বর্ষাকালে চোখের অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। এই সময় কীভাবে চোখের সংক্রমণ প্রতিরোধ করবেন, সেই বিষয়ে বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আদিত্য প্রধান।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের চারপাশে অতিরিক্ত জীবাণুর সৃষ্টি হয় বর্ষাকালে। আর এইসব জীবাণু আমাদের চোখেও বাসা বাঁধে অনায়াসে। তাই, বর্ষাকালে কীভাবে চোখের যত্ন নিয়ে, সংক্রমণ প্রতিরোধ করবেন, সেই উপায় জেনে নেওয়া আবশ্যক। চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আদিত্য প্রধান এই বিষয়ে পরিবেশন করেছেন বিস্তারিত তথ্য এবং পরামর্শ।

কনজাংটিভাইটিস

বর্ষাকালে চোখে সবচেয়ে বেশি যে সংক্রমণটি হয়, চিকিৎসা পরিভাষায় তাকে বলা হয়— কনজাংটিভাইটিস। আর এই কনজাংটিভাইটিস হল কনজাংটিভা-র (চোখের পাতার উপরিভাগ ঢেকে রাখে এবং চোখের বলের উন্মুক্ত পৃষ্ঠকে ঢেকে রাখে) প্রদাহ। বর্ষাকালে এই চোখের রোগটি বেশ সাধারণ। ভাইরাল জ্বরের মতোই এই সংক্রমণও সংক্রামক। এর ফলে চোখ লাল হয়ে ওঠে এবং চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে। সেইসঙ্গে, ব্যথা এবং স্রাব (পিচুটি) বের হতে পারে এবং সাধারণত এক চোখে শুরু হয় এবং অন্য চোখে ছড়িয়ে পড়ে, কারণ এই স্রাব সংক্রামক।

কেউ কেউ চোখের মধ্যে কিছু পড়ে যাওয়ার মতো তীব্র ব্যথার অনুভূতি পান অনবরত। কর্নিয়ার চারপাশে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে এবং সংক্রমণ যদি কর্নিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে, তবে রোগীর আলোর প্রতি অসহিষ্ণুতা (ফটোফোবিয়া) এবং ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এইসময় আলোর চারপাশে রঙিন বলয় দেখা দিতে পারে। এটি সাধারণত ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে ঘটে এবং এর আগে জ্বরও হতে পারে। যদিও এটি সাধারণত এক সপ্তাহ স্থায়ী হয়। কখনও আবার এটি ১৪ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তাই, সমস্যা তৈরি হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত এবং চোখের পরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজনে উপযুক্ত চিকিৎসা করানো উচিত। কারণ চোখে সমস্যা তৈরি হলে মাঝে মাঝে দৃষ্টির জটিলতা দেখা দিতে পারে।

স্রাব যেহেতু সংক্রামক, তাই রোগীর সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত এবং আলাদা তোয়ালে, বিছানার চাদর ইত্যাদি ব্যবহার করা উচিত। সংক্রামিত ব্যক্তির চোখের স্রাবের মাধ্যমে কনজাংটিভাইটিস ছড়ায়। তাই, স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে, চোখ স্পর্শ করা এড়িয়ে চলা উচিত। ঘরে-বাইরে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করার জন্য সানগ্লাস পরা একটি কার্যকর উপায়।

কনজাংটিভাইটিস যদিও নিজে থেকেই সেরে যায়, তবুও ঝুঁকি না নিয়ে, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াই ভালো। কৃত্রিম অশ্রু এবং অন্যান্য থেরাপির মাধ্যমে এখন আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে দ্রুত আরোগ্যলাভ সম্ভব। তবে নিজে থেকে কোনওরকম অ্যান্টিবায়োটিক আই-ড্রপ নেবেন না। কারণ না জেনে ভুল ওষুধ প্রয়োগ করলে চোখের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। কনজাংটিভাইটিস-এ আক্রান্ত হলে, আই স্পেশালিস্ট অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত, কন্ট্যাক্ট লেন্স পরিধানকারীদের লেন্স পরা বন্ধ করতে হবে। একই পরিবারে একাধিক ব্যক্তির সংক্রমণ হলেও, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্যের জন্য প্রেসক্রাইব করা আই-ড্রপ ব্যবহার করবেন না। এই সময় পাবলিক প্লেস-এ যাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত।

বর্ষাকালে কর্নিয়াল আলসার-এর শিকারও হতে পারেন যে-কেউ। আর এই কর্নিয়াল আলসার হল – কর্নিয়ার একটি সংক্রমণ। এই ঋতুতে কর্নিয়াল আলসারের প্রবণতা বেড়ে যায়। বিশেষকরে যারা কন্ট্যাক্ট লেন্স পরেন এবং যারা খেত-খামারে কাজে নিযুক্ত, তাদের এই সমস্যা হতে পারে। এর বৈশিষ্ট্য হল— আক্রান্ত চোখে হঠাৎ ব্যথা, লালভাব, জল পড়া, ফটোফোবিয়া এবং দৃষ্টিশক্তি হ্রাস।

অবিলম্বে চিকিৎসা না করা হলে, এটি গুরুতর হতে পারে। তাই উপরের লক্ষণগুলি থাকলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া আবশ্যক। আক্রান্ত ব্যক্তির অবিলম্বে কন্ট্যাক্ট লেন্স পরা বন্ধ করা উচিত। চিকিৎসা অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল মাধ্যমে করা হয় এবং এই চিকিৎসা রোগের তীব্রতা এবং কারণের উপর নির্ভর করে।

অ্যালার্জি

ধুলো, পরাগরেণু, প্রসাধনী এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন চোখের অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। অ্যালার্জিক কনজাংটিভাইটিসের সময় কন্ট্যাক্ট লেন্স পরিধানকারীদের লেন্স পরা বন্ধ করতে হবে। সানগ্লাস পরে চোখকে ধুলোর থেকে রক্ষা করতে হবে।

মাইক্রোস্পোরিডিয়াল কেরাটো-কনজাংটিভাইটিস

এটি এমন একটি সংক্রমণ, যা কর্নিয়া এবং কনজাংটিভা উভয়কেই প্রভাবিত করে। দূষিত জল, মাটি, কাদা, পাবলিক সুইমিং পুল, কন্ট্যাক্ট লেন্স, নদী কিংবা পুকুরে স্নানের মাধ্যমেও আসতে পারে এই রোগ।

আঞ্জনি বা হর্ডিওলাম

এই রোগটি আঞ্জনি বা হর্ডিওলাম নামে পরিচিত। এটি চোখের পাতার গোড়ায় অথবা চোখের নীচে দেখা যায়। এটি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে হয়। আক্রান্ত স্থানে দিনে ৩ থেকে ৫ বার ১০-১৫ মিনিট ধরে উষ্ণ কম্প্রেস প্রয়োগ করলে এবং তারপর হালকা ম্যাসাজ করলে দ্রুত সেরে যায়। অবস্থার তীব্রতা অনুযায়ী চক্ষু বিশেষজ্ঞ অ্যান্টিবায়োটিক আই-ড্রপ কিংবা মলম লিখে দিতে পারেন।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...