শিয়ালদহ স্টেশন, সেই অতিচেনা ভিড়ভাট্টা, কিচিরমিচির। যাইহোক, জুন মাসের গরমের এক শনিবার শিয়ালদহ স্টেশন থেকে রাজধানী এক্সপ্রেস-এ চড়ে, শুরু করেছিলাম আমাদের সফর।

ওল্ড দিল্লী স্টেশন থেকে ভলভো স্লিপার বাসে চড়ে ভোরবেলা হরিদ্বার পৌঁছোলাম। পৌঁছে দেখলাম, আকাশে ভোরের আলোর রং লেগেছে। আমাদের জন্য অঙ্কিত কুমার তার ম্যাজিক রথটি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। শুরু হল আসল সফর। বাঁদিকে শিবমূর্তি, হর কি পৌরি ঘাট পিছনে ফেলে আমরা ছুটে চললাম ঋষিকেশের উদ্দেশে। হরিদ্বার থেকে মাত্র চল্লিশ মিনিটের দূরত্বে ঋষিকেশ যেন দেবালয়ের প্রধান ফটক। প্রায় সাড়ে তিনশো মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই ছোট্ট পাহাড়ি শহরটির আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে রয়েছে মোহহীন এক মায়া। তাই সেই মায়ার টানে প্রথম রাতটা আমরা ঋষিকেশেই কাটিয়েছিলাম।

বাসস্ট্যান্ডে প্রচুর হোটেল। চেক ইন করে একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে অঙ্কিতের রথে করে সোজা রামঝুলা, লক্ষ্মণঝুলা আর জানকিঝুলা। লক্ষ্মণঝুলা আপাতত বন্ধ। তবে বন্ধ ছিল না জার্মান বেকারি। গঙ্গার ধারে বসে জার্মান বেকারির ব্রেকফাস্টটাই আমাদের লাঞ্চ হয়ে উঠল। তারপর ফিরে এলাম হোটেলে। হাতে সময় থাকলে ঋষিকেশ থেকে নীলকণ্ঠ পাহাড় আর নীর ওয়াটারফলস দেখে নেওয়া যায়। তবে আমরা বিকেলবেলার ত্রিবেণি ঘাটের গঙ্গারতিকে কেন্দ্র করেই ঋষিকেশে ছিলাম৷ তাই মন প্রাণ ভরে দেখলাম গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যার আরতি।

যোগীবৎ ঋষিকেশ। যুগযুগ ধরে মুনিঋষিরা তাদের আধ্যাত্মসাধনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রাথমিক ভাবে এই ঋষিকেশকেই বেছে নিয়েছিলেন। যোগনগরী হিসেবে ঋষিকেশের পথে-প্রান্তরে সেই সাধনার ছোঁয়া বিদ্যমান, যার সাক্ষী হিসেবে তুমুল স্রোতে বয়ে চলেছেন মা গঙ্গা। গঙ্গা আরতি দর্শন শেষে ফিরে গেলাম হোটেলে। পরদিন ভোরে যাত্রা শুরু সেরসীর উদ্দেশে। সেই পথ কল্পনা করতে করতে ঘুম এল কী এল না, ভোর হয়ে গেল। গাড়ি ছুটে চলল হাওয়ার মতো। ভোরবেলা বেরোনোর এই এক সুবিধে। ঋষিকেশ রিভার রাফটিং পয়েন্টের জ্যাম থেকে মুক্তি। সকাল ছ’টার পর সেই জ্যামে একবার ফাঁসলে কমপক্ষে ঘণ্টা দুয়েকের নট নড়নচড়ন। সুতরাং সাড়ে পাঁচটার মধ্যেই আমরা রাফটিং পয়েন্ট ছাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম দেবপ্রয়াগের উদ্দেশে। পাকদণ্ডী পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম আমরা দেবপ্রয়াগ। সেরসীর পথে আমাদের প্রথম বিশ্রাম।

দেবপ্রয়াগ

উত্তরাখণ্ডের তেহেরি জেলার সঙ্গমনগরী হল দেবপ্রয়াগ। ঋষিকেশ থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে সমুদ্রতল থেকে ২,৭২৩ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই শহরটি অলকানন্দার পঞ্চপ্রয়াগের অন্যতম। গঙ্গোত্রী থেকে আগত সবুজাভ ভাগীরথী এই স্থানে এসে বদ্রীনাথের দিক থেকে আগত মাটিরঙা অলকানন্দার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এবং খরস্রোতা গঙ্গা নামে প্রবাহিত হয় সমতলের দিকে। প্রায় আড়াইশো সিঁড়ি ভেঙে নেমে যাওয়া যায় দেবপ্রয়াগের মন্দিরের সামনে৷ সান বাঁধানো ঘাট, পাহাড়ের কোলে সারি সারি সাজানো বাড়িঘর, বেশকিছু হোটেল আর হোমস্টে। ঘাটের বাঁদিক থেকে বয়ে আসছে প্রবল অলকানন্দা আর ডানদিক থেকে স্নিগ্ধ ভাগীরথী। দু’জনের আলাদা রং, আলাদা ধাম, তবু তারা মিলেমিশে এক হয়ে যায় এই প্রয়াগ বিন্দুতে।

পুরাণ মতে, দেবপ্রয়াগ ঈশ্বরের অধিষ্ঠানে পবিত্র, চিরশুদ্ধ। তাই সেই খাড়াই সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলাম সঙ্গমস্থলে। দু’দণ্ড বসলাম ঘাটে৷ প্রণাম করে জল মাথায় নিলাম। স্রোতের কী তীব্রতা, তেমনই গর্জন তার কণ্ঠে। সেই গর্জন-ভাষ্য শুনতে শুনতে উঠে এলাম গাড়িতে। শ্রীনগর পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম রুদ্রপ্রয়াগ। মাঝখানে নদীর উপর এই বিশাল পাহাড়ের সুরক্ষায় সস্নেহে দুহাত বাড়িয়ে আমাদের আগলে রেখেছেন মাতা ধারীদেবী। তাঁর দর্শন করে, অনুমতি নিয়ে তবেই এগিয়ে যাব আমরা আমাদের গন্তব্যে।

কথিত আছে, মাতা ধারীদেবী সারা দিনে তিনবার তাঁর রূপ বদল করেন। মাতা সকালে কন্যা রূপে, দ্বিপ্রহরে যুবতী রূপে এবং সান্ধ্যকালীন সময়ে বৃদ্ধা রূপে আবির্ভূত হন মন্দিরে এবং এই হিমালয়কে, এই চারধামকে আগলে রাখেন তাঁর সন্তানের মতো। ঢালু রাস্তা দিয়ে মন্দিরে যাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে। নদীর উপরে ব্রিজের মতো সেই পথ চলে গেছে মন্দিরের প্রবেশ দুয়ার পর্যন্ত। দর্শন সম্পূর্ণ করার পর মনে হল অনুমতি পেলাম লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। তাহলে এবার রুদ্রপ্রয়াগের পথে।

রুদ্রপ্রয়াগ

উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগ জেলার অন্যতম সঙ্গমস্থল এই রুদ্রপ্রয়াগ৷ কেদারনাথের দিক থেকে বয়ে আসা মন্দাকিনী এই মিলনস্থলে এসে মিশে গেছে অলকানন্দার সঙ্গে এবং প্রবাহিত হয়েছে দেবপ্রয়াগের দিকে। সমুদ্র সমতল থেকে প্রায় দুই হাজার নয়শো ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই সঙ্গমস্থলটি শুধুমাত্র ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকেও বিপুল ঐশ্বর্যশালী। সঙ্গমস্থলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রচুর হোটেল এবং হোমস্টে। পর্যটন শিল্পে রুদ্রপ্রয়াগের অবদান নিতান্ত কম নয়। হিমালয়ের কোলে এমন নদী ঘেরা ছোট্ট টাউন যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। এসব আলুথালু, ছড়ানোছিটানো সৌন্দর্য সংগ্রহ করতে করতে আমরা এগিয়ে চললাম সেরসীর দিকে।

সেরসী

তিলওয়াড়া, অগস্তমুনি, চন্দ্রপুরী, কুণ্ড, সিংগোলি, গুপ্তকাশি, ফাটা পেরিয়ে পাহাড়ি রাস্তার চড়াই-উতরাই তোয়াক্কা না করে আমরা ছুটে চলেছি সেরসীর পথে। কুণ্ড থেকেই রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ। কোথাও প্রাকৃতিক ঝরনার জল বয়ে যাচ্ছে রাস্তায়, কোথাও আবার রাস্তার উপর পাথর আর বোল্ডার হাঁ করে বসে আছে তাদের ম্যাজিক দেখাবে বলে। রাস্তার ধারে সাবধানবাণী টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে যাত্রীদের জন্য। এসব উপেক্ষা করেই পেরিয়ে গেলাম পথ। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়। ততক্ষণে আকাশের মুখ ভার হয়েছে। এই পাহাড়ি পথে আবহাওয়া সম্পর্কিত কোনও প্রেডিকশনই কাজ করে না। গুপ্তকাশি পেরোতে না পেরোতেই চারপাশ কালো হয়ে এল। মেঘ ঢেকে দিল হিমালয়ের প্রাচুর্যকে। লাফালাফি করে নেমে এল বৃষ্টি। আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই জাদুবিদ্যায় পারদর্শী সূর্য তার আলোর কাঠি ছুঁইয়ে দিলেন সামনের পাহাড়ে। মেঘের ভিতর থেকে উঁকি মারল তাঁর রুপোর মুকুট। সে মুকুটের আভাস ছড়িয়ে পড়ল দিগ্বিদিক।

বিকেলের পড়ন্ত রোদের আলোয় দেখতে পেলাম সবুজ ঘেরা পাহাড়ি গ্রাম সেরসী। সমুদ্রতল থেকে সাড়ে ছয় হাজার ফুট উচ্চতার সেরসীতে হোটেল আর হোমস্টের সংখ্যা খুব বেশি হলে দশটা। সঙ্গে লাগোয়া রেস্তোঁরা। পাওয়া যায় চা, কফি, ম্যাগি, মোমো, পকোড়া, আলুর পরোটা, চাপাটি, রাজমা চাউল প্রভৃতি। দুটি মুদির দোকানে পাওয়া যায় সবজিপাতি আর ফলমূল। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম একটা হোমস্টে। ছোট্ট ঘর, কিন্তু সুন্দর। দুটি খাট আর দুটো চেয়ার ছাড়া বিশেষ কোনও আসবাব নেই ঘরে। স্নানঘরটি গোছানো, আধুনিক, পরিচ্ছন্ন। গরমজলও পাওয়া যায় সবসময়। তবে বৈদ্যুতিক সাহচর্য এখানে বড়োই স্বেচ্ছাচারী। ইচ্ছেমতো যায় আসে। বৃষ্টি নামলে তো বালাই ষাট। তখন কেবল জেনেরেটর ভরসা। তবে বৃষ্টিও এখানে স্বাধীন, ক্ষণস্থায়ী। ভাসা মেঘের বৃষ্টি ভাসতে ভাসতে উড়ে যায় অন্য পাহাড়ের ঢালে।

সন্ধে হল সাতটার পর। গুছিয়ে নিলাম ব্যাগপত্তর। আগামীকাল সকাল সকাল রওনা দেব হেলিপ্যাডের দিকে। পায়ে হেঁটে মোটে তিন মিনিট। তাও একবার ঘুরে এলাম হিমালয়ান হেলি সার্ভিসের অফিস থেকে। জেনে নিলাম নিয়মকানুন। হেলি সার্ভিসের অফিসে তখন অনেক ভিড়। অনলাইন টিকিট যারা করেননি, তারা এখান থেকে অফলাইনে পরের দিনের টিকিট কাটতে পারেন। গন্তব্য ক্রমশ প্রকাশ্য।

আরো গল্প পড়তে ক্লিক করুন...