জেমস বন্ড খ্যাত অভিনেতা ড্যানিয়েল ক্রেগ একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, তাঁর পেশায় অর্জিত স্থাবর, অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানদের হাতে তিনি পুরোপুরি সঁপে দিতে চান না। প্রতিটি ছবি বাবদ ড্যানিয়েলের উপার্জন কয়েক কোটি ডলার। সাক্ষাৎকারে বলা কথার স্বপক্ষে তিনি জানিয়েছিলেন, এই বিপুল অর্থরাশি উপার্জনের কষ্ট সন্তানরা বুঝবে না, যদি তা উত্তরাধিকার সূত্রে অনায়াসে তাদের হস্তগত হয়। ক্রেগের দুই সন্তান— এক ছেলে এবং এক মেয়ে।
কয়েক দশক আগে অ্যান্ড্রু কার্নেগি, তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি (যার পরিমাণ ১১ মিলিয়ন ডলার) ‘কার্নেগি ফাউন্ডেশন’- এর তহবিলে দান করে দেন।
অর্থাৎ, পিতা-মাতার সম্পত্তি সবসময় যে সন্তানেরই প্রাপ্য হবে, এমনটা না-ও ঘটতে পারে। সমাজ-সংসারের যদিও সেটাই প্রত্যাশা থাকে। সন্তান জন্মানোর পর কায়-ক্লেশহীন জীবন অতিবাহিত করে পিতা-মাতার আর্থিক সচ্ছলতার কারণে। এই জেনারেশনের অধিকাংশ তরুণ-তরুণীরা তাই ভোগবিলাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।
অতএব, সন্তান স্বাবলম্বী হওয়ার আগে তার হাতে অর্থ-সম্পত্তি তুলে দিলে, সে ভোগবিলাসে মেতে উঠে নিজের এবং অন্যের ক্ষতি করতে পারে। তাই, আগে তাকে বুদ্ধি দিন, বিচক্ষণ করে তুলুন এবং পরিশ্রমের মন্ত্র দিন। সেইসঙ্গে, আপনার উপার্জিত অর্থের মূল্য বুঝতে শেখান।
আজকাল সন্তানের ভাবগতিক দেখে অনেকেই তাঁদের সম্পত্তি দান করে যাচ্ছেন কোনও প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি, সেই প্রতিষ্ঠানও কি মূল্য দিচ্ছে আপনার পরিশ্রম করে উপার্জন করা অর্থের? তারা আদপে এই বিত্তের কতটা অধিকারী?
সামাজিক কাজের জন্য সচ্ছল কোনও ব্যক্তি হয়তো তাঁর অর্থ দান করলেন কোনও ধর্মীয় বা সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে। আখেরে দেখা যায় যে, সেই অর্থের প্রতি কোনও মমত্ববোধ থাকে না প্রতিষ্ঠানগুলির এবং আর্তের সেবায় না লেগে সে টাকা নয়ছয় হয় অনেক ক্ষেত্রে।
একসময় এক জল কোম্পানির মালিক তাঁর প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন, কারণ তাঁর একমাত্র কন্যার এই ব্যাবসার প্রতি কোনও টান ছিল না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তাঁর কন্যা সিদ্ধান্ত বদলে পৈতৃক ব্যাবসার মালিকানা ধরে রাখে।
এইরকমই ঘটনা ঘটে নানা যৌথ পরিবারের ব্যাবসার ক্ষেত্রেও। পরিবারের মধ্যে বিবাদের জেরে ব্যাবসা ভাগ বাটোয়ারা হয়ে যায় কিংবা বছরের পর বছর বাদানুবাদের মামলা চলে। আবার কেউ যদি মনে করেন, তাঁর সারাজীবনের অর্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চার্চ, মন্দির কিংবা মাদ্রাসায় দিয়ে যাবেন, তাহলেও নিশ্চিত হওয়া যায় না যে, এই অর্থ ভালো কাজে ব্যবহার হবে কিনা।
তাই সন্তানদের কাছে পারস্পরিক ভাবে বিত্ত হস্তান্তরিত হওয়া ছাড়া বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। এই আর্থিক দান কোনও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেওয়া অর্থহীন। মাঝে সরকার এই দাতব্য বিত্তের উপর এস্টেট ডিউটি লাগু করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থা পৃথিবীর কোনও দেশেই কার্যকর হয়নি। ফলে এখন আইনি জটিলতায় না গিয়ে, সন্তানরাই উত্তরাধিকার সূত্রে বাবা-মার বিত্তের অধিকারী হবে, ভারতীয় আইনে এই ব্যবস্থাই কায়েম রয়েছে। তবে, সন্তানদের হাতে অর্থ-সম্পত্তি তুলে দেওয়ার আগে, তাদের বুদ্ধিমান এবং বিচক্ষণ করে তুলুন। শুধু তাই নয়, বিলাসিতার পরিবর্তে আপনার সন্তান যাতে আপনার উপার্জিত অর্থের মূল্য বোঝে এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে সেও যাতে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করুন। আর তাই, বিলাসিতায় অর্থ ব্যয় না করে, আপনার সন্তান যাতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করে, সেই শিক্ষাও তাকে দিন ছোটো থেকেই।
আপনার দৈনন্দিন পারিবারিক জীবনে আপনি কীভাবে অর্থ ব্যবহার করেন, কীভাবে আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখেন, সেই অর্থ-ব্যবস্থাপনা (মানি-ম্যানেজমেন্ট) সম্পর্কে সম্পূর্ণ শিক্ষা দিন আপনার সন্তানকে। সন্তানের সামনে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে অর্থ ব্যবহার করে আপনি আপনার সন্তানের সঞ্চয়ের মনোভাবকেও প্রভাবিত করতে পারেন এবং এর ফলে আপনার সন্তান আপনার উপার্জিত অর্থের প্রকৃত মূল্য বুঝবে। সন্তানকে স্বাবলম্বী করে তোলার এটাই অন্যতম উপায়।





