শাশুড়িমা চা-জলখাবার তৈরি করে ডাইনিং টেবিলে পরিবেশন করে দিয়েছেন। সকলেই খাওয়ায় মনোনিবেশ করেছে। একা অলকানন্দা সকলকে পরিবেশন করছেন। কেউ লুচি চাইছে তো কেউ তরকারি। কেউ আর এক কাপ চায়ের ফরমায়েশ করছে। এমনকী অলকানন্দার একমাত্র মেয়ে শিল্পাও মা-কে দুপুরে কী খাবে তার ফরমায়েশ জানাচ্ছে। বেচারি অলকানন্দা একা হিমশিম খাচ্ছেন!

এসব দেখে সামান্থা ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড রেগে উঠলেও, মুখে কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সকলের ওর উপর চোখ পড়লেও, কেউই মুখে কিছু বলল না। এমনকী নীলয়ও না! অলকানন্দা রান্নাঘরে ছিলেন। সকলের ব্যবহারে সামান্থা এতটাই মনে আঘাত পাচ্ছিল যে, ওর চোখে জল এসে গেল। অলকানন্দা সামান্থাকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘সামান্থা তুমিও চা খেয়ে নাও।’

অলকানন্দার কথা শেষ হতেই টেবিলে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে নীলয়ের ঠাকুমা বলে ওঠেন, ‘বউমা, এখন তুমি বাড়ির বউ শুধু নও, শাশুড়ি হয়ে গেছ। সুতরাং তোমার দায়িত্ব এখন— ভুল করেও এমন কিছু কোরো না, যেটা নিয়ে পরে তোমাকে পস্তাতে হতে পারে৷ এটা তোমার বাপের বাড়ি নয়, যেখানে সবকিছু সবাই মেনে নেবে।’

‘ঠিক আছে মা’, মাথা নিচু করে অলকানন্দা উত্তর দিলেন।

নীলয়ের ঠাকুমা আবার বলেন, ‘আর একটা কথা বউমা, কাল আমার গুরুদেবকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেছি। যা যা ব্যবস্থা করার সব করে রেখো। পুজোর সমস্ত সামগ্রী গুরুদেব নিজেই নিয়ে আসবেন। পুরো বাড়ি শুদ্ধ করে দেবেন এবং একই সঙ্গে এই ছুঁড়িটার নাম বদলে ওকেও শুদ্ধ করে দেবেন।’

মায়ের কথা শুনেই কৌশল্যা জপের মালা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে ঈশ্বরের আরাধনায় সামান্য বিরাম টেনে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নাম বদলে… কিন্তু কেন?’

‘তোরও কি জ্ঞানগম্যি সব লোপ পেল কৌশি? ছুঁড়িটার নাম মুখে এলেও জিভ মনে হয় অশুদ্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া গুরুদেবও বলেছেন, নাম বদলালেই নীলয়ের বিবাহিত জীবন সুখময় হতে পারবে, ভবিষ্যতে নয়তো বিচ্ছেদের সম্ভাবনা থাকবে। তাছাড়াও ছুঁড়িটার কারণে পরলোকে আমাদের পূর্বপুরুষদের উপর যে-কলঙ্ক লেগেছে, সেটাও গুরুদেব যজ্ঞ করে দূর করে দেবেন। ওনাদের ওখানে তাহলে আর নরকবাস করতে হবে না। একই সঙ্গে শিল্পার বিয়ের জন্যও গ্রহশান্তির ব্যবস্থা করাবার কথা বলছিলেন গুরুদেব।’ এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থেমে যান অলকানন্দার শাশুড়ি মৈত্রীদেবী।

একটু দম নিয়ে এবার ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘সন্দীপ, ব্যাংক খুললেই সকাল সকাল গিয়ে এক লক্ষ টাকা তুলে আনিস। পুজোর জন্য লাগবে।’

টাকার অঙ্ক শুনেই নীলয়ের বাবা আঁতকে উঠে মায়ের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বললেন, ‘মা এক লক্ষ টাকা, তাও শুধু পুজোর জন্য! একটু বেশি নয় কি?”

ভাইয়ের কথা শুনে কৌশল্যা বলে উঠলেন, “বেশি কোথায় রে ভাই। এটা খুবই কম! আমাদের পরিবারের উপর গুরুদেবের আশীর্বাদ রয়েছে। এছাড়া মা গুরুদেবের পরমভক্ত, তাই এতটা কমে এই পুজোপাঠ করতে রাজি হয়েছেন তিনি। তুই আর অলকানন্দা তো ছেলের প্রতি অন্ধ হয়ে একটা বিধর্মী মেয়েকে বাড়ির বউ করে নিয়ে এসেছিস। তোদের জন্য আমাদের পরলোকগত পূর্বপুরুষদের সারাজীবন কষ্ট পেতে হবে।

নীলয় এতক্ষণ চুপ করে থেকে বাবার মুখে চিন্তার আনাগোনা লক্ষ্য করছিল। ও বাবাকে নিশ্চিন্ত করতে বলল, “বাবা, তোমাকে কোথাও যেতে হবে না, আমি আমার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে আনব।’

সামান্থা অবাক হয়ে যায় নীলয়ের ব্যবহারে। এতদিন ধরে ওর সঙ্গে মেলামেশা করছে, নীলয়ের এরকম অন্ধবিশ্বাস আগে কখনও সে দেখেনি। সেই সঙ্গে নীলয়ের পুরো পরিবার এতটা শিক্ষিত এবং আধুনিক হয়েও কীভাবে এই অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকার গারদে স্বেচ্ছায় বন্দি থেকে গেছে, সেটা সামান্থার কিছুতেই বোধগম্য হল না। তার খালি মনে হচ্ছিল, এই ধরনের মানসিকতার মানুষগুলো কী করে নীলয়ের সঙ্গে তার বিয়েতে রাজি হয়েছিল।

আসলে সামান্থার এটা অজানাই ছিল যে, এই গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবার তাকে বউ হিসেবে এইজন্যই মেনে নিয়েছিল, যাতে তাদের একমাত্র রোজগেরে ছেলে বিয়ে করে আলাদা না থাকতে শুরু করে দেয়। তাছাড়া সামান্থাও খুব বড়ো চাকরি করে। ফলে ছেলে, বউমা দু’জনকেই প্রয়োজনে কাজে লাগবে! এছাড়াও বাড়ির একমাত্র মেয়েরও বিয়ে দিতে হবে, সুতরাং সেখানেও টাকার দরকার পড়বে।

এইসব নানা কথা চিন্তা করতে করতে হঠাৎ সামান্থার খেয়াল হল যখন গুরুদেব আর গ্রহশান্তির কথা হচ্ছিল, তখন সে কথা শুনে শাশুড়িমা-র মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে পড়েছিল আর শিল্পার মধ্যেও একটা অস্থিরতা সামান্থা টের পেয়েছিল।

যে-মেয়েটা হেসে হেসে এতক্ষণ সকলের সঙ্গে গল্প করছিল, গ্রহশান্তির কথা শুনেই তার মুখের এই ভাবান্তর, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া এবং শিল্পার পিছনে অলকানন্দারও চলে যাওয়াটা সামান্থাকে ভাবিয়ে তুলছিল। সামান্থাও একটু বসে নিজের ঘরে যেতে গিয়ে শিল্পার ঘরের সামনে পৌঁছাতেই, অলকানন্দা আর শিল্পার কথোপকথন তার কানে এল।

শিল্পা বলছে, ‘মা আমি গ্রহশান্তির জন্য কিছুতেই পুজোয় বসব না, তাতে আমার বিয়ে হোক আর নাই হোক৷’

(ক্রমশ…)

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...