এই ব্যস্ত জীবনে কার মনের খবর কে রাখে! কিন্তু যে অন্যের মনের খবর রাখে, অন্যের বিবর্ণ মনকে বর্ণময় করে তুলতে পারে, সে- ই তো তার মনের মানুষ হয়ে ওঠে হঠাৎই। আসলে, মন উচাটন। আজ যা ভালো লাগে, কাল ভালো না-ও লাগতে পারে৷ কেউ কেউ অবশ্য পুরোনোর মধ্যে নতুনত্বের স্বাদ পাওয়ার চেষ্টা করেন, অনেকেই আবার তা পারেন না। যারা পারেন, তারা সুখী দম্পতি। আর যারা পারেন না, তারা জড়িয়ে পড়েন নতুন সম্পর্কে। এই অতিরিক্ত সম্পর্ক শারীরিক, মানসিক দুই-ই হতে পারে। এখন এইরকম সম্পর্ক বাড়ছে। কখনও আবার এই সম্পর্ক গোপন থাকছে না, প্রকাশ্যে চলে আসছে। খবরের শিরোনামও হয়ে উঠছে কখনও৷ যাইহোক, এবার চলুন ডুব দেওয়া যাক মনের গভীরে।

মন যা যা চায়

মনযোগ: সংসারে সবাই চায়, তাকে বাড়তি গুরুত্ব এবং মনযোগ দেওয়া হোক৷ কিন্তু তা যদি না দেওয়া হয়, তাহলে মনের ভিতর একটা চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন এই ক্ষোভ জমতে জমতে একদিন সমাধানের রাস্তা খোঁজা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। আসলে এক ছাদের তলায় বসবাস করে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা অটুট থাকলেও, শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে তৈরি হয়ে যায় মনখারাপ, অবসাদ। যার ফলে মন খুঁজে বেড়ায় অন্য কোনও আশ্রয়।

প্রশংসা: আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও নানা কারণে নিজেকে নিজে প্রশংসিত করার অভ্যাস আছে মানুষের। তাই প্রশংসা পেতে চান সকলেই। কিন্তু দাম্পত্যে একে অন্যকে কোনওদিনও যদি প্রশংসা না করেন, বাহবা না দেন, তখন একটা অপাংক্তেয় হয়ে যাওয়ার অনুভূতি হয় এবং তখনই সম্পর্কে তৃতীয় কারওর ঢুকে পড়ার পথ সুগম হয়। অতএব, প্রশংসা করাটা জরুরি। ভালো কিছু করলে তারিফ করবেন, এমনকী ভালো পোশাক, ভালো রান্না, ভালো কথা প্রভৃতি সাধারণ বিষয়েও পারলে প্রশংসা করুন।

ক্ষমতা: বৈবাহিক সম্পর্কে যতই ভালোবাসা থাকুক না কেন, কিছু কিছু সাংসারিক ক্ষমতা ভোগ করতে চান স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই। যেমন, কোথায় কী খরচ হবে, কোন জিনিসটা কেনা হবে, এসব সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা ভোগ করতে চান উভয়েই। যদি এক্ষেত্রে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নিতে পারেন তাহলে ভালো, নয়তো বিপত্তি। বিষয়টি ছোটো হলেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অনেকসময় এই ছোটোখাটো বিষয় থেকে ঝগড়া অশান্তির সূত্রপাত ঘটে এবং দাম্পত্যসুখ নষ্ট হয়। ফলে, সুখের আশায় মন খুঁজে নেয় অন্য কাউকে।

মুক্তি: ভালো কাজে ইগো থাকা ভালো, কিন্তু অকারণে ইগো সর্বনাশের মূল কারণ। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যদি অত্যধিক ইগো থাকে, তাহলে সেই সম্পর্ক মধুর হয় না। আর ঠিক তখন তৈরি হয় অবৈধ সম্পর্কের চাহিদা। ইগোর লড়াইয়ে যখন ঝামেলা চরমে পৌঁছোয়, তখনই দু’জনের মনে হয়, অন্য কারওর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে, এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। আসলে, সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার জন্য ঠিক যতটুকু যা প্রয়োজন, চাহিদাও থাকা চাই ততটুকু। সংসারে উপার্জনের থেকে যদি চাহিদা বেশি থাকে স্ত্রীর, তাহলে সেই চাহিদা যখন স্বামী পূরণ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখনই তৈরি হয় সংঘাত। আর এই সংঘাত চলতে চলতে উভয়ের মনের মধ্যে জন্ম নেয় ‘এক্সটা রিলেশন’-এর চাহিদা।

কুপ্রভাব

অভাব-অনটন: সংসার চলছিল ঠিকঠাক, হঠাৎ স্বামীর চাকরি চলে গেল, ব্যস! শুরু হল জীবনযুদ্ধ, অভাব-অনটন। যদি স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে প্রগাঢ় প্রেম থাকে তাহলে কিছুদিন টেনেটুনে, মানিয়ে নিয়ে বয়ে চলে সংসার। এর মধ্যে যদি স্বামী পুনরায় আর্থিক স্থিতি ফিরিয়ে আনতে পারেন তাহলে ভালো, নয়তো অশান্তির সূচনা হবেই। আর এর থেকে মুক্তি পেতেই শুরু হয়ে যায় অন্য কাউকে খোঁজার কাজ। এই অবস্থায় যদি মনের মতো কোনও সঙ্গী পাওয়া যায়, তাহলে তো কথাই নেই।

ঝগড়া-অশাস্তি: বিয়ের পর প্রথমদিকে যেটা রাগ-অভিমানের মধ্যে থাকে, অনেকসময় ধীরে-ধীরে তা ঝগড়া-অশান্তিতে পরিণত হয়। কেউ কেউ তো ছোটোখাটো সমস্যাকে বড়ো করে তুলে অশান্তির সূচনা করেন। এর ফলে অশান্ত মন একটু শান্তির আশায় খুঁজে পেতে চায় অন্য কাউকে।

প্রলোভন: সুযোগসন্ধানীরা ফাঁদ পেতেই রাখে। যিনি অল্পে সন্তুষ্ট থাকেন, লোভ সংবরণ করতে পারেন, তিনি সেই ফাঁদে পা রাখেন না। কিন্তু অনেকের সেই সংযম থাকে না। তাই তারা প্রলোভনের শিকার হন। চাকরি বাঁচাতে, পদোন্নতি ত্বরান্বিত করতে, স্টার হোটেলে থাকা-খাওয়ার লোভে, দামি গাড়িতে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেতে কিংবা অন্য কোনও ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার তাগিদ থেকে “এক্সট্রা’ রিলেশন-এর প্রলোভনে পড়ে যান অনেকে। এরপর যদি স্বামী-সন্তান এবং অতিরিক্ত সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারেন তাহলে ভালো, নয়তো পরিণতি সুখকর হয় না।

দূরত্ব: পেশাগত কারণে স্বামী-স্ত্রী দু’জনে এক ছাদের তলায় থাকতে পারেন না অনেকসময়। থাকতে হয় দূর-দূরান্তে। দীর্ঘদিন এভাবে একা থাকতে থাকতে যে শারীরিক অপূর্ণতার সৃষ্টি হয়, তা খুবই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে দাম্পত্যে। ওইসময় যদি কেউ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে সে সফল হয় অনায়াসে।

অসুস্থতা: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দীর্ঘদিন যদি কেউ অসুস্থ থাকেন, তাহলে জীবনে একঘেয়েমি চলে আসে অন্যের। আর এর থেকেই জন্ম নেয় অন্য সম্পর্কের চাহিদা। এই সময় যদি কেউ বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে সেই সঙ্গীটির প্রতি মানসিক ও শারীরিক নির্ভরতা জন্মে যায়।

যৌন অক্ষমতা: সুন্দর-সুঠাম চেহারা দেখে বিয়ে করেও পস্তায় অনেকে। বিয়ের পর যখন দেখা যায় স্বামী কিংবা স্ত্রী, কেউ একজন যৌন অক্ষম, তাহলেই বিপত্তি। দীর্ঘদিন এই অক্ষমতা প্রায় কেউই মেনে নিতে পারেন না। ফলে, শারীরিক চাহিদা মেটানোর তাগিদ থেকে শুরু হয়ে যায় আরও এক বা একাধিক সম্পর্কের সূচনা।

কিছু উদাহরণ

এই যেমন সুমনার ব্যাপারে সন্তু কেন হঠাৎ নিস্পৃহ হয়ে উঠছিল, এর কোনও কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না সুমনা। কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, যাকে সে নিজের স্বামী বলে জেনেছে এতকাল, সে কেমন যেন অচেনা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। সুমনার সঙ্গে কথা বলতেও যেন ইদানীং ক্লান্ত বোধ করে সন্তু। সুমনা হয়তো আঁচ করতেও পেরেছে যে, ‘তৃতীয় কেউ’ এসেছে সম্ভর জীবনে।

অমিতকে মন খুলে সব কথা বলা সম্ভব নয় কলি-র৷ অথচ সে বুঝতে পারছে, মনে মনে যোজন দূরত্ব তৈরি হয়ে যাচ্ছে তার স্বামী অমিতের সঙ্গে। নির্ভার হওয়ার আর নির্ভর করার একটি ভিন্ন আধার খুঁজে পেয়েছে কলি। ধীরে ধীরে ওই মানুষটিই হয়ে উঠেছে তার প্রেম। কোনও যুক্তিবুদ্ধি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করেও কূলকিনারা পায় না কলি। সে জানে না এমন কেন হল, কী করে হল। শুধু জানে, তার জীবনে আসা নতুন সম্পর্কের মানুষটিকে জীবন থেকে বাদ দিয়ে বাঁচা আর সম্ভব নয়।

পরিবর্তিত পরিস্থিতি

এই ধরনের সমান্তরাল সম্পর্ক গড়ে ওঠে আমাদের আশপাশে, পরিচিত মহলে, এমনকী কর্মক্ষেত্রেও। সিংহ ভাগ না হলেও, এমন ঘটনা আজকাল আর বিরল নয়। সমাজতাত্ত্বিকরা একে কেতাবি পরিভাষায় কী বলবেন জানা নেই, তবে এটা ঠিক যে, এ যুগের মেয়েরা, পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এখন কর্মক্ষেত্রে নিজেদের অপরিহার্য করে তুলেছেন। এই কর্মজগতের যতরকম সংঘর্ষ কিংবা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় একজন পুরুষকে, ঠিক ততটাই ফেস করেন একজন

মহিলা-কর্মীও। কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘসময় অতিবাহিত করা এবং প্রতিদিন প্রতিনিয়ত কর্মজগতের নানা ঝক্কি সামলাতে সামলাতে, কখন যে সহকর্মী দুটি নারী-পুরুষ পরস্পরের খুব সহমর্মী হয়ে ওঠে, কেউ জানতেও পারে না।

অতিরিক্ত সম্পর্কে শরীর অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন পুরুষ ও নারীকে শুধু শরীরই বাঁধতে পারে, এমন ধারণায় যারা বিশ্বাসী, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে খানিকটা এলোমেলো করে দিয়েই হয়তো, কর্মক্ষেত্রে গড়ে উঠতে পারে শরীরবর্জিত এক ইমোশনাল রিলেশনশিপ। খুব পার্থিব লেনদেন হয়তো সেই সম্পর্কের অন্যতম শর্ত না-ও হতে পারে। তবু হয়তো সময়েরই চাহিদায় একসময় মনের সুকোমল বৃত্তিগুলি পাপড়ি মেলে, পরস্পরকে ভালোবেসে ফেলে দুটি মন। সুমনার পক্ষে হয়তো বোঝা সম্ভব নয়, ঠিক কোন যুক্তি থেকে ‘তৃতীয় কেউ’ হয়ে ওঠে সন্তুর সমস্ত আশা, আকাঙ্খা, ভয়, ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েন শেয়ার করার একমাত্র ক্ষেত্র। ঠিক যেমন অমিতেরও বোঝা সম্ভব নয়, কী করে এক অন্য পুরুষ কলি-র জীবনের ইমোশনাল শেয়ারিং-এর এক ও একমাত্র ক্ষেত্র হয়ে ওঠে!

আসলে এরকম ঘটনা এখন এমনই এক স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে বহু মানুষের জীবনেই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এই সম্পর্ককে আর অস্বীকার করার উপায় থাকছে না। হ্যাঁ, সন্তুর ব্যবহারে পরিবর্তন আসা অস্বাভাবিক নয়। তার ইমোশনাল শেয়ারিং অন্য একটি ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে হয়ে যাচ্ছে বলেই, সুমনার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সে আর এর পুনরাবৃত্তি করতে পারছে না বাড়ি ফিরে। অমিতের থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে কলিরও হয়তো একটা খারাপ লাগা আছে মনে মনে৷ কিন্তু সম্রাটকে সে এমন বন্ধু হিসাবে হঠাৎই পেয়েছে জীবনে যে, তার কাঁধে মাথা রেখে কলি নিশ্চিন্তে নিজের আবেগের বহিঃপ্রকাশ করতে পারে। এ এক আশ্চর্য মন-বদলের খেলা, যার শেষটা হয়তো আদতে কারওরই জানা নেই!

আবেগজনিত দায়বদ্ধতা

দুটি নারী-পুরষের অন্তরঙ্গতার মধ্যে যৌনতা যে থাকতেই হবে, এমন বিধিবদ্ধ নিয়ম নেই। গভীর ইমোশনাল বন্ডিং-এ শরীর থাকতেও পারে, আবার না-ও পারে। আসলে শরীর থাকবে কী থাকবে না, সেটা নির্ভর করে এমন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া ওই দুটি মানুষেরই উপর এবং খানিকটা পরিবেশ পরিস্থিতির উপরেও। তবে সম্পর্কে শরীর থাকুক বা না থাকুক, একধরনের অতিরিক্ত আবেগজনিত দায়বদ্ধতা থাকেই দু’জনের মধ্যে। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর ইমোশনাল লেভেল-এ ইন্টার‍্যাকশন যদি একটি সম্পর্কে পরিণতি পায় এবং সেই সম্পর্কের পরিপূরক হিসাবে যদি দুটি মানুষের সেক্সুয়াল কেমিস্ট্রি-তে একটা সাজুয্য এসেই পড়ে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

পূর্ণতার অভাববোধ

দাম্পত্যে যখন আবেগের মূল্য পরস্পরের কাছে থাকে না অথবা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যেই কিছু আবেগজনিত বিষয়ে গোপনীয়তা তৈরি হয়, যখন উভয়ের মধ্যে সততা বা কমিউনিকেশনের অভাব হয়, যখন একে অন্যের দিক থেকে পূর্ণতার অভাববোধ করে, তখনই এক্সট্রা-ম্যারিটাল ইনভল্ভমেন্ট-এর পক্ষে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়।

প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা টানা কর্মক্ষেত্রে নিজেকে ইনভলড্ রাখাও নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই এক ধরনের অভ্যাস। সেখানে বাস্তবিকই হাঁফ ছাড়ার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে এমন একজন মানুষের, যে হবে এক ফালি আকাশের মতো স্বচ্ছ ও নির্মল। এমন মানুষ-কে খুঁজে পেলে এবং প্রতিদিন তার সঙ্গে খানিকটা ব্যক্তিগত সময় শেয়ার করতে করতে তৈরি হয় পারস্পরিক ইনভলভেমন্ট।

দাম্পত্য জীবনে স্বামী বা স্ত্রী যদি উভয়ে উভয়কে সময় না দেন, একটা অভাববোধ থেকে অন্য কারও উপর তৈরি হতে পারে একটা ইমোশনাল ডিপেন্ডেন্স, যা ক্রমে রূপান্তরিত হতে পারে একটি অ্যাফেয়ার-এ।

দু’জন সহকর্মীর অন্তরঙ্গ হওয়ার স্বপক্ষে অনেকগুলি যুক্তি কাজ করে। প্রথমত, কাজের মিল, বস-এর প্রতি দু’ জনের একই ধরনের অভিযোগ থাকা, অর্থনৈতিক বিষয়গুলি ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতা এবং উভয়েরই অসুখী দাম্পত্য৷

বিশেষ প্রবণতা

আসলে, যে-কোনও ইমোশনাল অ্যাফেয়ার শুরুতে অত্যন্ত সরল ও স্বচ্ছ থাকে। কিন্তু অন্য যে-কোনও সম্পর্কের মতো এক্ষেত্রেও তৈরি হয় কিছু গোপনীয়তা, পজেসিভনেস এবং মানসিক আদান-প্রদানের স্তর। এইরকম একটা পর্যায়ে এসে বস্তুত সম্পর্কের একটি ‘ডেনজার জোন’-এ প্রবেশ করতে হয়, যখন আশপাশের সমস্ত সম্পর্ককে এই সম্পর্কের তুলনায় তুচ্ছ মনে হতে থাকে। যদি স্বামী বা স্ত্রী এই সমান্তরাল সম্পর্কের বিষয়ে ওয়াকিবহাল হন, তাহলে সমস্যা নেই। কিন্তু দাম্পত্যে দূরত্ব, বিরোধ এবং ভাঙনের পরিস্থিতি তৈরি হয় ওই দ্বিতীয় সম্পর্ক-কে আড়াল করার প্রবণতা থেকেই। ফলত, সম্পর্কের নতুন মানুষটিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক শুধু অবহেলিতই হয় না, অসম্মানিতও হয়৷

অনেকে মনে করেন এটা একজন স্বামী বা স্ত্রী-কে শারীরিক ভাবে ঠকানোর চেয়েও খারাপ। কারণ, সমান্তরাল সম্পর্ক তৈরি হলে, স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে মানসিক সততা থাকে না। যে ইনভল্ভমেন্টটা পরিবারের প্রতি থাকার কথা, সেটা অন্যত্র ব্যয় হয়ে যাওয়ার ফলে ক্রমশ পারিবারিক অ্যাটাচমেন্ট আলগা হতে থাকে। স্বামী বা স্ত্রী উভয়ে উভয়ের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে থাকেন মানসিক ভাবে এবং দাম্পত্য শুধু কিছু পার্থিব প্রয়োজনে দুটি মানুষকে আটকে রাখে। অন্যদিকে আবার দাম্পত্য সম্পর্কের এই শীতলতা, স্বামী বা স্ত্রীটিকে সেই তৃতীয় ব্যক্তির প্রতি আরও বেশি অনুরক্ত ও নির্ভরশীল করে তোলে। এ এক অদ্ভুত আবর্ত, যার মধ্যে উক্ত দুটি মানুষ ও তাদের পারিবারিক জীবন পাক খেতে থাকে।

ইন্ধন

সামাজিক ভাবে একের বেশি সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য নয়। অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠার মূলে রয়েছে একধরনের ড্রামাটিক এক্সাইটমেন্ট অনুভব করার ইচ্ছা। একদিকে নিষিদ্ধ বস্তুর প্রতি ধাবিত হওয়ার স্বাভাবিক ইচ্ছে, অন্যদিকে অ্যাড্রিনালিন গ্রন্থির ক্ষরণে আকৃষ্ট হওয়ার সহজাত প্রবণতা— এগুলিই ইন্ধন জোগায় এই সম্পর্ক তৈরি করতে।

কারও মতে, দাম্পত্যে অপূর্ণতা নতুন সম্পর্ক স্থাপনে সহায়ক। যারা সম্পর্কটার মধ্যে ইনভল্ভড, তারা আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেন, এই সম্পর্ক জীবনের একটা উদ্দেশ্য-কে স্পষ্ট করে, নির্মল আনন্দ দেয়৷ সেই ‘অন্য জন’ তাকে তার ভাবনার রসদ জোগায়, সেই সব কথাই শোনায়, যা সে শুনতে চায়। তার দুঃসময়ে সঙ্গ দেয়, সাফল্যের অংশীদার হয়। এই সম্পর্ক অনেক বেশি নিঃস্বার্থ, বড়ো কোনও প্রত্যাশাও থাকে না এতে।

কেউ কেউ বলেন, দাম্পত্য যাপনে এক ধরনের পৌনঃপুনিকতা রয়েছে, যা কেবল সন্তান বড়ো করা বা সাংসারিক কাজকর্মের সীমাবদ্ধতায় চূড়ান্ত একঘেয়েমির দিকে ঠেলে দেয়। সেক্ষেত্রে কারও সমব্যথী হওয়ার ভাবনা কিংবা নিঃস্বার্থ সাহচর্য, একধরনের নির্ভার, চাপমুক্ত হওয়ার অনুভূতি এনে দেয়। আত্ম-আবিষ্কারের এ এক অপ্রতিরোধ্য অধ্যায়, যা নিজেকে কখনও নিজের কাছে পুরোনো হতে দেয় না, সামাজিক চোখরাঙানিকে তুচ্ছ করেও এক অমোঘ নেশায় ডুবে থাকার ইন্ধন জোগায়৷

অবশেষে

এভাবেই নানারকম কারণে হঠাৎই মনে নতুন রং লাগে। পুরোনো সম্পর্ক ভেঙে কিংবা বজায় রেখে নতুন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পাত্তা পায় না সামাজিক অনুশাসন। নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে তৈরি হয় নতুন সম্পর্ক গড়ার কাহিনি। সে কাহিনি বৈধ নাকি অবৈধ, এসব ভাবার সময় কোথায় কার?

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...