরিবর্তে, সেগুলোকে ছোটো ছোটো এবং সহজে সম্পন্ন করা যায় এমন অংশে ভাগ করে করতে নির্দেশ দিন।

জার্নাল অফ অ্যাবনরমাল চাইল্ড সাইকোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, যখন কাজের নির্দেশগুলো দৃশ্যত ছোটো হয়, তখন অতিসক্রিয় শিশুদের আচরণগত সমস্যা কমে যায়।

ছোটো কাজ কী কী সাহায্য করে:

  • অনিশ্চয়তা কমায়
  • হঠকারী সিদ্ধান্ত সীমিত করে
  • নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে
  • শিশুর ‘অভ্যন্তরীণ ভাবনা’-কে শক্তিশালী করে।

দৈনিক সময়সূচি তৈরি করুন

  • সকালের রুটিন
  • স্কুলের সময়সূচি
  • খেলাধুলা
  • বাড়ির কাজ
  • স্ক্রিন টাইম
  • রাতের খাবার
  • ঘুমানোর সময়।

ছোটো বাচ্চাদের ছবি আঁকতে উৎসাহ জোগান এবং বড়োদের নাচ-গান, আবৃত্তি শেখাতে পারেন। আচরণগত মনোবিজ্ঞানীরা প্রায়ই আবেগপ্রবণ শিশুদের জন্য এই কৌশলটি ব্যবহার করেন।

উদাহরণ:

  • বাড়ির কাজের পর বিশ্রাম নিতে বলুন
  • খেলার পর সামান্য বিশ্রাম নিয়ে স্নান করতে বলুন
  • হোমওয়ার্ক-এর পর ১০ মিনিট খেলতে দিন
  • ব্যাগ গোছানোর পর খেতে বসতে বলুন।

মনে রাখুন

যখন বাবা-মা উচ্চস্বরে কথা বলেন, তখন অতিসক্রিয় শিশুরা আরও দ্রুত উত্তেজিত হয়ে ওঠে। উত্তেজক কণ্ঠস্বর শিশুদের আবেগপ্রবণতাকে বাড়িয়ে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, শান্তিপূর্ণ এবং স্বাভাবিক আবহ শিশুদের অতিরিক্ত চঞ্চলতা কমায়। অতএব—

  • ধীরে ধীরে কথা বলুন
  • ছোটো ছোটো বাক্য ব্যবহার করুন
  • আবেগপূর্ণ বক্তৃতা এড়িয়ে চলুন
  • একই কথা একবারই বলুন, ১০ বার নয়।

অতিসক্রিয় শিশুদের জন্য প্রশংসা অবশ্যই তাৎক্ষণিক, সুনির্দিষ্ট এবং সংক্ষিপ্ত হতে হবে। কারণ, সরাসরি প্রশংসা অতি-চঞ্চল শিশুকে অহংকারী করে তুলতে পারে, যার ফলে সে আরও অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে।

যেমন বলা যাবে না: খুব ভালো করেছ, আমি তোমার জন্য খুব গর্বিত!

বরং বলুন: তোমার কাজ আমার ভালো লেগেছে।

অথবা বলুন: এভাবেই চালিয়ে যাও।

সমস্যা সমাধানের জন্য সেরা আচরণ

  • অল্প সময়ের জন্য বসে থাকতে বলুন
  • ছোটো ছোটো কাজে ব্যস্ত রাখুন
  • সহজ ব্যবহার করুন ওদের সঙ্গে
  • মেডিটেশন করান
  • খাবার দিয়ে ভাগ করে খেতে বলুন
  • সাঁতার কাটতে বলুন
  • পড়ার জায়গাটি পরিপাটি রাখুন
  • উজ্জ্বল আলো এবং উচ্চ শব্দ সীমিত করুন
  • একসঙ্গে অনেক খেলনা দেবেন না
  • খেলনা আগ্নেয়াস্ত্র ওদের হাতে দেবেন না।

খেলার মাধ্যমে আবেগ নিয়ন্ত্রণ

নির্দিষ্ট কিছু খেলার মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক নিয়ন্ত্রণ উন্নত করা যেতে পারে। “গো/ডোন্ট-গো’, ‘স্টপ সিগন্যাল’ এবং ‘মোটর ‘ইনহিবিশন’ গেমস-কে মাধ্যম করুন ওদের অতি-চঞ্চলতা দূর করার জন্য। এছাড়া, ফ্রিজ ডান্স, স্ট্যাচু গেম, সাইমন সেজ এবং রেড লাইট-গ্রিন লাইট গেমস খুবই কার্যকরী অতি-চঞ্চলতা দূর করার ক্ষেত্রে। গুগল সার্চ করে এই খেলাগুলো শিখে নিতে পারবেন। আসলে, এই খেলাগুলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে শক্তিশালী করে, যা মস্তিষ্কের অতি-চঞ্চলতা নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া, ভালো কিছু করলে উপহার হিসাবে হাতে প্রথমে কিছু না দিয়ে, ‘স্টার’ সাইন দিন এবং পরে অন্য কিছু উপহার দিন। এভাবে বলুন ওদেরকে—

  • ৫ মিনিট বসে থাকলে = ১টি ‘স্টার’
  • হোমওয়ার্ক শেষ করলে = ২টি ‘স্টার’
  • সঠিক সময়ে হাত ধুলে = ৩টি ‘স্টার’
  • স্ক্রিন টাইম কমালে = ৪টি ‘স্টার’।

এভাবে ১০টি ‘স্টার’ পাওয়ার পর ছোটো কোনও উপহার অথবা ১০ মিনিট অতিরিক্ত খেলার সময় দেবেন বলুন।

নির্দেশিকা

  • স্কুলের আগে মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধ
  • খাওয়ার সময় টিভি কিংবা মুঠোফোন ব্যবহার নয়
  • ছোটো বাচ্চাদের জন্য সর্বোচ্চ ৩০ মিনিট বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম, তার বেশি নয়
  • দ্রুতগতির, ঝলমলে কনটেন্ট এড়িয়ে চলতে শেখান।

মনে রাখবেন, স্ক্রিনের ব্যবহার যত কম হবে, শিশুও তত শান্ত থাকবে। সেইসঙ্গে, ভালো ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখার চেষ্টা করান। অতি-চঞ্চল শিশুরা প্রায়ই কম ঘুমায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, অপর্যাপ্ত ঘুম উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে, মেজাজ হারিয়ে যায় এবং অমনোযোগী হয়ে ওঠে শিশুরা।

ঘুমের জন্য কিছু পরামর্শ

  • নির্দিষ্ট ঘুমের সময়
  • ঘুমানোর ১ ঘণ্টা আগে টিভি কিংবা মুঠোফোন ব্যবহার নয়
  • শোওয়ার ঘরে আলো কমিয়ে দিন।
  • একটি নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করুন
  • লাইট মিউজিক ব্যবহার করতে পারেন ঘুমের আগে।

ওদের মানসিক চাপ কমানোর ব্যবস্থা করুন

অতি-চঞ্চল শিশুরা প্রায়ই বেশি বকাঝকা খায়, বেশি প্রত্যাখ্যাত হয় এবং বেশি ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়। গবেষণা দেখায় যে, এই শিশুরা বড়ো হলে উদ্বেগ, লজ্জা এবং সামাজিক ভয়ের মাত্রা বেশি থাকে। তাই, মা-বাবাকে অবশ্যই শিশুর মানসিক আত্মসম্মান রক্ষা করতে হবে।

বলুন

  • তুমি হার্ড-ওয়ার্ক করছ, তাই সুফল পাবে
  • আমি জানি তুমি এটা শিখতে পারবে
  • আমি তোমার প্রচেষ্টায় খুশি।

কখন চিকিৎসকের সাহায্য নেবেন

যদি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলি দেখা যায়, তবে একজন মনোবিজ্ঞানীর সাহায্য নিন। যেমন—

  • তীব্র অস্থিরতা
  • আক্রমণাত্মক আবেগপ্রবণতা
  • বন্ধু তৈরিতে অসুবিধা
  • পড়াশোনায় অবনতি
  • সহপাঠীদের কাছ থেকে ক্রমাগত প্রত্যাখ্যান
  • অতিরিক্ত ছটফট করা
  • ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ
  • অতিরিক্ত জেদ বা বায়না।

পরিশেষে জেনে রাখুন, কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (সিবিটি) বা আচরণগত থেরাপি, অভিভাবক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং স্কুলের পরিবেশের পরিবর্তনমূলক ব্যবস্থাগুলোর মতো প্রমাণ-ভিত্তিক থেরাপিগুলো উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটায়।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...