বরফের গভীরতা ও তুষারপাতের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। দেহভারে কখনও কখনও কোমর পর্যন্ত বরফে ডুবে যাচ্ছে। আমরা সবাই সন্তর্পণে পা ফেলে এগিয়ে চলেছি। কীর্তমের সহযোগিতা ও তৎপরতায় ১১.১৫ মিনিটে পৌঁছে গেলাম বাসুকিটপে। একে একে সবাই চলে এল। ঝিরিঝিরি তুষারপাতের মধ্যে কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিয়ে আবার চলা শুরু। শৃঙ্গের মেলা দেখা যায় এখান থেকে। ভাতৃকুণ্ড, কীর্তিস্তম্ভ, কেদারনাথ, কেদারডোম, মহালয়া, চৌখাম্বা প্রভৃতি বিখ্যাত শৃঙ্গ। সারা পথের সবচেয়ে সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য এখান থেকেই দেখা মেলে। আমাদের দুর্ভাগ্য, প্রকৃতি বিরূপ।
ঘণ্টাধ্বনি না! মালবাহক বাহাদুর বলল, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি। থোড়া আগে চলিয়ে সাব, মন্দির দিখাই দেগা। বুকের মধ্যে উত্তেজনা অনুভব করছি। ঘণ্টার শব্দ ক্রমে বাড়ছে, বুকের মধ্যে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। ১১ বছর বয়ে বেড়ানো অস্বস্তি আজ দূর করতেই হবে। ২০০৫ সালের মে মাসে দু বছরের শিশুপুত্র ও স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলাম এই পবিত্র ভূমে। গৌরীকুণ্ড থেকে হাঁটা শুরু করে শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি হয়ে। কেমন আছে জমজমাট সেই কেদারনাথ? ২০১৩ সালের ১৬ জুন মন্দাকিনীর বুকে ভেসে যাওয়া কেদারনাথ কেমন আছে?

মেঘের আড়াল সরে গিয়ে কেদারনাথ উন্মুক্ত। হাঁটার গতি আরও বেড়ে গেল। খাড়া ঢালে নেমে গেছে পথ। টেলিক্যামেরায় চোখ দিয়ে মন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। এত পাথরের স্তূপ! প্রবল স্রোতস্বিনী মন্দাকিনী আজ ক্ষীণ তটিনী। দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে মন্দিরের পাশ দিয়ে বহমান। মন্দিরের পিছনের অংশ আজ বোল্ডার ভূমিতে পরিণত। আবার ঢেকে দিল মেঘ। ৪০০০ মিটার উঁচু কেদারটপ থেকে ক্রমাগত নেমেই চলেছি। হাঁটুর ব্যথাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেছি। ধসের কারণে মাঝেমধ্যেই রাস্তা অদৃশ্য। টিপটিপ বৃষ্টির পিছল রাস্তা গতি কমিয়ে দিচ্ছে। বারে বারে মনে হচ্ছে আর একটু নামলেই পৌঁছে যাব কেদারনাথ। দুধগঙ্গা, মধুগঙ্গা, স্বর্গ দুয়ারী, সরস্বতী প্রভৃতি নদীর মিলনে মন্দাকিনীর সৃষ্টি। কত যে ঝরনা নেমে এসেছে মন্দাকিনীর বুকে তার হিসেব নেই। সাদা অন্ধকারে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি, হাতড়ে বেড়াচ্ছি পথ। ডানদিকের ঝোরা পেরিয়ে নেমে এলাম মন্দাকিনীর ডান তীরে, কিন্তু ওপারে যাব কীভাবে? ব্রিজ নেই, পাথর ডিঙিয়ে যাওয়া অসম্ভব। কয়েকটি বাড়ি দেখে এগিয়ে গেলাম। পরপর বাড়িগুলিতে খোঁজ করে কারও দেখা পেলাম না। মনে হয় ১৩ সালের পর থেকেই পরিত্যক্ত।

তাহলে উপায়! ধীরে ধীরে হেঁটে চলেছি যদি কারও দেখা মেলে! গাইড ও পোর্টার ছাড়াই এগিয়ে আসার ফল। দূরে অপর পারে নদীর কিনারে আসা এক ব্যক্তিকে দেখে চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করলাম, কোন পথে যাব ওপারে। দূরত্ব আর নদীর জলের শব্দে শুনতে পেল না বোধহয়। ইঙ্গিতে বোঝালাম কী চাইছি। সামনের দিকে আঙুল নির্দেশ করে এগিয়ে যেতে বলল। ১.৫ কিমি হেঁটে পৌঁছে গেলাম ভাঙা ব্রিজের কাছে। সাবধানে ব্রিজ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম কেদারধাম।

দুই দিক থেকে বয়ে আসা মন্দাকিনীর উপর তৈরি হয়েছে সরস্বতী ব্রিজ। নীচে হরিদ্বারের মতো বাঁধানো ঘাটে পুণ্যার্থীরা মাথায় জল দিচ্ছে। ব্রিজের অপর পারে গাড়ওয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগম তৈরি করেছে আধুনিক কটেজ, অসংখ্য অস্থায়ী সুইস টেন্ট। মাথাপিছু ২৫০ টাকার বিনিময়ে ঠাঁই হল অস্থায়ী সুইস টেন্টে। আধুনিক বন্দোবস্তের জন্য টেন্টগুলি বেশ ভালো। কাকভেজা হয়ে একে একে সবাই পৌঁছে গেল। কেদার টপ থেকে আসতে সময় লাগল ৩ ঘণ্টা। পেটের ভিতর ছুঁচোর দৌড় শুরু হয়ে গেছে। খেতে গেলাম নিগমের ভোজনালয়ে। পরিছন্ন ভোজনালয় বেশ বড়ো, এখন প্রায় ফাঁকা।

বাড়িতে ফোন করলাম, জানালাম কেদারনাথ পৌঁছে গেছি। সবাই ভালো আছে। পরিবারের কাতর অনুনয়— ওখানে না থাকাই ভালো। বড়ো বিপদের জায়গা। আশ্বস্ত করলাম, ভয়ের কিছু নেই।

পোশাক বদলে মন্দির দর্শনে বেরিয়ে পড়লাম। গুটি গুটি পায়ে মন্দির পৌঁছানোর পূর্বেই পুলিশের হাত থামিয়ে দিল আমাদের। পরিচয়পত্র চেকিং হচ্ছে। বর্তমানে চারধাম যাত্রীদের জন্য বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র আবশ্যিক হয়েছে। কী হবে আমাদের! পুলিশ কর্তাকে বললাম আমরা মায়ালি পাস ট্রেকিং করে কেদারনাথে এসেছি। বন দপ্তরের অনুমতিপত্র রয়েছে। হাসিমুখে ছেড়ে দিল। বাঁধানো পথের দুপাশে দুমড়ানো মোচড়ানো বাড়িগুলির কঙ্কাল ২০১৩ সালের স্মৃতি বহন করছে।

পৌঁছে দেখলাম লোকজন বেশি নেই। পুজোর জন্য মন্দিরের গেট ২ ঘণ্টা বন্ধ থাকবে। মন্দির কমিটির অফিসে সৌম্য দর্শন এক যুবা পাশের গেট দেখিয়ে বলল— দর্শন করনা হ্যায়, অন্দর যাইয়ে, আভি পূজা চল রাহা হ্যায়। অবিশ্বাসী মন কখনও কখনও কাকতলীয় ঘটনার ব্যাখ্যা করতে পারে না, চিরদিন গেঁথে থাকে মনের গভীরে। ত্রিকোনাকার গ্রানাইট পাথরের মূর্তি ছুঁয়ে প্রণাম করলাম। এতদিনের বাসনা পূর্ণ হল। মন্দির চত্বরের মাঝে হোমাগ্নি ঘিরে কিছু ভক্ত ও সন্ন্যাসী ওম গ্রহণ করছেন। ভিড়ে থিক থিক করত এই মন্দির চত্বর, মানুষশূন্য এখন।

সন্ন্যাসীদের আখড়া দেখার অভিপ্রায়ে মন্দিরের পিছনে গেলাম। কিছুই নেই, কেবল বোল্ডারের রাজত্ব। শঙ্করাচার্যর সমাধি ক্ষেত্রটিও অবশিষ্ট নেই। মন্দিরের পিছনে বিপুল আকৃতির একটি গণ্ডশিলা দাঁড়িয়ে রয়েছে মন্দিরকে আড়াল করে। ভীমশিলা নামের বোল্ডারটি নাকি মন্দিরকে রোষের হাত থেকে রক্ষা করেছে। বর্তমানে এই শিলা পূজিত হয়।

মেঘের পর্দা সরিয়ে বিকালের অন্তিম আভা ছড়িয়ে দিয়েছে কেদার চূড়ায়। মেঘ আর আলোর খেলায় মোহময় হয়ে উঠেছে চারিদিক। হায় রে আধুনিক সভ্যতা! কয়েক মিনিটও শান্তিতে থাকতে দেবে না নিজের মতো করে, অনুভব করতে দেবে না ভালো লাগাকে। বিকট শব্দ দানব, ছিন্ন ভিন্ন করে দিচ্ছে কেদারনাথের শান্ত পরিবেশ। কী অসহনীয় এই শব্দ! উত্তরাখণ্ড সরকার কেন ব্যবস্থা করেছে এই উড়ানের? ৩ কিমি আগে শেষ করলে হয় না!

এতক্ষণের ভালোলাগার অনুভূতিগুলি বিরক্তিতে বদলে যাচ্ছে। সরকার কেদার যাত্রীদের সুবিধার্থে হেলিকপ্টার সার্ভিস চালু করেছে। প্রতি ১০ মিনিট অন্তর উড়ানের শব্দে কান ফেটে যাচ্ছে। সঙ্গে কেদার পুণর্গঠনের কাজে ব্যবহৃত গাইতি, কোদাল, স্টোন ক্রাশার ইঞ্জিনের শব্দ মিলেমিশে ভয়াবহ অবস্থা। তোমরা সবাই একটু চুপ করবে? আশুতোষ ধ্যান করবেন। জাগিয়ে দিও না, শুরু করে দেবে তাণ্ডব নৃত্য। ধ্বংস করে দেবে সবকিছু।

(সমাপ্ত)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...