সকাল পাঁচটায় ঘুম ভেঙে গেল। আকাশের অবস্থা কেমন? আজ কি পারব না শুরু করতে? মেঘমুক্ত আকাশে একফালি চাঁদ আর বরফে মোড়া শৃঙ্গ দেখে মন ভরে গেল। আনন্দ আর উত্তেজনায় সবাইকে ডেকে তুললাম৷ একে একে সবাই হাজির, চোখ-মুখে আনন্দের আভাস। বর্তমানে ঘুটু থেকে রী পর্যন্ত গাড়িতে যাওয়া যায়। গতকাল দুটো গাড়ির চালকের সঙ্গে কথা বলে রেখেছিলাম৷ সকাল সাড়ে আটটায় ঘুটুকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জয় কেদারনাথ ধ্বনি দিতে দিতে। ভাঙাচোরা রাস্তার উপর দিয়ে দুলতে দুলতে পৌঁছে গেলাম ১০ কিমি দূরের রী গ্রামে।

এখান থেকেই শুরু হবে আমাদের পদচারণা, গন্তব্য ১০ কিমি দূরের গাঙ্গী। গাইডের তত্ত্বাবধানে মালবাহকেরা নিজেদের বোঝা পিঠে তুলে নিল। শুরুতেই গাইডের নির্দেশ— আপ লোগ সাথ সাথ রহিয়েগা, আগে পিছে মৎ রহো অউর আহিস্তা-আহিস্তা চলতা রহো। গাইডকে অনুরোধ করলাম, পিছনে থেকে যাওয়া সবাইকে নিয়ে আসতে।

“রী”র নিগমের বাংলোর কাছাকাছি থেকে সকাল ১০টায় শুরু হল যাত্রা। সামান্য চড়াই-উতরাই ভেঙে নেমে এলাম একটা ঝোরার মধ্যে। ঝোরা অতিক্রম করে শুরু হল চড়াই। বুকের পাঁজর হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ভাবছি, আর কতক্ষণ ভাঙতে হবে এই চড়াই? ডান দিকে ভিলাঙ্গানা অনেক নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে। শৃঙ্গ থেকে নেমে আসা অভিক্ষিপ্তাংশ (spur) বিনুনির মতো পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছে। ভিলাঙ্গানা হারিয়ে গেছে ওই বিনুনির মধ্যে। প্রকৃতি সেজে রয়েছে অপরূপ সাজে। ক্যামেরাবন্দি করার ইচ্ছেটুকুও অবশিষ্ট নেই। প্রাণান্তকর চড়াই ভেঙে ৫ কিমি দূরের নালহান গ্রামে পৌঁছালাম দুপুর দেড়টা নাগাদ। কুলিরা জানাল, আজকের মতো চড়াই শেষ। স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল। প্রথম দিন কষ্ট সামলে নিলে, শরীর অভ্যস্ত হয়ে যায়।

ছোট্ট গ্রাম নালহান। গ্রামের মানুষের জীবিকা মূলত কৃষি। বাকি সময় কুলির কাজ করে। ধাপ (step cultivation) চাষ পদ্ধতিতে ধান, আলু, মটর চাষ করে। জমিগুলোতে সবুজের আভাস কম, সবে বীজ বুনেছে, বর্ষার জলের অপেক্ষা।

—নমস্তে বাবুজি, মিঠাই দিজিয়ে। একদল শিশু, কিশোর ঘিরে ধরল। লাল লাল ফাটা ফাটা গালে হাসি মুখের ছোটো দেহে অভাবের চিহ্ন স্পষ্ট। লজেন্স দিয়ে বিদায় জানালাম।

দু কিমি পরেই ছোট্ট গ্রাম লালা অতিক্রম করে এগিয়ে চললাম গাঙ্গীর উদ্দেশে। ছোটো ছোটো চড়াই-উতরাই ভেঙে এগিয়ে চলেছি ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। কলকাতার দূষিত বাতাস থেকে সাময়িক মুক্তি। রোডোডেনড্রন, বার্চ, জুনিপার, উইলো, বুনো গোলাপ – নানা নাম না জানা গাছে ঢাকা পথ। শুকনো পাতার মধ্যে নিজ পদযুগলের অদ্ভুত সুর মূর্ছনা। বাতাসে ফুলের সুবাস, নাম না জানা পাখির কলতান কষ্টের লাঘব করছে।

পরিশ্রান্ত শরীর টানতে টানতে এগিয়ে চলেছি। আজ একটা প্রাণীকে দেখলাম গিরগিটির মতো, কিন্তু আকারে বড়ো, নাম বলল হিমালয়ান ক্যালোটিস ভারসিকালার। অবশেষে গাঙ্গী গ্রামের দেখা পেলাম। বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম, কারুকাজ করা দরজা-জানলা। গ্রামের শেষ প্রান্তে সবুজ পাহাড়ের কোলে অবস্থিত বাংলোতে নিলাম রাতের আশ্রয়। রাঁধুনি কীর্তমের হাতের অপূর্ব রান্না খেয়ে ঢুকে গেলাম গরম লেপের তলায়।

গুড মর্নিং, চায়ে লিজিয়ে— কীর্তনের অভিবাদন আর চমৎকার চায়ের স্বাদে শুরু হল সকাল। উত্তর-পূর্ব কোণে তুষারমৌলি শৃঙ্গ দৃশ্যমান। ভাবছি এই শৃঙ্গগুলির কী নাম? এই সময় উপস্থিত হল গ্রামের যুবক ভীম বাহাদুর। জিজ্ঞেস করায় বলল, বালা সহস্রতালের নিকটবর্তী শৃঙ্গ। জনপ্রিয় ট্রেকিংপথ হল এই সহস্রতাল। বাহাদুরের কাছে জানতে পারলাম, সে বছরের বেশির ভাগ সময় থাকে থাটলিং- চৌকি অঞ্চলে। পেশায় মেষপালক। রুটি, সবজি ও সেদ্ধ ডিম সহযোগে প্রাতরাশ সেরে সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম বিরোধা গ্রামের উদ্দেশে। দূরত্ব ১১ কিমি। আজ তুলনামূলক সহজপথ, উচ্চতা ২৫০০ ফিট। গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে দ্রুত গতিতে সবাই পা চালালাম। দু ঘণ্টায় পৌঁছে গেলাম ৫ কিমি দূরের দেওথ্রী গ্রামে। ছোটছোট্ট শিশুগুলির দুহাত ভরে লজেন্স দিতে পারায় আনন্দে ভরে গেল মন৷ অনাবিল হাসি সবার মুখে। মনে পড়ে গেল সন্তানের মুখ! অপত্য স্নেহ বড়ো সাংঘাতিক বেদনার। গ্রামের শেষ প্রান্তে দেখি সমস্ত কুলি ও আমার কিছু বন্ধু অপেক্ষা করছে।

মন মাতানো সবুজ শোভা আর ভিলাঙ্গানার গর্জন শুনতে শুনতে এগিয়ে চললাম। বৃক্ষরাজির মধ্যে দিয়ে থলাইসাগরের লুকোচুরি খেলা চলছে, কখনও মেঘের আড়ালে, কখনও দৃশ্যমান। পৌঁছে গেলাম বিস্তৃত সবুজ গালিচার বুগিয়াল কল্যাণী।

অসংখ্য ভেড়ার পাল, পশুচারণভূমিতে ইতিউতি বিরাজমান। পরিচয় হল দিল্লি থেকে আসা দলের সদস্য বাঁকুড়ার সুভাষের সঙ্গে। কয়েকজন বিদেশিদের সঙ্গে এই অঞ্চলের খাটলিং হিমবাহের উপর কাজ করছে। গূরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে বিদায় জানালাম। সামান্য চড়াই-উতরাই ভেঙে পৌঁছে গেলাম আজকের গন্তব্যস্থল বিরোধা। সময় দুপুর দেড়টা। কাঁটাজাতীয় গাছ খরসু আর বিছুটি গাছে ভরা জঙ্গলের মধ্যে আজকের তাঁবু পাতা হল।

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...