আমলা উপেন্দ্রবাবু এবার লাফ দিয়ে পড়লেন। বাগে পেয়েছেন ব্যাটাকে। এবার গলা টিপে ধরবেন। আর অরিত্রকে দিয়ে যা খুশি করিয়ে নেবেন। বড়ো মেয়ের পাহারাদার হিসেবে বাধ্য করবেন বিদেশ যেতে। গলায় বিস্ময় আর গাম্ভীর্য একই সঙ্গে খেলতে দিয়ে উপেন্দ্রবাবু বললেন, ‘আরে! এ তো বিরাট ক্রাইম! কোশ্চেন লিকের স্ক্যামে তো আপনার জেলযাত্রা নিশ্চিত মাস্টারমশাই!”
—ধুর মেসোমশাই! অত কাঁচা মাথা হয় না সায়েন্সে ফার্স্ট-ক্লাস পাওয়া স্টুডেন্টদের। আমার বন্ধু আমাকে কোশ্চেন তুলে দেয় না। বছরের শুরুতে কুড়িটা করে প্রশ্ন সে আমাকে দেয়। যার ভিতর দশটা থাকবেই পরীক্ষায়। ওই কুড়িটা প্রবলেম আমি আমার স্টুডেন্টদের হাতে ধরিয়ে, বারবার অনুশীলন করিয়ে, নিজেদের ভিতর পরীক্ষা নিয়ে এমন রপ্ত করিয়ে দিই যে, দশটা সিন কোশ্চেন টপাটপ ওরা উগরে দিয়ে আসে। কেউই অভিযোগ আমার দিকে বা আমার বন্ধুর দিকে তুলতেই পারবে না।
চুপসে গেলেন গৃহকর্তা। এ সময় কর্ত্রী হাল ধরলেন। “আমি বলছিলাম কী বাবা, আমার বড়ো মেয়েকে বিদেশ যেতে হবে বছর দুয়েকের জন্য। তা তুমি তো আমাদের ঘরের ছেলের মতো, তুমি যদি সঙ্গে থাকো আমরা একটু ভরসা পাই। তুমি আমার মেয়ের শিক্ষকও বটে৷ তোমার কথা মেনে চলবে। নাহলে বিদেশে বিভুঁইয়ে…
অরিত্র ব্যাপারটা শুনেই এসেছে। চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে দিতে অনেকদিন থেকেই এই বাড়ির উপর নজর রাখে। কোনও রাগ, ঘেন্না, ভালোবাসায় নয়— কেমন একটা অভ্যাসে এসব। আর যাকে দিয়ে উপেনবাবু অরিত্রকে চায়ের নেমন্তন্ন দিয়েছেন, সেই বাড়ির চাকর একাদশী হালদারকে একটা চা আর ফিলটার উইলস খাইয়ে হাত করে ফেলেছিল অরিত্র। সে-ই খবর লিক করেছিল।
প্রথমে ভয়ানক রেগে গিয়েছিল। অরিত্র মৌলিক কি একাদশী হালদারের মতো চাকর যে, বাড়ির মেয়েকে পাহারা দিতে কানাডায় যাবে! ওই দু-বছরের পরে তো সে আবার বেকার।। কিন্তু ততদিনে তার এই সামান্য টিউশনি করার জায়গাটাও যে নষ্ট হয়ে যাবে! মাথা গরম করে না বলতে গিয়েও থেমে গিয়েছিল অরিত্র। বদলে মনে মনে একটা নতুন প্ল্যান ভেজেছে সে। ওই বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ সে নেবে। সুযোগ বারবার আসে না।
অরিত্র খেলাটা নিল। ‘হ্যাঁ মাসিমা, ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন তো!”
মিসেস সিংহরায় অরিত্রর কথার ভিতর একটা সম্মতির আভাস পেয়ে গল্পের পানের ডাবর মেলে নিয়ে বসলেন। ‘জানোই তো বাবা, আমার বড়োটি বিরাট একখানা চাকরি করে। তা সেই চাকরি আরও বড়ো হয়ে এখন বিলেতে গিয়ে ডালপালা মেলবে। অনেক অনেক টাকা। দু’বছরে গোটা জীবনের রোজগার। কিন্তু বিদেশ বিভুঁইতে একা মেয়েমানুষ থাকবে, কেমন বেমানান না! তুমিই বলো।”
—তা মেয়ের বিয়ে দিয়ে একেবারে মেয়ে জামাইকে বিলেতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন না কেন!
—তুমি একেবারে আমার মনের কথা বলেছ। আমি তো কত্তাকে সে কথাই কচ্ছি। মানে বলছি। কত্তাও রাজি, কিন্তু রাজি হচ্ছে না আমার মেয়ে।
অরিত্র জানে এ-বাড়ির মেয়েরা বিয়ে করবে না বলে পণ ধরে বসে আছে। কিন্তু সে তো আজ এখানে তৈরি হয়ে এসেছে। সে আজ কৃষ্ণ ও শকুনি— দুটি ভূমিকাতেই প্লে করবে। অরিত্র বলল, “তাহলে নিশ্চিত আপনার বড়ো মেয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করে। আপনাকে বলতে পারছে না বা চক্ষুশূল হতে পারে ভেবে গোপন করে রেখেছে। আপনার মেয়ে তো জানে তার বাবা সরকারের প্রশাসনের মাথা। নিজের যোগাযোগ খাটিয়ে প্রেমিক ছেলেটার জীবন হেল করে দিতে পারে।
৩৪ অরিত্রর কাছাকাছি সোফায় বসেছিল। সে তো রি-অ্যাক্ট করবেই। তার স্বরে বেশ উচ্চতা!
‘আরে স্যার, আপনি কীসব বলছেন!”
মিঃ সিংহরায় কোনও কথাকেই হাওয়ায় ভেসে যেতে দেন না। তাঁর এতকালের আমলাগিরি করার অভিজ্ঞতায় জানেন— যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন। মানে মাস্টারের কথাটা যে হেলাফেলার, তা নাও হতে পারে। তার বড়ো মেয়ে খুব সুন্দরী। তার দিকে কোনও ছেলে যে ঝোঁকেনি কলেজ, ইউনিভার্সিটির কালে তা কে বলতে পারে! তিনি অরিত্রর ডাকা মেসোমশাই শব্দের গ্লানি আর গায়ে না মেখে বাকি কথাগুলো নিয়ে মনের ভিতর একটা চর্চা চালালেন। আর এই ভাবনার স্পিরিট নষ্ট হতে না দিয়ে ব্যাটন নিজের হাতে নিয়ে নিলেন।
—বলছি কী মাস্টারমশাই, আপনি হয়তো ঠিক বলছেন।
বড়ো মেয়ের রি-অ্যাকশন চাইছেন আরও একটু। মাস্টারের সামনে নিজেকে সে মেলতেও পারে, ভাবলেন। ভাবলেন, তেমন কড়া বাধা মেয়ের দিক থেকে এসময় না আসাই স্বাভাবিক। বাইরের লোক মাস্টার। তার সামনে অভব্যতা করবে না। এই সুযোগে খানিক যুক্তিজাল বিছিয়ে যদি কাত করা যায়। তিনি বললেন, ‘বলছি কী, আপনার কাছে তো কত কঠিন অংক কত দ্রুত সমাধান সহ ধরা দেয়। এই অংকটার উত্তরটা যদি মিলিয়ে দিতে পারেন, আমার মনে হবে আপনি গ্রেট!”
—কীরকম, কীরকম!
সিংহরায়মশাই বললেন, ‘আপনার কথার যুক্তি আছে। আমার অমন সুন্দরী মেয়ে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে, কী অফিসে, পার্টিতে গিয়ে প্রেমে পড়েনি— তা হতেই পারে না। নিশ্চিত প্রেম হয়েছে।’
(ক্রমশ…)





