৩২ আর ৩৪-এর মুখ হাঁ হয়ে গেছে। গোবেচারা মাস্টার তাদের পা-চর্চাও করেছে যে! ওই দু-বোনই নিজেদের পায়ের দিকে তাকাল। একজন শাড়ি আর অন্য জন ঢিলে পাতলুন পরা ছিল। সেসব আবরণ ভেদ করে যাচাই করতে চাইল, ছোটো বোনের থেকে তাদের পা কোথায় কম। বাইরের লোক মাস্টার ঘরে না থাকলে তারা নিশ্চিত শাড়ি আর পাতলুন তুলে যাচাই করত তাদের পা মসৃণ আর লম্বায় বোনের মতো, না কি কোথাও কমা।

২৯ মাস্টারের পরীক্ষা নিতে, মানে খানিক সিডিউস করতে হট প্যান্ট আর ক্রপটপ পরে ল্যাপটপ কোলে বসেছিল। তার চাওয়া ছিল, মাস্টারকে প্রলুব্ধ করে দেখা। নিজের মনের ভিতর একটা ধারণার সমর্থন আদায় করা। তার বিশ্বাস ছিল, মাস্টার চোখ তুলে কথা বলবে না। বাবা যা বলবে, তাই ঘাড় নাড়িয়ে মেনে নেবে। তবে এসবের মাঝে দিদিদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সে নিজেকে আজ স্থাপন করবে। মানে খানিক চাপের খেলা খেলতে চেয়েছে ২৯। কিন্তু চাপ দিতে গিয়ে সে নিজেই যে এখন চাপ খেয়ে বসল! বাবা-মা, দিদিদের সামনে সে যে বে-আব্রু হয়ে আছে। পা লুকোতে লুকোতে সোফার সাইডে সরে গেছে। সেখানে বাঁকা হয়ে বসেছে। ল্যাপটপ টেবিলের উপর নামাতে নিজের গ্রুপ টপের উপর চোখ পড়ল। বেশ বেয়ারা হয়ে বুকদুটি সিল্কের টপের নীচে মুখ মেলতে চাইছে। বাড়িতে এরকম ক্যাজুয়াল পোশাকই সে পরে। এখানে কে আর কার দিকে তাকায়! সবাই নিজের জন। আর মাস্টারকে সে বাইরের বিশেষ-টিশেষ ভাবেইনি। নাভিও বেরিয়ে আছে। ল্যাপটপটা আবার টেবিলের উপর থেকে নিয়ে কোলের উপরে নিল। আবার সোজা হয়ে বসল। এতে বুকের আড়াল হবে।

অরিত্র বলল, ‘এভিল আইকে তুমি কোনও কুসংস্কার হিসেবে দেখো না। ওটাকে অর্নামেন্ট হিসেবে নাও। একটু দামি একটা পরলে তখন দেখবে, সোনার হাতে সোনার কাঁকন, কে কার অলংকার!”

আমলা তিনি। মামলা অন্যদিকে গড়িয়ে যাচ্ছে দেখে ফেলেছেন। রাশ ধরলেন। আচ্ছা মাস্টারমশাই, ‘এবছর আপনার কতজন স্টুডেন্ট নব্বইয়ের ঘরে স্কোর করেছে?’

চা-বিস্কুট শেষ করে ফেলেছে। এখন অনেকটা ঝাড়া হাত-পা। মন আর অন্যদিকে দেওয়ার নেই। অরিত্র বলল, “তা মেসোমশাই বলতে পারেন, হান্ড্রেড পার্সেন্ট সাকসেস। ওই ৯৪ থেকে ৯৮ প্রায় সবাই।”

দুম করে কেউ যেন গালে একটা চড় মেরেছে। মিঃ সিংহরায় ‘স্যার’ শুনতে অভ্যস্ত গত ৩৭ বছর ধরে। মেসোমশাই-এর মতো কোনও গ্রাম্য নুইস্যান্স তার দিকে এসে ধাবিত হতে পারে, ভাবেনইনি। ভিতরে একটা প্রবল হোঁচট খেলেন। আজ যেন, দিন অন্য মনে হচ্ছে। সাধারণত আলোচনার টেবিলে, সে তিনি যতই মন্ত্রী-সান্ত্রী হন না কেন, সাইড টক ফেলতেই দেন না। নিজে এমন ছন্দে আর দক্ষতায় কথা ফেলেন যে, শ্রোতারা তাঁর কথায় মান্যতা দিতে বাধ্য হয়। এই সাইকোলজিক্যাল খেলা সেই আমলা হয়ে ওঠার প্রাথমিক ট্রেনিং-এর সময় রপ্ত করেছেন। তারপর দিন দিন তাতে শান পড়েছে। তিনি ধারালো হয়েছেন।

অরিত্র মিচকি একটা হাসি নিজের মুখের উপরে ধরে রেখেছে। সুন্দরীদের ভিতর পা নিয়ে রেষারেষি ঢুকিয়ে দিয়ে এবার জাঁদরেল আমলাকে নিয়ে খেলার ইচ্ছে তার। সুযোগ যখন একটা এসেছে, কাজে লাগাতে হবে। এই আমলা নিজের প্রভাব খাটিয়ে মেয়েদের রেজাল্ট থেকে চাকরি— সব করে দিয়েছেন। অথচ অরিত্রকে একটিবার হেল্প করেননি। স্কুল সার্ভিসে রিটেন টেস্টে পাস করার পর প্রথমবার এসেছিল অরিত্র। তখন সে ছোটোটিকে পড়ায়। বলেছিল, ভাইভার সময় একটু যদি বলে টলে দেন যাতে অরিত্রর স্কুল মাস্টারের চাকরিটা হয়ে যায়। কিন্তু উপেন্দ্র সিংহরায় পাত্তাই দেননি।

অরিত্র মুখের উপর দু’গালের দুই টোলের গভীরতা কমিয়ে বাড়িয়ে হাসি ছাড়ছিল তখন, যখন আমলা সাহেব খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আছেন। অরিত্রই বলল, “আমার স্টুডেন্টরা নিজেরা বিশ্বাস করে তারা ওই ১০০-ই পাবে। আমি ওদের ভিতর এই বিশ্বাসটা জুটিয়ে দিই। তারপর এক-আধ মার্ক কম পেলে আর কী!”

উপেন্দ্র সিংহরায় আসল কথা ফেলতে বিশেষ দেরি করেন না। কিন্তু শুরুতেই হোঁচট খাওয়ায় নিজের ছন্দ যেন আসেনি। সেই ছন্দ পেতে একটু এতর-বেতর বকতে হবে ভাবলেন। বললেন, ‘আচ্ছা মাস্টারমশাই, আমি একটা বিষয় ভাবি, এই যে প্রতিবছর আপনার ছাত্রছাত্রীরা সবাই দারুণ স্কোর করে। একজনও ৯০-এর নীচে পায় না, এর কোনও তুক আছে নাকি! সাউথপয়েন্টে আমার মেয়েদের ব্যাচের অন্যরা কেউই ওদের থেকে ম্যাথ আর ফিজিক্স-এ বেশি নম্বর পায়নি। কিন্তু অন্য সাবজেক্টে আমার মেয়েরা কমা। এর পিছনে কোনও ম্যাজিক আছে?’

অরিত্রর হাতের উপর উঠে এসেছে সুযোগ। সে বলল, “এই যে আপনার তিন মেয়েই ভালো জায়গায় চাকরি পেয়েছে, কেউ এক বছরও পাশ করার পর বসে থাকেনি, তার কি কোনও কারণ আছে! অথচ দেখুন আমি এমএসসি করার পর দশ বছর ধরে শুধু টিউশনি করে যাচ্ছি, চাকরি আমার কাছ থেকে অনেক দূরে গিয়ে বসে আছে!’

নেহাৎ বাড়িতে তিনি ডেকে এনেছেন, নাহলে এক ধমকে তিনি ভূত ভাগিয়ে দিতেন। জাঁদরেল আমলা উপেন্দ্র সিংহরায় এসময় খানিক বেড়ালপনায় ঢুকে গেলেন। উলটে বেকার অরিত্র মৌলিককে মনে হচ্ছে যেন বাঘ। তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকালেন।

—দেখুন মেসোমশাই!

আবার! প্রাক্তন আমলা নিজের থাইয়ের উপর আক্রোশ বিছিয়ে খামছে ধরলেন।

—মেসোমশাই, জানবেন, আপনার মেয়েরা যেমন আপনার ইনফ্লুয়েন্সে স্মুথলি চাকরি-বাকরি নিয়ে সেটলড, তেমনই আমিও আমার ছাত্রছাত্রীদের আমার সাবজেক্টের পরীক্ষা উতরানোটা স্মুথ করে দিতে আমার ইনফ্লুয়েন্স খাটাই। আমার ইউনিভার্সিটির ব্যাচমেট, বলতে পারেন আমার সেরা বন্ধু, একটা নামী স্কুলে পড়ায়। সে-ই ওই দুটি সাবজেক্টের বোর্ডের কোশ্চেন সেটার।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...