গল্পের শুরু গত বছরের মাঝামাঝি। সেবার রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যায় গিয়ে চারদিকে ফুল দিয়ে সাজানো মঞ্চ দেখে একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছিল, ভাগ্যিস ওনারা আজ আর বেঁচে নেই। না হলে এই নানা রঙের ফুলের চাপেই ওনাদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠত। পুরো অনুষ্ঠানটা বসে দেখে আরও বেশি বিষয়টা অনুভূত হল। আমি এখানে আমন্ত্রিত ছিলাম লেখক হিসেবে, অতিথি হয়ে। অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন স্বভাবতই আমাদের অঞ্চলের বিধায়ক। আসলে এই পদগুলো তাদের মোটামুটি তো উত্তরাধিকার সূত্রেই পাওয়া।
এখন মূল অনুষ্ঠানে ফিরে আসি। নির্বাচিত শিল্পীরা বেশিরভাগই কোনও বিশেষ রঙের পতাকাধারী। তারাই সেই বশ্যতা স্বীকারের উপহারস্বরূপ এই মঞ্চে নিজেদের প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ পেয়েছে। একের পর এক সব শংসাপত্র নিয়ে শিল্পীরা মঞ্চে আসতে শুরু করল নিজেদের বহুমুখী প্রতিভা প্রদর্শন করতে। আমি অবোধের মতো শুধু করতালি দিয়ে যেতে লাগলাম। ভয়ংকর ঘটনাটা ঘটল একদম অনুষ্ঠানের শেষে। পাড়ার ক্লাবের দুর্গামণ্ডপেই এই মোচ্ছবটা হচ্ছিল। শেষে উঠল মামার দয়ায় আমাদের বিধায়কের ভাগ্নে তার গানের ডালি নিয়ে। একেবারে ভাগ্নে মদন! নামেও মদন। ছেলেটির গান যত শুনছি, আমি কবিগুরুর ফটোফ্রেমের দিকে শুধু একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি। একটাই উদ্দেশ্য, যদি ওনার ভ্রূকুঞ্চন এক পলকের জন্যও হয়, তাহলে তা যেন আমার চোখ না এড়ায়।
বেসুরো গানের গুঁতোয় ক্রমশ বসে থাকাই দায় হয়ে উঠছিল। অথচ দেখছি, তোষামোদকারীরা কত সহজেই তা অনাবিল আনন্দের সঙ্গে হজম করছে। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি, মঞ্চের উপর জটলা। অনুষ্ঠান বন্ধ। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম। মঞ্চে গিয়ে ভিড়ের ভিতর উঁকি দিতেই আমার চোখ বিস্ফারিত! মাটিতে পড়ে আছে বিধায়কের ভাগ্নে স্বয়ং মদনকুমার। রক্তে ভেসে যাচ্ছে তার সাদা সিল্কের পাঞ্জাবি। পাশেই পড়ে আছে একটি ফ্যান এবং সেই পাখার ব্লেডগুলো সব বেঁকে গেছে। সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে দেখি পাখার তার ছিঁড়ে ঝুলছে। এতক্ষণে বুঝলাম, তার মানে সিলিং থেকে পাখাটি ভেঙে গায়কের মাথায় পড়েছে।
আমার এই ভাবনার ফাঁকেই দেখি অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ। বিধায়কের ভাগ্নে বলে কথা! সবাই ধরাধরি করে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। মনে হয় এখনও ধড়ে প্রাণ আছে। সেদিনের মতো সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা সেখানেই মুলতুবি হয়ে গেল। কিন্তু এই দুর্ঘটনার পিছনে কি রবীন্দ্র নজরুলের বিরক্ত আত্মা দায়ী? আসলে লেখকের মন তো, সব কিছুই একটু বাঁকা পথে ভাবতে ভালোবাসে।
এবার এই মদনের আত্মজীবনী নিয়ে দু’চার কথা লিখি। মামার দৌলতে স্রোতের মতো পয়সা এসে প্রতি মাসে ঢোকে ওর পকেটে। শাস্ত্রমতে রাজনৈতিক নেতার ভাগ্নে হিসেবে যে কাজ করা উচিত, সেটাই করে৷ মানে প্রোমোটারি। গলায় কুকুরের বকলসের মতো জাহাজের শিকলমার্কা একটা সোনার চেন। চোখে দামি রোদ-চশমা। হাতের আঙুল আরও ক’টা বেশি হলে ভালো হতো বোধহয়। তাহলে আরও কয়েকটা বেশি আংটি পরতে পারত। আবার দশের বদলে বারো আঙুলেও কামাত। পাঁচ লাখি একটা বাইক চড়ে ঘুরে বেড়ায়। তবে বাবুর আসল শখ হল রোমিওগিরি। ভুলভাল হিন্দি গান ছুঁড়ে দেয় কলেজ ফিরতি মেয়েদের দিকে।
বন্ধুদের উস্কানিতে এখন আবার মঞ্চে ওঠার সাহস পেয়ে গেছে। দামি শব্দ-ব্যবস্থার সহযোগে আজকাল বে-সুরকেও তো কিছুটা সুরেলা বানিয়ে দেওয়া যায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তবে কিছুদিন আগে ওকে নিয়ে কী একটা নারীঘটিত অশান্তির কথা যেন শুনেছিলাম। বিষয়টার গভীরে তখন ঢুকিনি। আসলে নিজের কাজ নিয়েই আমি একটু ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করি। যতটুকু শুনেছিলাম যে, একটা কলেজে পড়া মেয়ের সঙ্গে নাকি কী একটা অশ্লীলতার দায়ে জড়িয়ে পড়েছিল। মেয়েটির নাম যতদূর সম্ভব, রুমকি। আমাদের পাড়াতেই থাকে। তবে কোন বাড়ির মেয়ে বা ঠিক কোন গলিটায় থাকে, আমার জানা নেই। পরিচয় না থাকলেও দু’একবার দেখেছি আমি মেয়েটিকে। দেখতে বেশ ভালোই।
একদিন রাতে মেয়েটির হাত ধরে টেনে নাকি চরম অশালীন আচরণ করেছিল মদন ও তার বন্ধুরা। মেয়েটি নাকি তারপর থানায় যায়। শুনেছি থানা তখন কোনও অভিযোগ গ্রহণ করেনি। শুনতেই চায়নি কোনও নালিশ। উলটে নাকি মেয়েটিকে দোষারোপ করে বলে যে, অত রাতে মেয়েটির ঘোরাঘুরি করাটাই যেন অপরাধ হয়েছে। তারপর স্বাভাবিক ভাবেই ঘটনাটি থিতিয়ে যায়।
কিন্তু এদিকে তো আর এক কাণ্ড! সেই দিনের অনুষ্ঠানের আলো মাইক সব কিছুর পুরো দায়িত্ব পেয়েছিল বিজন। লোকটা ভালো, স্বজন। আমি ওর বাড়িও চিনি। একটা ছোটো ভাঙা একতলা বাড়িতে থাকে। আমি অনেকদিন আগে ওকে একবার বাড়িতে ডেকেছিলাম, কী একটা কাজে! মনে নেই। তখনই দেখেছিলাম, খুব ভদ্র ব্যবহার। আর বেশ সৎ প্রকৃতির। কাজটা করে একদম ন্যায্য পয়সা নিয়েছিল। সেদিনই বুঝেছিলাম, তার মানে ছেলেটির লোক ঠকানোর প্রবণতা নেই। ওর পরিবার সম্বন্ধে আমি বিশেষ কিছুই জানি না। আদৌ বিয়ে-থা করেছে কিনা, তা আমি বলতে পারব না।
মদনের কথায় ফিরে আসি। ওর কিছু বন্ধুবান্ধব আছে, সকলেই জানে তারা খুব উগ্র প্রকৃতির। যেহেতু নেতার ভাগ্নের বন্ধু, সেটাই তো স্বাভাবিক। কারণ বাঁশের থেকে কঞ্চি চিরকালই দড়। তার উপর তারা আবার রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তীর উল্লাসে সেদিন সন্ধে থেকেই বেশ নেশাতুর ছিল। ব্যস! আর যাবে কোথায়? ওরা সেদিনের সেই দুর্ঘটনার জন্য বিজনকেই দায়ী করতে লাগল। সবার চোখের সামনেই তো ঘটল ঘটনাটা।
বিজন তো আর ইচ্ছে করে ওর মাথায় ফ্যানটা ফেলেনি। তবে নিরপেক্ষ হিসেবে একটা কথা অবশ্যই বলব যে, ওর সেদিন ফ্যান লাগানোর সময় আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। সেটা ওর একশোবার অন্যায় হয়েছে। তাই বলে ও তো আর চোর ডাকাত নয়। তার জন্য সামান্য ভুলের কারণে ওইরকম গণপিটুনি! সেটা কি ওর প্রাপ্য ছিল? মানছি ওর ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু তবুও তো ও একজন খেটে খাওয়া সৎ সাধারণ মানুষ।
(ক্রমশ…)





